কোন পথে সার্ক?

বাছির জামাল
 | প্রকাশিত : ০৩ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৩৪

দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) ভবিষ্যৎ কী? কোন পথে এগিয়ে চলছে সংস্থাটি? সম্প্রতি ভারত, বাংলাদেশসহ চারটি সদস্য রাষ্ট্র একযোগে যোগ দিতে অসম্মতি জানানোয় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সার্কের ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে? সার্ক যে খুব একটা কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতার সংগঠন, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও বলবে না। কিন্তু প্রতিবছর এ অঞ্চলের রাষ্ট্রপ্রধানরা তাদের শত সমস্যা, মান-অভিমান থাকা সত্ত্বেও একসঙ্গে মিলিত হয়ে পরস্পরের সঙ্গে হ্যান্ডশেক, গলাগলি ও মতবিনিময় করার সুযোগ পান। সার্কের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আন্তসম্পর্ক উন্নয়নে এটাই বা কম কিসের; অনেকে এমন মত পোষণ করলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সার্কের এবারের সমস্যাটা আরও জটিল।

১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত সার্কের বয়স এখন ৩১ বছর। প্রতিবছর সংস্থাটির শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও এ ক’বছরে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ১৮টি। এবারে ইসলামাবাদে এর ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। বিগত বছরগুলোয় সার্ক সম্মেলন স্থগিত হয়েছে কি পিছিয়ে গেছে, তা নিয়ে কারোর কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু এবারই প্রথম একই সঙ্গে চারটি সদস্য রাষ্ট্র ইসলামাবাদের সম্মেলনে যেতে অপারগতা প্রকাশ করায় সার্ক এক গভীর সংকটে নিপতিত হলো। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ প্রশ্নে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত ও আফগানিস্তানের চরম উত্তেজনা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মতো অভ্যন্তরীণ ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অনাকাক্সিক্ষত বিতর্কে জড়িয়ে এ অঞ্চলের আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রটিকে মোটামুটি পর্যুদস্ত করে ফেলেছে পাকিস্তান। উপরন্তু এত দিনের ব্যবধানে আন্তদেশীয় কিছু বৈঠক ও প্রতিবছরে একটি করে শীর্ষ সম্মেলন ছাড়া সার্কের আর কোনো অর্জন আছে কি? তাই এ অবস্থায় অনেকেই সার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। তাদের জিজ্ঞাসা, সার্ক কি তাহলে একটি ব্যর্থ সংস্থায় পর্যবসিত হতে চলেছে?
উল্লেখ্য, আগামী ৯ ও ১০ নভেম্বর এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে সার্কের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো একটি সদস্য দেশ অংশ না নিলে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় না। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সেনা সদর দপ্তরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ভারত ও পাকিস্তানের টানাপড়েনের জেরে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। ওই হামলার জন্য পাকিস্তানকেই দায়ী করে আসছে নয়াদিল্লি। বাংলাদেশও পাকিস্তানে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। একই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে অন্য দুই সদস্য দেশ আফগানিস্তান ও ভুটান।

সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে পাকিস্তানের নগ্ন হস্তক্ষেপ, জঙ্গিবাদে সহযোগিতার দায়ে ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের এক কূটনীতিককে বহিষ্কার ও পরে কর্মকর্তাকে আটক করা হয়; একের পর এক এসব ঘটনায় ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক কঠিন হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য, জালনোট বহন ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার কারণে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে তিনজন পাকিস্তানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়েছে। এসব নিয়ে সম্পর্কের জটিলতা এখনও কাটেনি। ফলে বারবার পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকও।

এ ছাড়াও পাকিস্তান কমনওয়েলথে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ‘কমনওয়েলথ মিনিস্টারিয়েল অ্যাকশন গ্রুপের (সিমেগ) বৈঠকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্পেস সংকুচিত হয়ে আসছে উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে আলোচনা চান এবং কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিও আশা করেন। তবে পাকিস্তানের এ প্রস্তাব উপস্থিত সদস্যরা নাকচ করে দেওয়ায় সিমেগ বৈঠকের বিবৃতিতে বাংলাদেশ ইস্যু স্থান পায়নি। ভারত, পাকিস্তানসহ ৯ সদস্যবিশিষ্ট সিমেগের বর্তমান সভাপতি সাইপ্রাস। সিমেগের সদস্য না হওয়ায় বৈঠকে বাংলাদেশের উপস্থিত থাকার সুযোগ নেই। সিমেগের সদস্য একটি রাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের এ অপতৎপরতার বিষয়টি জানার পর ঢাকায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেশটির বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তখনই আঁচ করা গিয়েছিল যে, বাংলাদেশ হয়ত আসন্ন সার্ক সম্মেলন বয়কট করতে পারে। অবশেষে তা-ই হলো। অনেকে বলাবলি করছেন যে, ভারত যাচ্ছে না বলেই বাংলাদেশও সার্ক সম্মেলন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলামাবাদের শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের না যাওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের যোগ না দেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে পাকিস্তানের উপর্যুপরি ‘নাক গলানো’র প্রতিবাদেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিনে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে সারপ্রাইজ কূটনীতির মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক সহজীকরণের চেষ্টা করলেও কিছুদিন ধরে দুই দশের মধ্যে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কাশ্মীর ইস্যু, যা নিয়ে দেশ দুটিতে রীতিমতো যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এমন অবস্থায় পাকিস্তানে গিয়ে সার্ক যোগ না দেওয়ার কথা জানায় ভারত। এর আগেও দুই দেশের মধ্যে কার্গিল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সার্ক শীর্ষ বৈঠক স্থগিত রাখতে হয়েছিল, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একসূত্রে গাঁথার লক্ষ্যকে পূরণ হতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ পর্যন্ত সার্কের আট সদস্যের চারটি দেশই পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে অসম্মতি জানানোর কারণে এর বর্তমান চেয়ারম্যান নেপালকে সম্মেলন স্থগিতের সিদ্ধান্তই নিতে হবে। এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই শুধু বাকি।
বিশ্লেষকদের মতে, শুরু থেকেই মূলত ভারত-পাকিস্তানের বৈরিতার কারণেই কার্যত সক্রিয় হতে পারেনি সার্ক। তবুও সব বৈরিতা কাটিয়ে মন্থর গতিতে হলেও যেটুকু এগিয়ে চলছিল, এবার সেটিও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল, যা সংস্থাটিকে বিলীন করতে পারে। এবারে সার্ক সম্মেলন হোঁচট খাওয়ার পেছনে পাকিস্তানকেই দুষছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে সার্কের উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিদগ্ধজনরা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় তিন দশকে সার্কের আওতায় প্রায় তিন ডজন চুক্তি এবং অনেকগুলো ঘোষণা এলেও এর অধিকাংশই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ২০০০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের প্রতিটি মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য সার্ক যে অঙ্গীকার করেছিল, তা যেমন বাস্তবায়িত হয়নি তেমনি ২০০২ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াকে দারিদ্র্যমুক্ত করার ঘোষণাও এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে। বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথমে সাপটা পরে সাফটা চুক্তি করা হলেও গত ৩০ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেড়েছে মাত্র ৫.৮ শতাংশ। সন্ত্রাস দমনে একযোগে কাজ করার কথা থাকলেও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিস্তার ও উৎস নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ। পক্ষান্তরে সদস্য দেশগুলোর সাধারণ মানুষ মনে করে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে সার্ক নেতারা যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ার চেহারা পাল্টে যেত। অনেকে মনে করেন, সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, তাদের মধ্যে সম্প্রীতির অভাব এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সার্ককে অনেকটাই অকার্যকর করে তুলেছে।

শুরুতে সদস্য সংখ্যা ৭ হলেও ২০০৭ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত চতুর্দশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে আফগানিস্তানকে অষ্টম সদস্য দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইতোমধ্যে গত ৩০ বছরে সার্কের আওতায় ২৬টি চুক্তি এবং ১৮টি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য সাপটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরের বছর থেকে তা কার্যকর করার কথা থাকলেও স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা নিয়ে দুই প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চুক্তিটির বাস্তবায়ন আটকে আছে। এ ছাড়াও আছে স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলো পরস্পরকে ছাড় না দেওয়ার প্রবণতা। ফলে আন্তবাণিজ্য সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
১৯৮৫ সালে সার্ক যখন যাত্রা শুরু করেছিল তখন এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের হার ছিল ৩.২ শতাংশ। ৩০ বছর পর এখন এই হার মাত্র ৫.৮ শতাংশ। পক্ষান্তরে আসিয়ানের ক্ষেত্রে আন্তবাণিজ্যের হার ২৫ শতাংশ এবং ইউরাপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে তা ৬০ শতাংশের বেশি, সার্কের আওতায় আন্তবাণিজ্যেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসেনি। বস্তুত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগের কথা বলা হলেও সার্ক দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকা- এখনও খুব কম। এর আগের কয়েকটি শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির অঙ্গীকার করা হলেও আশানুরূপ তেমন অগ্রগতি আসেনি। নিকট প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও সার্ক দেশগুলোর সাধারণ মানুষ পরস্পরের বন্ধু হতে পারেনি। প্রায় প্রতিটি সম্মেলনে সন্ত্রাস দমনে সার্ক নেতারা জোরালো অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ফলপ্রসূ কোনো পদক্ষেপের অভিব্যক্তি ঘটেনি। বরং সদস্য দেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী দেশগুলোতে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে মদদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এমন এক অবস্থায় সার্ককে কিভাবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে যখন সদস্য দেশগুলো যারপরনাই কাজ করে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তান ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। পাকিস্তানের কর্মকা-ে আফগানিস্তানও স্বস্তিতে নেই। তাই খুঁড়িয়ে চলা আট জাতির এই আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক আবারও গভীর সংকটে নিপতিত হলো। এখন দেখার বিষয়, এ অবস্থা থেকে সার্ক কিভাবে আবারও উঠে দাঁড়ায়। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সার্কের বর্তমান সভাপতি নেপাল ইসলামাবাদের বিকল্প হিসেবে শীর্ষ সম্মেলনের স্থান খুঁজতে শুরু করেছে। হয়ত সামনের কোনো একসময়ে অন্য কোনো সদস্য দেশে শীর্ষ সম্মেলন হতেও পারে। কিন্তু এতে কি সার্ক কার্যকর হবে? এর উত্তর শুধু নেতিবাচকই বলা যায়। সার্ককে কার্যকর করতে হলে এর সদস্য দেশগুলো পরস্পরকে সম্মান জানাতে হবে, পারস্পরিক সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং অবশ্যই অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানো বন্ধ করতে হবে। আর তা না হলে সার্ক বর্তমানে যে খাদের কিনারে এসেছে পৌঁছেছে, তা থেকে এর গভীরেই পর্যবসিত হওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর দেখা যাচ্ছে না।
 

[email protected]

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত