শিক্ষামন্ত্রীর একটি ফোন এবং কিছু কথা

মাহবুব রেজা
| আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০১৬, ০৯:১৪ | প্রকাশিত : ০২ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৫৩

২৮ সেপ্টেম্বর বুধবার। দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিট। প্রতিদিনের মতো অফিসে কাজ করছিলাম এমন সময় একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন এলো। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে কেউ একজন নিজের নাম বললেন। নামটা বেশ পরিচিতই মনে হলো। ভাবলাম এ আর এমন কী। একই নামের মানুষ তো থাকতেই পারে। খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বললাম, জি শুনছি, বলেন। ফোনের ওপাশের কণ্ঠস্বর থেকে সম্ভবত বুঝলেন ব্যাপারটা। এবার তিনি খানিকটা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, ‘আমি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছিলাম। আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?’
এবার আমি বেশ বিস্মিতই হলাম! অবাক হওয়ার মতো ব্যাপারও বটে। বলে কি! একজন মন্ত্রী আমাকে ফোন করেছেন! একটু তো ঘাবড়ানোর ব্যাপার থাকেই। আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। মন্ত্রী বললেন, ‘সাপ্তাহিক এই সময়ে আমাকে নিয়ে আপনার লেখাটা আমি পড়েছি। লেখাটা পড়ে আপনাকে ফোন দিয়েছি ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য। আপনাকে ধন্যবাদ জানাই সময়োচিত মন্তব্য কলাম লিখেছেন বলে।’
এদেশে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে লেখা লিখলে সাধারণত হুমকি-ধামকি, মামলা, রক্তচক্ষু দেখার ব্যাপারই ঘটে থাকে। ধন্যবাদ দেওয়ার ব্যাপার খুব একটা থাকে না। থাকার কথাও নয়। শিক্ষামন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করে লেখার বিপরীতে স্বয়ং মন্ত্রী ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য ফোন করেছেন! শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কথা শুনে সত্যি সত্যি আমার বিস্ময়ের দিগন্ত প্রশস্ত হতে থাকে।
শিক্ষামন্ত্রীর বাড়ি সিলেট। তিনি তার স্বভাবজাত আঞ্চলিক ভাষায় বলতে থাকলেন, ‘আপনাদের এই সময় আমি বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়ি। আমার বক্তব্যকে ‘কোট’ করে আপনারা যে লেখাটা লিখেছেন সেটা পড়ে আমার যা বোঝার আমি বুঝে নিয়েছি। এরপর থেকে কথা বলার ক্ষেত্রে আমি নিজেকে শুধরে নেব।’
‘শিক্ষামন্ত্রী কি পারবেন?’ শিরোনামে সাপ্তাহিক এই সময়-এর গত সংখ্যায় আমি শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যের সমালোচনা করে একটি লেখা লিখেছিলাম। সেই লেখায় উল্লেখ করা হয়েছিল শিক্ষামন্ত্রীর একটি বক্তব্য। ২০ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে ‘শিক্ষার উন্নত পরিবেশ, জঙ্গিবাদমুক্ত শিক্ষাঙ্গন’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বিভাগের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের উদ্দেশে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, ছাত্রকে যিনি চিনবেন না, তার শিক্ষক হওয়ার কোনো যোগ্যতা থাকে না। আমরা এখন সেই তথ্য নিচ্ছি, কে তার সব ছাত্রকে নামে চেনেন না, চেহারায় চেনেন না। তার (শিক্ষকের) এমপিও হলে কেটে দেব, সরকারি চাকরি হলে বাতিল করে দেব।’ একই বক্তব্যে তিনি আরও বলেছেন, কোনো উপায় নেই। কারণ, আমার শিক্ষক যদি তার ছাত্রকে না চিনলেন, কেন জনগণের টাকা আমি তাদের দেব?’
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বেশ বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘সেদিনের আমার কথা ধরে সাপ্তাহিক এই সময় আমাকে সাম্প্রতিক সময়ের গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ‘হাইব্রিড ‘নেতাদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছে এটা আমাকে নতুন করে ভাবাতে শিখিয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি এ ধরনের কথা বলা মন্ত্রী হিসেবে অনুচিত।
শিক্ষামন্ত্রীকে বললাম, আমরা বেফাঁস, উলটা-পালটা কিংবা ‘রাবিশ-ফালতু’ ধরনের কথা বলা অন্য মন্ত্রীদের সঙ্গে একজন নুরুল ইসলাম নাহিদ, একজন মতিয়া চৌধুরীকে এককাতারে দেখতে অভ্যস্ত নই। কারণ আপনাদের সততার, ভালো মানুষ হিসেবে একটা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সেই জায়গা থেকে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমার মনে হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী হয়ে আপনি কেন এ ধরনের বেফাঁস, হালকা, উদ্ভট আর অযাচিত কথা বলতে যাবেন?


লেখাটির শেষে আশংকা ব্যক্ত করে বলা হয়েছিল, ‘শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ যদি তার সারাজীবনের অর্জনকে পথের ধুলোয় বিসর্জন দিতে চান তাহলে এখন তিনি যেভাবে অতিকথনের পরীক্ষায় নেমেছেন সেটা ধরে রাখলে তাকে আর কিছুই করতে হবে না। এখন দেখার বিষয় শিক্ষামন্ত্রী তার পরীক্ষা কতটুকু সফলভাবে দিতে পারেন।’
এরপর নুরুল ইসলাম নাহিদ যা বললেন তার অর্থ দাঁড়ায় এরকম, আমি অন্য মন্ত্রীদের কথা বলতে পারব না। তবে আমি আপনাদের লেখার ভেতরের সাবধান বাণীটি পড়তে পেরেছি। গণমাধ্যম যদি এভাবে আমাকে সাবধান করে দেয় তাহলে আমরা উপকৃত হব। মন্ত্রী হিসেবে আমার ব্যর্থতা থাকতে পারে, সংসদ সদস্য হিসেবে আমি ব্যর্থ হতে পারি কিন্তু একজন ব্যক্তি নুরুল ইসলাম নাহিদ কেন অযাচিত, এলোমেলো কথা বলবে? মেঠো-রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেক সময় আমাদের অনেক কথা বলতে হয়, তাই বলে বেফাঁস কথাবার্তা বলা মোটেও ঠিক নয়। এই লেখাটি প্রকাশ করে আপনারা মন্ত্রী হিসেবে আমাকে সতর্ক করে দিলেন। এই কারণে আমি আপনাকে, আপনাদের পত্রিকাকে এবং আপনাদের সম্পাদককে বিনীতভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই।
নুরুল ইসলাম নাহিদ লেখাটির জন্য আবারও ধন্যবাদ জানালেন এবং ফোন রেখে দিলেন।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাকে অনেক ব্যস্ততার ভেতর থাকতে হয়। এই ধরনের লেখাকে গুরুত্ব না দিলে তার কোনো ক্ষতি হতো না। তিনি ইচ্ছে করলে ‘দেখেও’ নিতে পারতেন। সেটা না করে শত ব্যস্ততার মধ্যে সময় বের করে একজন শিক্ষামন্ত্রী একজন গণমাধ্যমকর্মীকে ফোন করেছেন তার ভুল স্বীকার করার জন্য। এখানেই নুরুল ইসলাম নাহিদ অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা রাখেন। রেখেছেন।


আমাদের দেশে সাধারণত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে গঠনমূলক কিছু লেখা হলে বিষয়টিকে তারা (সবাই নয়) ভালোভাবে গ্রহণ করেন না। কেউ কেউ আবার মহাউৎসাহে সেসব লেখাকে ‘বর্জ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিপক্ষকে শত্রুরূপে দেখতে পছন্দ করেন। কিন্তু একজন ব্যক্তি নুরুল ইসলাম নাহিদ, একজন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে দেখে মন্ত্রিসভার বেফাঁস, এলোমেলো কথা বলারা যদি শিক্ষা নিতেন তাহলে কি খুব দোষের কিছু হবে!
লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত