‘রাজকবি’র রাজসিক বিদায়

প্রভাষ আমিন
| আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৬, ১৩:৩৪ | প্রকাশিত : ০১ অক্টোবর ২০১৬, ১৩:১৮

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিন ছিল ২৮ সেপ্টেম্বর। এমনিতে শেখ হাসিনা তাঁর জন্মদিন পালন করেন অনাড়ম্বরভাবে। আর গত কয়েক বছর ধরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের কারণে জন্মদিনটি শেখ হাসিনা দেশের বাইরেই কাটান। তবে এবার ৭০তম জন্মদিন বলে আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কর্মসূচিটি ছিল ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রিয় সুহৃদ’দের আনন্দ আয়োজন। উদযাপন কমিটির আহবায়ক ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর নামেই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল। সেই নিমন্ত্রণপত্রে ছিল শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে লেখা সৈয়দ হকের ‘আহা, আজ কী আনন্দ অপার!’ শিরোনামে একটি কবিতাও। কিন্তু শেষ মুহূর্তে শেখ হাসিনার জন্মদিনের সব আয়োজন বাতিল করা হয়। কারণ আয়োজকই যে শুয়ে আছেন হিমঘরে। সৈয়দ শামসুল হক অনেক দিন ধরেই মৃত্যুর দিন গুনছিলেন। ফুসফুস ক্যানসার ছড়িয়ে যাওয়ায় লন্ডনের ডাক্তাররা ৬ মাস সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃতি তাঁকে সে সময়টুকু দেয়নি।

সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর শোকের ছায়া নেমে আসে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে। মূলধারার অধিকাংশ গণমাধ্যম সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যু থেকে কুড়িগ্রামে দাফন পর্যন্ত ফলো করেছে। বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে অনেকেই। তবে সামাজিক মাধ্যমে একটি ঈর্ষাকাতর অংশ সৈয়দ হককে হেয় করার নানা চেষ্টা করেছে। তাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ সৈয়দ হক ‘রাজকবি’ ছিলেন। আমার ধারণা সৈয়দ হক বেঁচে থাকলেও এ অভিযোগটিকে আশীর্বাদ হিসেবেই নিতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি, বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি তিনি তাঁর অনুরাগ কখনো গোপন করেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন শেখ হাসিনাকে নিয়েও। সব রাজা কবিতা বোঝেন না, কবিদের মর্যাদা দিতে জানেন না। তাই সব রাজার সভায় কবি থাকেন না।
কবিরা ভালোবাসায় নুয়ে যান। সেই ভালোবাসা, মর্যাদা পান বলেই সৈয়দ হকরা ‘রাজকবি’ উপাধিকে গালি হিসেবে না নিয়ে আশীর্বাদ হিসেবে নেন। একজন কবির মৃত্যুতে যখন প্রধানমন্ত্রী তাঁর জন্মদিনের সব আয়োজন স্থগিত করে দেন, তখন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দারুণ একটা ভালোলাগার পরিবেশ তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে আপ্লুত এক নতুন কবি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ‘এই দেশে বারবার কবি হিসেবে জন্ম নিতে চাই।’ সৈয়দ শামসুল হককে ইউনাইটেড হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি গভীর মমতায় কবির হাত ধরে শয্যাপাশে বসেছিলেন। এই ছবিটির সঙ্গে অনেকে রবীন্দ্রনাথের পাশে নত হয়ে পণ্ডিত জওহেরলাল নেহেরুর বসে থাকার ছবির তুলনা করেছেন। যে দেশের রাজা জ্ঞানের পাশে নত থাকেন, সেই দেশেই জ্ঞানীরা জন্মান।
সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে কিছু লিখব, এমন যোগ্যতা আসলে আমার নেই। তবে টুকটাক পড়ালেখার সুবাদে জানি, সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যে একটি যুগের অবসান হলো। সৈয়দ শামসুল হকের সময়ে আমিও বেঁচেছিলাম, এটাই গর্ব করার বিষয়। সৈয়দ হককে আমি ঈর্ষা করতে চাই। কিন্তু আমি জানি তাঁকে ঈর্ষা করতেও যোগ্যতা লাগে এবং সে যোগ্যতা আমার নেই। ৮১ বছরের পরিপূর্ণ জীবন। চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়ে দুই আশি-ঊর্ধ্ব বন্ধু সৈয়দ শামসুল হক ও আবদুল গাফফার চৌধুরী এক আড্ডায় বসেছিলেন। প্রাণবন্ত ও স্মৃতিকাতর সে আড্ডায় সৈয়দ হক বলেছেন, জীবনে তার কোনো অনুতাপ নেই। থাকবেই বা কেন? ৮১ বছরের এমন সাফল্যে উপচানো এমন সুফলা জীবন কজন পায়? ১১ বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে প্রথম কবিতা লিখেন। তারপর লিখে গেছেন অবিরাম।
মৃত্যুর দুদিন আগে পর্যন্ত লিখেছেন। মৃত্যুশয্যায় যিনি দুইশ কবিতা লিখতে পারেন, অনুবাদ করতে পারেন, উপন্যাস লিখতে পারেন; জীবন নিয়ে তার অনুতাপ করার অবকাশ কোথায়? আমার পড়ালেখা বেশি নয়, ভুল হতে পারে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পর এমন বহুমাত্রিক প্রতিভার লেখক আর কে আছেন? হোমিওপ্যাথি ডাক্তার সৈয়দ সিদ্দিক হোসাইন ছেলেকে ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলেন। ডাক্তারি পড়া এড়াতে পালিয়ে চলে যান বম্বে। সম্ভবত সেখানেই সিনেমার ভূত তার মাথায় চাপে। ভাগ্যিস চেপেছিল। নইলে অমন চমৎকার সব গল্পের ছবি আমরা কোথায় পেতাম? আর কিছু না করলেও শুধু ‘বড় ভালো লোক ছিল’র জন্যও তিনি অনেকদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অনেক অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার তিনি। সব দরকার নেই, খালি ‘হায়রে মানুষ, রঙীন ফানুস; দম ফুরাইলেই ঠুশ...’ এই একটি গানের জন্যই তিনি অনেক অনেকদিন শ্রোতাদের ভালোবাসা পাবেন। তিনি কি কবিতা ভালো লেখেন না গদ্য? উপন্যাস ভালো না ছোটগল্প ভালো না নাটক? আমরা বিভ্রান্ত হয়ে যাই। আমরা বিভ্রান্ত হতে ভালোবাসি, বিভ্রান্ত হতে হতে বুঁদ হয়ে যাই সৈয়দ হকে। ডাক্তারি পড়া এড়াতে পারলেও ডাক্তার এড়াতে পারেননি সৈয়দ হক। আজীবন সংসার করেছের ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে, যিনি নিজেও একজন শক্তিমান লেখক।
সৈয়দ হক যতটা না রাজকবি, তারচেয়ে অনেক বেশি রাজনীতি-সচেতন লেখক। পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি সচেতনভাবে গড়ে দিয়েছেন বাঙালি মানস। ‘আমি জন্মেছি বাংলায়/আমি বাংলায় কথা বলি/ আমি বাংলার আলপথ দিয়ে হাজার বছর চলি/ চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে/তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে?’ তাঁর কবিতায়, গানে, নাটকে বারবার এই প্রশ্নের জবাব খুঁজেছেন তিনি; সন্ধান করেছেন উৎসের, শিকড়ের। কুড়িগ্রাম থেকে উঠে এসে থিতু হয়েছেন ঢাকায়, কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ছিলেন লন্ডনে। নাগরিক হতে পারতেন, আন্তর্জাতিক হতে পারতেন; কিন্তু তিনি বারবার নিজেকে খুঁজেছেন কল্পনার জলেশ্বরীতে। মৃত্যুর পরও ফিরে গেছেন শিকড়ের কাছেই। অন্য অনেক নাগরিক বুদ্ধিজীবীরা যখন বেছে নেন মিরপুর বা বনানী, তিনি সেখানে বেছে নিয়েছেন কুড়িগ্রাম।


আমার ভুল হতে পারে, পড়ার ঘাটতি হতে পারে; কিন্তু সমসাময়িকদের মধ্যে আল মাহমুদ ছাড়া আর কারো কবিতায় এমন কাব্যিক মাটির ঘ্রাণ পাইনি। ‘মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর/ নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর’Ñ মাত্র দুই লাইনে কী অসামান্য দার্শনিকতা। সৈয়দ হক আগাপাশতলা শৈল্পিক। যেখানে কলম ছুঁইয়েছেন, সেখানে সোনা ফলিয়েছেন। তার সবকিছুই উৎকর্ষে চুড়া ছুঁয়েছে। তিনি যদি আর কিছু না লিখে শুধু ‘নুরলদিনের সারা জীবন’ বা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ লিখতেন; তবুও তিনি স্মরিত হতেন অনেক অনেক দিন। যতই সমালোচনা করুন, ‘খেলারাম খেলে যা’কে তো আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। আচ্ছা বাদ দিলাম খেলারাম, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ বা নিষিদ্ধ লোবান? কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি বোধহয় কবি হতেই জন্মেছিলেন। আর সব না থাকুক, যেটা নিয়ে তার নিজেরই দ্বিধা ছিল, সেই ‘পরানের গহীন ভিতর’র মতো পকেট বই-ই কত মানুষের হৃদয়ে তার স্থায়ী আসন গড়ে দিয়েছে, তিনি কি জানতেন? ‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর...।’ কীভাবে হৃদয়ের তন্ত্রীতে টোকা দিতে হয়, করোটিতে চলে ভাবনার তুফান; তারচেয়ে বেশি আর কে জানত?
ফেসবুকে নিন্দুকেরা সৈয়দ হকের সৃষ্টির সমুদ্র মন্থন করে কয়েক লাইন তুলে এনে তাঁকে ‘চটি লেখক’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন। আমি তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছি। কারণ এ লাইনগুলো আমার পড়া ছিল না। পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই। যৌনতার মতো একটি বিষয়কে এমন শৈল্পিক সুষমায় তুলে ধরার দক্ষতা শুধু গ্রেট লেখকদের থাকে। কেউ কেউ তাকে ‘নাস্তিক’ বলে গালি দিতে চেয়েছেন। আমি তার বিশ্বাসের কথা জানি না, তার কোনো লেখায় পড়িওনি। তাঁর ধর্মবিশ্বাস নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। তাঁর আস্তিক হওয়ার, নাস্তিক হওয়ার, মুসলমান হওয়ার, মুসলমান না হওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। যতক্ষণ তিনি আমার অনুভূতিতে আঘাত না করছেন, যতক্ষণ তার বিশ্বাস নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই।
যাদের ব্যাপারে আমি মোহগ্রস্ত, তাদের ব্যাপারে আমার একটা নিজস্ব থিওরি আছে। সুযোগ থাকলেও আমি তাদের কাছে যেতে চাই না। সবাই তো মানুষ। যদি তার বা তাদের মানবিক কোনো আচরণ দেখে আমার মোহ ভেঙে যায়। আমি সেই মোহগ্রস্ততা নিয়েই থাকতে চাই। আমি রশীদ করীমকে দেখতে যাইনি, আমি মাহমুদুল হককে দেখতে যাইনি। পেশাগত কারণে হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে দেখা হয়েছে; তবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ থাকলেও হইনি। দূর থেকেই মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। আশির দশকে আমরা গোগ্রাসে গিলতাম সৈয়দ হক- কলাম, গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস।
নব্বইয়ের দশকে বইমেলায় দেখা, বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে আড্ডায়ও দূর থেকে দেখে মুগ্ধতা বেড়েছে শুধু। আশি বছর বয়সেও জিন্স পরা অমন টানটান তরুণ আপনি কজন পাবেন? সৈয়দ হক আন্তেই আমাকে এতটাই প্রভাবিত করেছেন, জিন্স ছাড়া অন্য কিছু পরে আমি স্বস্তি পাই না। তার আভিজাত্য, তার স্মার্টনেস, তার বলার ভঙ্গি আমাকে বারবার মোহাবিষ্ট করে। যারা কাছে গেছেন বা ভেতর থেকে চেনেন; নিশ্চয়ই অনেক সমালোচনাও পাবেন। আমার ব্যক্তি সৈয়দ হককে কোনো ভাবনা নেই। তার শিল্প সৃষ্টিতেই আমি কৃতজ্ঞ তার কাছে। যেমনটা আল মাহমুদের ক্ষেত্রে। যতই আদর্শচ্যুতি ঘটুক, আমি এখনো জীবনানন্দের পর আল মাহমুদকে শ্রেষ্ঠ কবি মানি। বাকি সবাই লেখক। আর সৈয়দ হক লেখকদের লেখক। তিনি লেখকই হতে চেয়েছেন। তাই হয়েছেন।
সৈয়দ হক আর নেই, তবু নিশ্চিত জানি কোনো গভীর সংকট যখন আমাদের করোটিতে অনুরণন তুলবে; তখন পরানের গহীন ভিতর থেকে শুনতে পাব তাঁর অবিনাশী ডাকÑ জাগো বাহে কোনঠে সবায়...
[email protected]

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত