এ জগতে হায়, সেই বেশি চায়...

এস কে সাহেদ ও বদরুল ইসলাম বিপ্লব, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৬, ০৯:২৮ | প্রকাশিত : ০৩ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৪৯

হতদরিদ্র মানুষ, যারা বাজারদরে চাল কিনতে হিমশিম খান, তাদের জন্য আনা সরকারের বিশেষ কর্মসূচির সুবিধা ভোগ করছে সম্পদশালীরাও। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, চালকল মালিক, জনপ্রতিনিধি এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদেরও চালের কার্ড বিতরণের তথ্য পাওয়া গেছে।

হতদরিদ্রদের জন্য বিশেষ খাদ্য সহায়তা দিতে গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের চিলমারীতে এক অনুষ্ঠানে এই বিশেষ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে দেশের বিভিন্ন ইউনিয়নে এই কর্মসূচি চালু হয়।

ওই কর্মসূচি উদ্বোধনের দিন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ঘোষণা দেন, এই কর্মসূচিতে কোনো দুর্নীতি হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। রবিবার খাদ্য কর্মকর্তাদের সম্মেলনে সেই হুঁশিয়ারির পুনরাবৃত্তি করেন মন্ত্রী। অনিয়মের কারণে ডিলারসহ জড়িতদের জেলে যেতে হবে বলেও সতর্ক করেন খাদ্যমন্ত্রী। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

কার্ড পেয়েছেন তারাও

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নে যারা কার্ড পেয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা, বেসরকারি কোম্পানির পরিবেশক, যার আয় বেশ ভালো।  

বিভার গ্রামের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আকমল হোসেন, মহিষখোঁচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা আরএফএল-এর ডিলার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ইদ্রীস আলী নিয়েছেন খাদ্যবান্ধব কার্ড। তালিকায় নাম আছে একজন ট্রাক মালিক, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাফিজুর রহমান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিরাজুল ইসলামের।
আদিতমারীতে আটটি ইউনিয়নের হতদরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির জন্য ১০ হাজার ৫৪১ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য ২৫ জন পরিবেশক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

তবে তালিকায় জটিলতার কারণে কমলাবাড়ি ইউনিয়ন বাদে বাকি সাতটি ইউনিয়নে এ কার্যক্রম চালু করা যায়নি।

আদিতমারী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এ টি এম সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘শুনেছি বেশ কিছু সম্পদশালীর নাম রয়েছে তালিকায়। জনবল সংকটের কারণে সঠিকভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে খুব দ্রুত তদন্ত করে প্রভাবশালীদের নাম বাদ দেয়া হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আলম বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে উভয় পক্ষকে ডেকে তদন্ত করা হবে। কোন ধরনের অনিয়ম প্রমাণ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এ এফ এম আলাউদ্দিন খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসুচিতে কোন ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রভাবশালী কোন ব্যক্তির নাম থাকলে তা তদন্ত করে বাদ দেয়া হবে।’

ঠাকুরগাঁও সদরের রুহিয়া ইউনিয়নের ঘনিমহেশপুর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ললিত কুমার রায়ের পাকাবাড়ি, হাসকিং মিল চাতাল ও ১০-১৫টি পাকা দোকান থাকলেও তার ছেলে অর্জুন চন্দ্রকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

একই গ্রামের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হালিমা বেগম তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম, ভাসুর খাদেমুল ইসলাম, দেবর জাহেরুল ইসলামের নামেও বরাদ্দ হয়েছে কার্ড। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রেজাউল ইসলাম কাছের লোকদের বাড়ি প্রতি দুইটি করে কার্ড বরাদ্দ দিয়েছেন।

হতদরিদ্রদের থেকেও ঘুষ আদায়

লালমনিরহাটের আদিতমারী ও ঠাঁকুরগাঁও সদরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে তালিকায় নাম তুলতে ঘুষ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ  অভিযোগ উঠেছে।

আদিমমারীতে নতুন করে তালিকা প্রণয়ন ও ঘুষ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ এনে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহম্মেদের কাছে চিঠি দিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী অভিযোগটি আমলে নিয়ে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরেজমিনে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

অভিযোগে বলা হয়, কার্ডের জন্য নাম তুলতে জনপ্রতি ১৮০ টাকা করে আদায় করছেন উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত আলীর ছোট ভাই পরিবেশক শফিকুল ইসলাম। টাকা না দেয়ায় অনেক হতদরিদ্র পরিবার কার্ড সংগ্রহ করতে পারেনি।

কিছু কিছু এলাকায় পরিবেশকরাই তালিকা করায় তাদের স্বজনদের নামে কার্ড করে দিয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও সদরের রুহিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুল হক বাবুও নাম তুলতে ১০০ টাকা করে নিচ্ছেন। এর একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন বাবু। তার দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে ট্যাক্স আদায়ের হার কম বলে এক হাজার ৯৯ জনের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে আদায় করেছেন তিনি। এই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হবে বলে ঢাকাটাইমসকে জানান তিনি।

তবে ট্যাক্স বা অন্য কোনো নামে কার্ডের জন্য টাকা আদায়ের সুযোগ নেআ বলে জানিয়েছেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাফিজ উদ্দিন।

ওজনে কারচুপির অভিযোগ

তদারকির অভাবে পরিবেশকরা ওজনে কারচুপি করছে বলেও অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। লালমনিরহাটের ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের পরিবেশক সোহেলের কাছে ৩০ কেজি চাল কিনে তিন কেজি কম পেয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন মঞ্জুরুল হক ও জাদু মিয়া। তারা জানান, প্রতিবাদ করলে কার্ড বাতিল করার হুমকি দেন সোহেল।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলাতেও ১০ টাকা কেজিতে চাল বিতরণে ওজনে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। কার্ডধারী প্রত্যেককে ৩০ কেজি করে চাল দেয়ার কথা থাকলেও তাদের কাছে ১৫ কেজি করে চাল বিক্রি দিচ্ছেন পরিবেশকরা। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর চাল বিতরণ কর্মসূচি সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

(ঢাকাটাইমস/৩অক্টোবর/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত