এক মাসে হাতির আক্রমণে নিহত ৭, পালাচ্ছে গ্রামবাসী

সুজন সেন ও আব্বাস উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৬, ২২:৪৮ | প্রকাশিত : ১৪ অক্টোবর ২০১৬, ২১:৫১

শেরপুরের সীমন্তবর্তী এলাকায় কোনো ভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না বন্যহাতির আক্রমণ। হাতি তাড়াতে প্রশাসনের বাতলে দেয়া পদ্ধতি ও উপকরণ কাজে আসছে না। ইতোমধ্যেই হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে গ্রাম ছেড়ে পালাতে শুরু করেছেন অনেকেই। তারা বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে সীমান্ত থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন। গত একমাসে বন্যহাতির তাণ্ডবে জেলায় নিহত হয়েছেন সাত জন। ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি ও শতশত একর ফসলি জমি।

বৃহস্পতিবার রাতেও সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের পানবর ও গুরুচরণ গ্রামে তাণ্ডব চালায় ভারত থেকে নেমে আসা বন্যহাতির দল। হাতির তাণ্ডব থেকে ফসল ও ঘরবাড়ি রক্ষা করতে বেঘোরে প্রাণ গেল নারীসহ তিন গ্রামবাসীর। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৮ জন। ২১ বছরের মধ্যে এবারই হাতির আক্রমণে এতো হতাহতের ঘটনা ঘটলো।

বন্যহাতির দল অবিরাম তাণ্ডব চালিয়ে ভাঙচুর করেছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বসতবাড়ি, ধ্বংস করেছে শতশত একর ধানক্ষেত, গাছ-গাছালি ও সবজির ক্ষেত।

স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টা থেকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত দুই ঘণ্টাব্যাপী এ তাণ্ডব চালায় হাতির দল। হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত হন পানবর গ্রামের সুন্নত আলীর স্ত্রী আয়তন নেছা (৪৬), জহুরুল (৫৬) ওরফে কালা জহুরুল এবং গুরুচরণ দুধনই গ্রামের আব্দুল হাই (৫২)।

এছাড়াও সম্প্রতি হাতের আক্রমণে নিহত হন বাকাকুড়া গ্রামের কেন্তরাম সাংমার ছেলে বাসিরাম চাম্বুগং (৬০), চিবিরণ বেওয়া (৫০) ও ললেন মারাক (৬২)। আহত হয়েছেন অগণিত নিরীহ গ্রামবাসী।

প্রত্যক্ষদর্শী হাসমত, রেবা বেগম, ইন্নত মিয়া, জাহাঙ্গীর, রতন মিয়া ও আশরাফ মিয়া জানায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী পানবর গ্রামের ফসলি জমিতে রোপিত আমন ধানের থোর খাওয়ার জন্য এক দল বুনোহাতি আসে। এসময় গ্রামবাসী মশাল ও সার্চ লাইট জ্বালিয়ে লাঠিসোটা নিয়ে হৈ-হুল্লোর করে হাতির দলকে তাড়া করে।

এতে হাতির দলটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে পানবর ও গুরুচরণ দুধনাই গ্রামের লোকালয়ে ঢুকে ঘরবাড়িতে হামলা চালায়। এসময় হাতির তাড়া খেয়ে নিজের কাঁচা বাড়ি ছেড়ে প্রায় তিনশ গজ দূরে কালা জহুরুল একটি সেমিপাকা ঘরে দৌঁড়ে আশ্রয় নেন। তার পেছনে ধাওয়া করে হাতির দলটি ওই বাড়িতে গিয়ে ওঠে এবং সেমিপাকা ঘরটির দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।

এতে প্রাণভয়ে জহুরুল ও ঘরে থাকা নারী আয়তন নেছা খাটের নিচে আত্মগোপন করলে একটি হাতি সেখান থেকে তাদের টেনে বের করে ঘরের মেঝেতেই উভয়কে পায়ে পিষ্ট করে। এসময় ঘরের সব আসবাবপত্রও ভাঙচুর করে।

এদিকে তেড়ে আসা দলটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং আশপাশের সব বাড়িঘরে তাণ্ডব শুরু করে। একপর্যায়ে গুরুচরণ দুধনই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের ছাদে কিছু মানুষ আশ্রয় নিলে সেখানেও তেড়ে যায় হাতির দলটি। এসময় বিদ্যালয় ভবনে আঘাত করে ও স্টিলের জানালা ও গ্রিল ভেঙেচুরে দুমরে-মুচরে ফেলে।

এরপর বিক্ষুব্ধ হাতির দলটি গুরুচরণ দুধনই গ্রামের হাতি তাড়াতে অপেক্ষমানদের তাড়া করে। এতে সকলেই দৌঁড়ে পালাতে সক্ষম হলেও সামনে পড়ে যান আব্দুল হাই। ফলে তাকেও পায়ে পিষ্ট করে হত্যা করে বন্যহাতির দলটি।

এভাবে মধ্যরাত পর্যন্ত দুইটি গ্রামজুড়ে চলে বন্যহাতির তাণ্ডব। ঝরে তিনটি তাজা প্রাণ, বিধ্বস্ত হয় ঘর-বাড়ি, বিনষ্ট হয় গাছগাছালি আর শতশত একর জুড়ে রোপিত ধানক্ষেত।

হাতির আক্রমণে আতঙ্কিত গ্রামবাসীর দাবি, প্রশাসন যেন নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। হতাহতদের স্বজনরা জানান, প্রিয়জন নিহতের পরে তারা সরকারি অনুদান চান না। তারা নিরাপদে বাঁচতে চান। নাহলে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

ময়মনসিংহ বন অধিদফতর ও শেরপুর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যালয়ের হিসাব মতে, ১৯৯৫ সাল থেকে এ বছরের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক লোক।

অন্যদিকে মানুষের হাতে মারা পড়েছে ১৯টি হাতি। এরমধ্যে গত আড়াই বছরে (২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত) প্রাণ গেছে ১৮ জন মানুষের।

এছাড়া হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতি মারা গেছে ১২টি।

এদিকে গত রাতের ঘটনায় নিহতের পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম। পরে শুক্রবার সকালে শেরপুর-৩ (ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী) আসনের সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল হক চাঁন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

শেরপুর-৩ (ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী) আসনের সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল হক চাঁন জানান, হাতির আক্রমণ প্রতিরোধে ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সীমান্ত এলাকায় সোলার প্যানেল শক পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ঝিনাইগাতীর ৮ কিলোমিটার এবং নালিতাবাড়ী উপজেলার পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে স্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে ঝিনাইগাতীকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে সরকারের কাছে দুই বান্ডিল টিন ও ছয় লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে বাড়িঘর মেরামত করার জন্য।

এছাড়া বুনোহাতির আক্রমণে যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে পাঁচ লাখ ও আহতদের দুই লাখ টাকা করে অনুদান চাওয়া হয়েছে।

এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা গোবিন্দ রায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সেলি রেজা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন, তাওয়াকোচা বিট অফিসার মো. আশরাফুল আলম, গজনী বিট কর্মকর্তা মো. রফিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই।

(ঢাকাটাইমস/১৪অক্টোবর/প্রতিনিধি/ইএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত