আমার নামে স্কুল এবং শিক্ষক বাসন্তী দি

মনিজা রহমান
| আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৬, ১৩:৪৯ | প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৬, ১৩:০৪

জানেন, এই পৃথিবীতে আমি সেই বিরলতম মানুষের একজন, যার নামে একটি স্কুল আছে। এটাকে সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্য বলব জানি না! তবে এক সময় যেটা ছিল বিব্রতকর, সেটাই এখন সুখের স্মৃতি! গর্বের স্মৃতিও কি? হুমমম, তাও বলা যায়!

সেই স্কুলে আমি একটানা দশ বছর পড়েছি। খাতায় নিজের নাম লেখার পরে স্কুলের নাম লিখতে গিয়েও সেই একই নাম! মনিজা রহমান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। বন্ধু লিমা-মৌসুমীরা বলতো, তোর আর স্কুলের নাম লেখার দরকার কি! ডটডট দিয়ে দে! তারপর ওদের সেকি গা জ্বালানো হাসি। আমার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হত! কেন যে দুনিয়াতে এত নাম থাকতে আমার নামেই স্কুলের নাম হল! কিংবা স্কুলের নামটাই কেন আমার নাম হল! যত্তসব! 

স্কুলজীবনে আমি অনেক ভেবেও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতাম না। তবে নামের কারণে আমি স্কুলে খুব বিখ্যাত ছিলাম। প্রায় সব শিক্ষকরা আমাকে চিনতেন। অন্য ক্লাসের মেয়েরা এসে আমাকে দেখে যেত। মাঝে মাঝে মনে হত, আমি বুঝি কোন চিড়িয়াখানার প্রাণী! অবশ্য এই নামের জন্য একজন মানুষ যে আমাকে সব সময় মনে রাখতেন এজন্য আজ এতদিন পর সত্যি গর্ব হয়, তিনি আমাদের প্রধান শিক্ষক- বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা।

স্কুলের মেইন বিল্ডিং তিন তলা হলেও সেখানে এত ছাত্রীর সংকুলান হত না। পুরো এলাকায় একটাই গার্লস হাইস্কুল তো!  আমাদের সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস হত পাকা দালানে, বাকি তিনদিন বেড়ার ঘরে। চারদিকে বেড়া  আর খসখসে সিমেন্টের মেঝের সেই ঘর। ওপরে টিনের চাল। বৃষ্টির সময় টুপটাপ শব্দ হত। আর গরমের সময় ঘেমে নেয়ে একাকার হতাম।

 বেড়ার ঘরের পিছনেই ছিল বিশাল সব আম গাছ। তাতে ছানাসহ শাখামৃগরা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াতো। এমন বানর ভর্তি স্কুলের কথা কোনোদিন শুনেছেন কেউ? কি যে তাদের দাপট। হাত থেকে চিপস ছিনিয়ে নিয়ে খেত। কখনও ঝালমুড়ির ঠোঙা। টিফিনের সময় দেয়া গজা, আমিত্তি, কিংবা সিঙ্গারা। অক্ষম আক্রোশে ফুঁসতাম আমরা। অনেক সময় ভ্যা করে কেঁদেও ফেলতো কেউ কেউ।

এই উত্তপ্ত বেড়ার ঘর, বানরের দাপট, কাঁদায় থকথকে উঠান- দু:খস্মৃতি হলেও, আগ বাড়িয়ে বলার মতো অনেককিছু ছিল। যেমন সুযোগ পেলেই পরিচিতদের বললাম, জানেন বাংলা সিনেমার সব নায়িকারা আমাদের স্কুলে পড়েছে!

সব নায়িকারা নয়, হাতে গোনা কয়েকজন। তবে যে কোনো বিচারে বাংলা চলচ্চিত্রের তিন কিংবদন্তির নায়িকা ছিল তারা। শবনম, শাবানা, ববিতা ছিল আমাদের স্কুলের ছাত্রী। ববিতার অপর দুই বোন সুচন্দা ও চম্পাও। আজও আমি যখন কোথাও ওদের শৈশবের স্মৃতিকথন দেখি, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁজতে থাকি, স্কুলের কথা, বানরের  কথা,  কখনও বাসন্তী দিদির কথা। পড়ি আর মনে মনে ভাবি, তাদের এই  স্মৃতিকথনে কোথাও আমারো যেন একটা ভাগ আছে।

আমার কয়েকজন সহপাঠী ছিল যারা বাস্তবের অভিনয় শিল্পী। স্কুলের টিচারদের এত নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতে পারতো যে আমাদের বেঞ্চ থেকে হেসে গড়িয়ে পড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকতো না। সবচেয়ে মারাত্মক ছিল বিশালদেহী লাইলি আপার সঙ্গে নাঈমা আপার রিকশাযাত্রার অনুকরণের দৃশ্যটি। নাজমা আপা, মোমেনা আপা, স্বরস্বতী দি, পলিন আপা, মুসলিমা আপা, শম্পাদি, নুরুল ইসলাম স্যার, রুবাইয়াত স্যার, খালেক স্যার, নাজিমুদ্দিন স্যার, মন্ডল স্যার- কেউ বাদ পড়তো না ওদের অভিনয় প্রতিভার বলির পাঠা হওয়া থেকে। এমনকি আমাদের ফার্স্ট গার্ল পম্পার মা কৃষ্ণা দিও।

হাসি ঠাট্টার বাইরে কিছু আবেগময় ঘটনাও মনে পড়ে। আমাদের বাংলা পড়াতেন আবেদা আপা। দীর্ঘ লম্বা চুল ছিল তাঁর। ওনার স্বামী বাম রাজনীতি করতেন। জাতীয় নির্বাচনে আমাদের এলাকার হয়ে দাঁড়াতেন প্রতিবার। কিন্তু ভোট পেতেন হয়ত সর্বোচ্চ দশটি। কিন্তু তাই বলে আবেদা আপা আর তার মেয়ে ডরোথির সদাহাস্য মুখ কখনও ম্লান হয়নি। শুধু একবার ওনাকে কাঁদতে দেখেছিলাম। কাবুলিওয়ালা গল্পের যে অংশে ভুষি লাগানো হাতের ছাপ দেখে আকুল হয়েছিলেন মিনির বাবা, ওই অংশ পড়াতে পড়াতে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। সেই সুদূর শৈশবে প্রথম জেনেছিলাম, বই পড়েও মানুষ কাঁদে।

প্রথম আরো জেনেছিলাম একজন মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তানের মায়ের জীবন কেমন হয়! প্রাইমারি স্কুল শেষ করে আমার হাইস্কুল পর্ব শুরু হয় ক্লাস ফোর থেকে। হাইস্কুলে আমার প্রথম ক্লাসটিচার ছিলেন কামরুন্নাহার আপা। একদম দুধে আলতা গায়ের রঙ তাঁর। মেয়েটিও সেইরকম দেখতে। কিন্তু ও ছিল ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত। ওর জন্য সেই সময় সম্ভবত ভালো কোনো স্কুল ছিল না। ওকে বাসায় কারো ভরসায় রেখেও আসতে পারতেন না আপা। তাই সারাক্ষণ স্কুলে নিয়ে ঘুরতেন। ক্লাসে ক্লাসে নিয়ে যেতেন। কমনরুমে পাশে বসিয়ে রাখতেন। আপার হাসিমুখ তবু ছিল অমলিন।

অনেক শিক্ষকের আপত্তির মুখেও কামরুন্নাহার আপা যে তার কন্যাকে সঙ্গে রাখতে পারতেন- তার কারন বাসন্তি দিদি। এমন স্নেহ সুষমার কারণে ভয় পেলেও স্কুলের হলুদবর্ণা মেয়েদের সবচেয়ে প্রিয় নামটা ছিল- বাসন্তি দি। ঝড়ে গাছ থেকে পড়া আম দিয়ে উনি আচার বানিয়ে খাওয়াতে আমাদের। কতকাল আগের কথা! তবু সেই আচারের স্বাদ যেন মুখে লেগে আছে।

গৌর বর্ণ। কোকড়ানো চুল। স্লিভলেস ব্লাউজ পরতেন বাসন্তী দি সব সময়। । হাতে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে থাকতো নানারকম জিনিস। এই নদী-মাটি হাওয়া জলে বেড়ে ওঠা মানুষ তাকে মনে হত না। মনে হত বিদেশি। পড়াশুনা ও নানা কারণে জীবনের অনেকখানি সময় তিনি লন্ডনে ছিলেন। বাসন্তী গুহ ঠাকুরতার আরেকটি বড় পরিচয় শহীদ বুদ্বিজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার স্ত্রী তিনি। বরিশালের বানারিপাড়ায় ১৯২০ সালে জন্ম নেয়া অত্যন্ত মেধাবী এই মানুষটি ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকে নিহত হন। তখন তিনি জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের নয়টা মাস অবর্ণনীয়-অসহনীয় অবস্থার মধ্যে কাটাতে হযেছে বাসন্তী গুহ ঠাকুরতাকে। যার বিবরণ তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন ‘একাত্তরের স্মৃতি’ বইয়ে। সেই আঘাত বুকে নিয়ে বেড়ানো মানুষটি শেষ জীবনে এসে পান আরেক বড় আঘাত।

এই দম্পতির একমাত্র সন্তান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা স্বামী আর কন্যার দৃষ্টি ছিল  বৈশ্বিক। আর বাসন্তি দি সারাজীবন কাটিয়ে দেন এক বিদ্যালয় নিয়ে। জীবনের সমস্ত সোনালী সময় তিনি ব্যয় করেছেন স্কুলটির জন্য। প্রতিটি বিষয়ে তাঁর ছিল দৃষ্টি। স্কুলের মাঠে সামান্য একটা ময়লা পড়ে থাকলেও তিনি হাতে করে সেটা সরিয়ে রাখতেন। কিন্তু সারাজীবনের সমস্ত অর্জনের বিনিময়ে পুরস্কারের পরিবর্তে মিলেছে তিরস্কার। স্বীকৃতির পরিবর্তে অকৃতজ্ঞতা।

স্কুলের একজন হিন্দু শিক্ষকের সঙ্গে মুসলমান ছাত্রীর বিয়েকে কেন্দ্র করে কতিপয় ধর্মান্ধ-গোড়া শিক্ষকরা একজোট হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সরিয়ে দেন বাসন্তিদিকে। যে স্কুল ছিল তাঁর সমস্ত নি:শ্বাস-প্রশ্বাসের উপলক্ষ, সেই স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়ে বাসন্তি দি আর বেশী বাঁচেননি। ১৯৮৭ সালে একমাত্র কন্যাকে আরো একা করে চলে গেছেন পরপারে।

আজও স্কুলের কথা ভাবলে লম্বা প্রশস্ত বারান্দা দিয়ে বাসন্তী দি’র হেঁটে আসার দৃশ্য চোখে ভাসে। আমরা যে যেখানে থাকতাম, ফ্রিজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। একজন মানুষ যখন তাঁর জীবনের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেন একটি প্রতিষ্ঠানের পিছনে, তখন তিনি তো অন্যের সমস্ত শ্রদ্ধা ও সমীহ এমনিই কেড়ে নেন। শুধু এক-দুই বছর নয়, দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে কাজটা করেছেন বাসন্তী  দি। উনি যেন ছিলেন মনিজা রহমান স্কুলের প্রতীক। শুধু তাই নয় উনি ছিলেন একজন সমাজসেবী, প্রচণ্ড সংস্কৃতিবান একজন মানুষ। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে আমৃত্যু দেশসেরা গুনী শিল্পীদের নিয়ে বহু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন বাসন্তী দি এই স্কুলে।

একটা ছোট ঘটনার কথা মনে পড়ে। স্কুলে পড়ার সময় হিন্দি সিনেমার নায়ক-নায়িকার ভিউকার্ড কেনা ও সেটা জমানোর বাজে নেশা ছিল আমার। বান্ধবীদের দেখাবো বলে একদিন স্কুলে অনেকগুলো ভিউকার্ড নিয়ে এসেছিলাম। আজ এতদিন পরে ঠিক মনে নেই ভিউকার্ডসহ কীভাবে হাতেনাতে ধরা পড়েছিলাম বাসন্তী দি’র কাছে। তবে এইটুকু মনে আছে, নানারকম শাসন-তর্জনের পরে উনি বলেছিলেন- ‘তোমার নামে স্কুলের নাম, তোমাকে কি এসব মানায়?’

নামের মিল থাকলে কি দায়িত্ব বেড়ে যায়?  এটাকে কি নেমেসিস বলে? একটি স্কুলের নামধারী হয়ে অনেক মানানসই কিংবা মানানসই নয়, কাজ করেই জীবনের পথচলা। তবে কেউ যখন জিজ্ঞাসা করে, স্কুলটা কি আপনার বাবা দিয়েছেন, তখন খুব মজা লাগে। অথচ মনিজা রহমান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় স্কুলটি ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত। ট্রান্সকম গ্রুপের মালিক লতিফুর রহমানের মা মনিজা রহমানের নামে স্কুলটির নামকরণ। 

স্কুল জীবনে মানুষের মন থাকে কাঁদামাটির মতো। তাই হয়ত কোনো কিছু পোক্ত হয় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনই হল চেতনার উন্মেষকাল। ভালো-মন্দের আদর্শগুলো গড়ে ওঠে তখনই। সারাজীবন মানুষ সেটা বয়ে বেড়ায়। কলেজে ও পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পেয়েছি তেমন অসামান্য কয়েকজন শিক্ষককে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অনেক শিক্ষককে পেয়েছি, যারা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব মানের অর্থনীতিবিদ।

একাডেমির শিক্ষকের বাইরেও থাকেন অনেক শিক্ষাগুরু। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ও কণ্ঠশীলনে যুক্ত থেকে খুব কাছ থেকে দেখেছি আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যার, ওয়াহিদুল হক, নরেন বিশ্বাসকে। জেনেছি সেই পরম সত্যকে। সপ্তপদী উপন্যাসের নায়ক কৃষ্নেন্দু ওর শিক্ষক যেমন বলেছিলেন-

‘ঝর্ণার জলের কারাগার ভাঙ্গার ধারা আর মানব হৃদয়ের পক্ষে রুদ্ধ পথের ভাঙ্গার ধারা এক নয়।’

৪৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনে বহু রুদ্ধ পথের অর্গল ভেঙ্গেছেন বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা। লড়াই করেছেন কুপমন্ডুকদের বিরুদ্ধে। পুরনো ঢাকায় নারী শিক্ষা বিস্তারে তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা। এক জন্মে তিনি রেখে গেছেন জন্ম জন্মান্তরের চিহ্ন। আসলে স্কুলটাই শুধু আমার নামে। কিন্তু স্কৃলের প্রতীক একমাত্র তিনিই- বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা। আমাদের বাসন্তি দি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাঁর জন্য অনেক শ্রদ্ধাঞ্জলী।

লেখক: মনিজা রহমান, নিউইয়র্ক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত