বুনোহাতির হামলায় আরো তিনজনের মৃত্যু, আতঙ্কে পাহাড়বাসী

সুজন সেন, শেরপুর থেকে
 | প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৬, ১৯:১১

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের তাওয়াকুচা গ্রামে বুনোহাতির হামলায় মোমেনা বেগম নামে এক বৃদ্ধা ও শ্রীবরদীর খাড়ামুড়া গ্রামে জিতেন্দ্র চিরাং নামে এক যুবক বুনোহাতির আক্রমণে মারা গেছেন।

শনিবার ভোর ৪টার দিকে মোমেনা বেগম  এবং বিকাল ৫টার দিকে জিতেন্দ্র চিরাং মারা যান।

নিহত মোমেনা ওই গ্রামের মৃত ফজল হকের স্ত্রী। বন্যহাতির এমন অগ্রাসী তা-ব অব্যাহত থাকায় আতঙ্কে পাহাড় জনশূন্য হতে চলেছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জীবন রক্ষার্থে নারী ও শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। গত পাঁচ দিনে দুই নারীসহ ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় এ পদক্ষেপ নেয়া হলো।

হাতির তা-বে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহরূপ সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে স্থানীয় এমপি পাহাড়ি অঞ্চল দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, সীমান্ত এলাকার পাহাড়ি জনবসতিতে এখন প্রতিরাতেই আক্রমণ চালাচ্ছে বুনোহাতির দল। তাতে হতাহত হচ্ছে নিরীহ বহু মানুষ। সেই সঙ্গে হাতির তা-বে ঘর-বাড়ি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিত পাহাড়ি জনপদের অধিবাসীরা দিনদিন জান-মাল, ঘরবাড়ি, ফসলাদি, সহায়-সম্পদ হারিয়ে আরো নিঃস্ব হচ্ছে।

তারা বলছেন, দিন দিন হাতির আক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে পাহাড়ে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী আদিবাসী ও বাঙালিদের ভিটেমাটি এবং ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এলাকাবাসী, তাওয়াকুচা বিট কর্মকর্তা আশরাফুল আলম ও শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালেদা নাসরিন জানান, বৃহস্পতিবার রাতে অর্ধশতাধিক বুনোহাতি পাহাড় থেকে লোকালয়ে এসে ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের পানবর ও দুধনই গ্রামে তা-ব চালায়। এ সময় ঘরে লুকিয়ে থাকা পানবর গ্রামের ছুরত আলীর স্ত্রী আয়তন নেছা, জহুরুল হক ওরফে কালা জহুরুল ও দুধনই গ্রামের আব্দুল হাইকে বুনোহাতি শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ঘর থেকে বের করে এনে পায়ে পিষ্ট করলে ঘটনাস্থলেই তারা মারা যান। এ সময় আরো আটজন আহত হন। তাছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০টি ঘরবাড়ি ও কয়েক একর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী আসনের এমপি প্রকৌশলী এ  কে এম ফজলুল হক চাঁন হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে জানান, বিষয়টি তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরবেন এবং এ এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, শুনেছি, বিএসএফ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া বন্ধ করে দেয়ায় ভারতীয় এসব বুনোহাতি ওপারে যেতে না পেরে এপারে উন্মত্ত আচরণ করছে। তাতে আমাদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এ জন্য বিডিআর-বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক করে হাতিগুলো ওপারে যেতে ভারতীয় সীমান্তের গেট খুলে দেয়ার উদ্যোগ নিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছি।

বন অধিদপ্তর জানায়, এখন হাতির আক্রমণের ভয়ে পাহাড়ি জনপদের আদিবাসী-বাঙালিরা নির্ঘুম রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এদিকে নিরুপায় হয়ে পড়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগ। বুনোহাতির হাত থেকে জানমালের ক্ষতি  ঠেকাতে সরকারি-বেসরকারিভাবে নেয়া কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। ইতোমধ্যে জেলার হাতি উপদ্রুত তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় আট হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে রয়েছে। পাশাপাশি ঘরবাড়ি ছেড়েছে শতাধিক পরিবার। কিন্তু ওই সব পরিবারের সরকারিভাবে আজও কোনো পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়নি। তারা এখন পাহাড় ছেড়ে এসে কেউ খাস জমিতে, কেউ বা আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

কাংশা ইউনিয়নের গজনী বিটের বন সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি মো. দুলাল মিয়া বলেন, দিন দিন হাতির আক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে পাহাড়ে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী আদিবাসী ও বাঙালিদের ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হওয়ার অবস্থা হয়েছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা জানান, বুনোহাতির উপদ্রুপ বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়বাসীদের রাতে নিরাপদ স্থানে থাকতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, হাতির আক্রমণ থেকে পাহাড়িদের রক্ষা করতে ইতোমধ্যে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

জেলা বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, কিছু এলাকায় হঠাৎ বুনোহাতির আনাগোনা বেড়ে গেছে। ঘটছে হতাহতের ঘটনাও। বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।

(ঢাকাটাইমস/১৫ অক্টোবর/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত