বব ডিলানের নোবেল নিয়ে বিতর্ক কেন?

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
| আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৬, ১০:৪৫ | প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৬, ১০:২১

এক.

ড. মুহম্মদ ইউনূস আপাদমস্তক একজন ব্যবসায়ী, ব্যাংকার। পড়াশোনাও অর্থনীতিতে। তিনি আলোচনায় আসেন গ্রামীণ ব্যাংক দিয়ে। গ্রামীণ ব্যাংকের কারবার কী, সবার জানা। ঋণ বিতরণ। সুদসহ ঋণের টাকা আদায়। সুদ নিয়ে আপত্তি-অনাপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু ভূমিহীন, সহায়হীন, সম্বলহীন মানুষকে এক প্রকার কৌশলে জোর করে ঋণ দিয়ে তারপর সুদ আদায়, এটাকে মানবিক আচরণ বলা যায়? সে যাই হোক, নোবেল কমিটি ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনুসকে নোবেল পুরস্কার দিল। তাও আবার শান্তিতে! সুদের সাথে শান্তি, আর শান্তির সঙ্গে ড. ইউনুসের মিল আসলে কোথায়? যতটুকু জানি, সাধারণ ব্যাংকিংয়ের চেয়ে বেশি সুদ নিতো গ্রামীণ ব্যাংক। কে জানে এর মধ্যে শান্তির কি খুঁজে পেয়েছিল নোবেল কমিটি। ড. ইউনুসের নোবেল বাংলাদেশের জন্য গর্বের না বিব্রতকর; এ প্রসঙ্গে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। তবে সুদ ব্যবসায়ীর শান্তি প্রতিষ্ঠার হেতু আজও অজানা।

দুই.
২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনিত হয়েছেন মার্কিন গায়ক ও গীতিকার বব ডিলান। যার পোশাকি নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। জন্মলগ্নে বাংলাদেশ নামের শিশুটির জন্য কণ্ঠ সেঁধেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে নিউ ইয়র্কে সেদিন কনসার্ট ফর বাংলাদেশে জর্জ হ্যারিসন, রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্যাটারসন, রবিশঙ্করের সঙ্গে ৩০ বছরের যুবক বব ডিলানও ছিলেন। জীবনের প্রথম ৪০ হাজার দর্শকের সামনে গেয়েছিলেন ‘এ হার্ড রেইনস অ-গান ফল’, ‘ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড’, ‘জাস্ট লাইক আ ওমেন’ গানগুলো। যতটুকু জানি, যুদ্ধাহত দেশের বাস্তুহারা মানুষগুলোর জন্য অর্থ সাহায্য তোলা ও জনমত গঠনে করা কনসার্টের জন্য জর্জ হ্যারিসনকে আনুষ্ঠানিক সম্মান জানিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বব ডিলান?

বব ডিলানকে এবার সাহিত্যে নোবেল দেয়ায় বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে এনিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ছে। কেউ বলছেন, বেশ হয়েছে ‘গানের কবি’ নোবেল পাবে না তো কে পাবে? ১১২ বছরের ইতিহাসে কোনো জগৎখ্যাত শিল্পীর নোবেল বিজয়ে উচ্ছ্বসিত বাক্য ছড়িয়ে দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর পাতায় পাতায়। আবার কেউ খানিকটা মর্মাহত, ক্ষুব্ধ, বিরক্তও!!! নোবেল কমিটির অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য কয়েকজনের। এই বিতর্ককে কেউ নিচ্ছেন সাহিত্যের বিচারে। আবার কেউ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কনসার্টে বাংলাদেশের জন্য বব ডিলানের কণ্ঠ দেয়ার উদাহরণ তুলে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। সাহিত্যের বিচারে নোবেল দেয়া নিয়ে কয়েকজন আপত্তিও তুলছেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। তবে ভিন্ন কোন ক্যাটাগরিতে তাকে নোবেল দেয়া যেতো, তা কেউ বলছেন না।  

বব ডিলানের গানগুলো সাহিত্যের মানদণ্ডে এগিয়ে, বলা যায়। এগুলোকে গীতি কবিতা বলেছেন কেউ কেউ। নিজের কবিতাগুলো গানের মতো গেয়েছেন। কিন্তু এই ভাবনাটা আগে আমাদের খুব একটা নাড়া দেয়নি, যেমনটা আলোচনা হচ্ছে নোবেল পাওয়ার পর। সঙ্গীত যে সাহিত্যেরই অংশ, এই সত্যটা নতুন করে সামনে এনেছে ডিলানের নোবেল জয়।

রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউস নামের মেয়েটি তো ডিলানের নাম ঘোষণার সময় বলেছেন, তিনি মহানকবি। পুরস্কার তার প্রাপ্য। ডিলানের ‘দ্য টাইমস দে আর আ- চেইঞ্জিং’ গানটিকে তুলনা করা হয়েছে গ্রিস কবি হোমার আর শ্যাফোর সঙ্গে। ‘আমরা যদি ৫০০০ বছর পিছনে ফিরে যাই, আমরা হোমার আর শ্যাফোকে পাব।’ বলেন দানিউস। ‘তাদের গীতিকবিতা লেখাই হত গেয়ে শোনানোর জন্য। বব ডিলান একই কাজ করেছেন।’ এই নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক করতেও বারণ করে দিয়েছেন দানিউস! তবে কি তারা (নোবেল নির্বাচক কমিটি) আঁচ করতে পেরেছিলেন এনিয়ে বিতর্ক হতে পারে? আর এজন্যই কি আগে ভাগে বিতর্ক এড়াতে আহ্বান? নোবেল নিয়ে কি বিতর্কের শেষ আছে? সে কথায় পরে আসছি।

ডিলান যে বিশ্বে সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত নন, এটা ঠিক। তার পরিচয় গানে। আমাদের লালন, হাসন রাজা, রাধারমণের পরিচয়ও তো গানে। জীবনবোধ, সৃষ্টিকর্তা, আধ্যাত্মিকতা, প্রণয়, বিচ্ছেদ, মৃত্যুচিন্তা, দর্শন-কী নেই তাদের সৃষ্টিতে? একেকটি দীর্ঘ কবিতাও বলা চলে। তাদের এই কর্মকে সাহিত্য বলতে নিশ্চয়ই কারো আপত্তি নেই। তবে বব ডিলান নোবেল বিতর্ক কেমন বেমান হয়ে যায় না? ৭৫ বছর বয়সী ডিলান মার্কিন সঙ্গীতকে কাব্যিক মূর্চ্ছনার জায়গায় নিয়ে গেছেন। রক, ফোক, ফোক-রক, আরবান ফোক-কী নেই আয়ত্বে? তবে এও ঠিক বব ডিলানের নাম উচ্চারণের পর পর টনি মরিসন, টমাস মান, রুডইয়ার্ড কিপলিং, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা আর্নেস্ট হেমিংওয়ে কথাও আমার মনে আসতো না। এটা আমার অগভীর চিন্তার ফলও হতে পারে।

তবে ডিলানকে হঠাৎ করে সাহিত্যের বিচারে নোবেল দেয়া নিয়ে যে মৃদু বিতর্ক উঠেছে তার দায় সুইডিশ একাডেমির। উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, এখন মোট ছটি ক্যাটাগরিতে নোবেল দেয়া হয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য, শান্তি এবং অর্থনীতি। প্রতিবছরই নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিকে নিয়ে বিতর্ক হয়। এর পেছনে মূলত নোবেল কমিটিই দায়ী। কারণ, সমস্যা ক্যাটাগরিতে। প্রশ্ন, শুরু থেকেই একই ক্যাটাগরিতে কেন নোবেল দিতে হবে? অর্থনীতিতে নোবেলের ব্যাপারে আলফ্রেড নোবেল কিছু বলে যাননি। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটা চালু করেছে। তাহলে এখন প্রয়োজনে ক্যাটাগরিতে সংযোজন, বিয়োজন করা যাবে না কেন?

তিন.
১৯০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পান থিওডর রুজভেল্ট। অথচ সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবাজ নেতা হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। ১৮৯৮ সালে স্পেন-আমেরিকার যুদ্ধের সময় রুজভেল্ট কিউবায় একটি রেজিমেন্টের নেতৃত্ব দেন। এরপর ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায়ও তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি যেবছর নোবেল পান সেবছর ২৯ জনের একটা শর্টলিস্টে তার নাম ছিল। তিনি সবাইকে টপকে যান।  

১৯৭৩ সালে শান্তিতে নোবেল পান সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। ১৯৭৩ সালের ভিয়েতনাম শান্তিচুক্তিতে মধ্যস্থতা করায় নর্থ ভিয়েতনামের নেতা লি ডাক থোর সঙ্গে নোবেল পান তিনি। বিতর্ক ওঠার পর ওই নোবেল কমিটির দুই সদস্যই পদত্যাগ করেন। থো নোবেল নিতে অস্বীকৃতি জানান। কিসিঞ্জারও আর নোবেল নিতে অসলোতে যাননি।

২০ কক্ষের আলিশান প্রাসাদে গ্যাস ও বিদ্যুতের অতিরিক্ত অপচয়ের জন্য সমালোচিত ছিলেন মার্কিন রাজনীতিক আল গোর। অথচ তিনিই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি স¤পর্কে সচেতনতা বিকাশে ভূমিকা রাখার জন্য ২০০৭ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় সমালোচনা। সমলোচিত হয়েছে ২০০৯ সালে বারাক ওবামার নোবেল পুরস্কারটি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের মাত্র ১১ দিন পর মনোনয়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওবামা নিজেই জানান, ওই পুরস্কারের যোগ্য তিনি নন। বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে।

১৯৯৪ সালে নোবেল পান ইয়াসির আরাফাত, আইজ্যাক রবিন ও শিমন পেরেজ। অসলো চুক্তির পর ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের এই তিন ব্যক্তিত্ব মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল পান। কিন্তু এই তিনজনের অতীতই বিতর্কিত। ওই সময় বিতর্ক উঠলে নোবেল কমিটির সদস্যরা পদত্যাগ করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এখনো সুদূরপরাহত।
নোবেল পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক আর নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে ঢের আপত্তি আছে বিভিন্ন মহলে। বব ডিলানের বিতর্কটাও প্রায় একই ধরনের। বছর বছর নোবেল নিয়ে এত বিতর্কের জন্ম না দিয়ে, কথা কথায় পদত্যাগ না করে পদ্ধতিতে বা ক্যাটাগরিতে পরিবর্তন আনার কোনো উপায় কি নেই?

চার.
বব ডিলানের মতো একজন মহান শিল্পীর নোবেল পাওয়াটা মোটেও অমূলক নয়, নয় অযাচিতও। নোবেল পুরস্কারের বিচার টেবিলে গত কয়েকবছর ধরে তিনি আলোচনায় ছিলেন। তিনি নোবেল পেতে যাচ্ছেন, এমনটা প্রায় নিশ্চিত ছিল। পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে নিয়ে বিশ্বময় অহেতুক বিতর্কও উঠেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক সংবাদে বলা হয়েছে, নোবেল কমিটির প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফরাসি ঔপন্যাসিক পিয়েরে অ্যাসোউলিন। তিনি বলেছেন, আগে কয়েকবার ডিলানের নাম এসেছিল। তবে তা কৌতুক মনে হয়েছিল। ফরাসি এই ঔপন্যাসিক বলেন, ‘নোবেল কমিটির এই সিদ্ধান্ত লেখকদের প্রতি অবমাননাকর। আমি ডিলানকে পছন্দ করি। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকর্ম কোথায়? সুইডিশ একাডেমি নিজেদের হাস্যকর করে তুলেছে বলে মনে করি।’

স্কটিশ ঔপন্যাসিক আরভিন ওয়েলসও সমালোচকদের দলে। তিনি তার টুইটারে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। ডিলানের নোবেল জয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক সালমান রুশদি অবশ্য উচ্ছ্বসিত। তিনি টুইটারে লিখেছেন, অসাধারণ বাছাই। সংগীত ও কাব্য ঘনিষ্ঠভাবে স¤পর্কিত। আমি বলবো এই বিতর্কের জন্য, বব ডিলানের মতো একজন সাধককে সম্মানিত করতে গিয়ে বিতর্কি করার জন্য সুইডিশ একাডেমি দায়ী।

প্রতিদিন না হলেও যখন সুযোগ পাই তখনই বব ডিলানের গান আমি শুনি। তার গানের কথাগুলো দাগ কাটে হৃদয়ে। অনেক ভোর আমার শুরু হয় ডিলানের গান দিয়ে। আজ (শুক্রবার) সকালেও শুনছিলাম- `When you're sad and when you're lonely/ And you haven't got a friend/ Just remember that death is not the end.”   
জীবন-মৃত্যুবোধের গভীরে যে মানুষটা নিজেকে নিয়ে গেছেন, নিয়ে গেছেন তার শ্রোতাদের, তাকে নিয়ে বিতর্ক কেন? তার কর্মগুলো এতদিন সাহিত্যই ছিল। চিন্তাশক্তি ও বোধের জগতে আমরা ছিলাম পিছিয়ে। বাংলায় বব ডিলানের জন্ম হলে তাকে কবিয়াল বলা যেতো। যেহেতু লিখছি বাংলায়, তাকে কবিয়াল বললে তিনি অখুশি হবেন? সম্ভাবনা কম। কারণ তিনি বাংলা পড়তে পারেন বলে মনে হয় না। কবিয়ালদের নোবেল জয় সূচনা হল বব ডিলানকে দিয়ে। হায়! লালন সাঁই, হাসন রাজা, কবিয়াল রামকানাই দাশ, শাহ আবদুল করিম, প্রিয়নাথ বৈরাগী,  রাধারমন দত্তের কর্মগুলো যদি ইংরেজিতে অনুবাদ হতো! শুনেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘গীতাঞ্জলি’ নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। মূল্যায়ন তিনি পেয়েছেন।

লেখক: প্রধান প্রতিবেদক, সাপ্তাহিক এই সময়  

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত