পাউবোর কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য

চট্টগ্রাম ব্যুরো চিফ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৬, ১১:৪৩ | প্রকাশিত : ০৫ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৩৯


পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উন্নয়ন কাজের ওয়ার্ক অর্ডারে চলছে কমিশন বাণিজ্য। প্রতি কার্যাদেশের বিপরীতে প্রকৌশলীদের ২-৩ শতাংশ হারে কমিশন দিতে হয় বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের। তারা বলছেন, ই-টেন্ডার শুরু হওয়ার পর দুর্নীতি কিছুটা কমলেও কর্মকর্তাদের কমিশন বাণিজ্য বন্ধ হয়নি। মান সম্মত কাজের ক্ষেত্রে এটিই এখন বড় বাধা।

তবে পাউবোর কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তারা বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজে অনিয়মের  কোনো সুযোগ নেই। আগেও ছিল না, এখনও নেই।

পাউবোর ঠিকাদার নুর মোহাম্মদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, কর্মকর্তাদের টাকা না দিলে কাজের ওয়ার্ক অর্ডার প্রদানে গড়িমসি করা হয়। টেন্ডার ফরমে ত্রুটি-বিচ্যুতির ধরার হিড়িক পড়ে যায়, চলে নানা ছলচাতুরি। গত ৩-৪ মাসে যত ধরনের দরপত্র দাখিল করা হয়েছে প্রতিটিতে ২-৩ শতাংশ হারে কমিশন গুণতে হয়েছে। ন্যাচারালি এর ফলে কাজের মান খারাপ হবে এটাই স্বাভাবিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার উপকূলীয় এলাকায় এখন প্রায় তিন’শ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছে। আগামী মাসে বাঁশখালীতে শুরু হচ্ছে আরও আড়াইশ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। গত তিন-চার মাসে পাউবোর তিন পওর (প্রকৌশল ও যন্ত্রাংশ) বিভাগের অধীনে প্রায় ছয়’শ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। নদী-খালের ভাঙনরোধে ব্লক, জিও ব্যাগ, বেড়িবাঁধ নির্মাণে এসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এছাড়াও রোয়ানুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকায়ও জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু প্রকল্প নেয়া হয়েছে।


ঠিকাদারদের অভিযোগ, কর্মকর্তাদের টাকা না দিলে যেকোনো কাজের ওয়ার্ক অর্ডার হয় না। অর্থ না দিলে টেন্ডার ফরমে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরার কাজ শুরু হয়ে যায়। প্রতিটি কাজে ২-৩ শতাংশ হারে কমিশন দিয়ে তাদেরকে রাজি খুশি করতে হয়।


তাদের অভিযোগ, ই-টেন্ডার জমানা শুরু হওয়ার আগে টেন্ডার ভাগাভাগি করে নেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়াই চলে আসছিল। এখন টেন্ডার ভাগবাটোয়ারার রেওয়াজ বন্ধ হলেও কর্মকর্তাদের কমিশন বাণিজ্য বন্ধ হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোয়ানুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকায় জরুরিভিত্তিতে একাধিক প্রকল্পের কার্যাদেশ কর্মকর্তাদের মর্জিমাফিক দেয়া হয়েছে। যার ফলে তিন মাসেও এসব কাজ শেষ করা যায়নি। গত ২৮ সেপ্টেম্বর পটিয়া উপজেলার মালিয়ারা, বাক্কাইন, বতারগাঁও এলাকায় শিকলবাহা খালের ভাঙনরোধ ও স্লুইস গেট নির্মাণের লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ইতিমধ্যেই এই টেন্ডার নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই কাজে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় এসএ-এসআই (প্রাইভেট) লি.। এই প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দর দেয় দুই কোটি ১৩ লাখ ৪৩ হাজার ৬১৪ টাকা। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এইচবিসি-এ ই । তাদের দর ছিল দুই কোটি ১৩ লাখ ৬১ হাজার ৫২৪ টাকা। জানা গেছে, এই টেন্ডার নিয়েও শুরু হয়েছে দরকষাকষি। চাহিদা মতো কমিশন দিতে রাজি না হওয়ায় প্রকৌশলীরা নানা টালবাহানা শুরু করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলী এলাকা-আনোয়ারা ও বাঁশখালীর জন্য জরুরি একাধিক প্রকল্প হতে নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে সাগরের নোনা পানি ঠেকাতে এসব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। শুরু থেকে এসব প্রকল্প নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠেছে।


এছাড়া ভাঙনরোধে স্থায়ী প্রকল্পের মধ্যে বাঁশখালীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ব্লক স্থাপন প্রকল্প নিয়েও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। রোয়ানুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ থাকা বিতর্কিত ঠিকাদারদেরকে এসব কাজ দেয়া হয়েছে। ২৫২ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ২-৩ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে বলে সূত্র জানায়। আগামী নভেম্বর থেকে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী।


জানা গেছে, বহদ্দারহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-সমর্থিত ঠিকাদার ও প্রভাবশালীরা মিলে কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। টেন্ডার ভাগাভাগির আমল থেকে শুরু করে বর্তমানে ই-টেন্ডারের যুগেও পুরো টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ এই সিন্ডিকেটে হাতে।


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার সাহাকে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক সহকারী প্রকৌশলী (পওর-১) পিউলী দে এসব অভিযোগের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকার ট্রাক্সফোর্স কমিটি (তোফোয়েল কমিটি) সরেজমিন তদন্ত করে বিল পরিশোধের সুপারিশ করেন। এতে অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ নেই।


(ঢাকাটাইমস/ ০৫ অক্টোবর/ আইখ/ এআর/ ঘ.)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বন্দর নগরী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত