জাতীয় সম্মেলন, সাজসজ্জা আর ঘুষের ক্যাশমেমো

মাসুদ কামাল
 | প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৬, ১৬:৫৫

আমাদের আশাবাদী করে তুলতে পারে, এমন ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব কমই ঘটে। কিন্তু গেল সপ্তাহে তেমনই একটা সংবাদ দেখলাম। এ মাসের ২২ ও ২৩ তারিখে দেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন। সম্মেলনকে সফল করে তুলতে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা আয়োজন চলছে। দলের মধ্যেই করা হয়েছে একাধিক উপ-কমিটি। এ রকমই একটা কমিটি ‘মঞ্চ ও সাজসজ্জা উপ-কমিটি।’ এই কমিটির প্রধান হচ্ছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী, দলের প্রভাবশালী নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি তার কমিটির সদস্যদের নিয়ে গত শনিবার (৮ অক্টোবর) গণভবনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে।
কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল এবারের জাতীয় সম্মেলন হবে দারুণ জাঁকজমকপূর্ণ। এত বেশি আড়ম্বরপূর্ণ করার কথা ছিল যে, বলা হচ্ছিল রীতিমতো নাকি মাথা ঘুরে যাবে সেটা দেখে। সেই মাথা ঘোরানো পরিকল্পনার কথা সবিস্তারে দলীয় সভানেত্রীকে জানাতেই সাজসজ্জা উপ-কমিটির এই যাওয়া। হয়ত তাদের মনে এমন আশাও ছিল যে, প্রস্তুতির বিস্তারিত বিবরণ শুনে সভানেত্রী তাদের বাহবা দেবেন, পিঠ চাপড়ে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে হলো ঠিক এর উল্টোটা। তিনি খুশি হলেন না। এত সাজসজ্জাকে বাহুল্য বিবেচনা করলেন। আর তারপরই করলেন সেই মোক্ষম প্রশ্নটি, ‘সম্মেলনের সাজসজ্জার এত অর্থ কোথায় পাও? এত অর্থ কোথা থেকে আসবে?’ এরপর তিনি আরো যোগ করেছেন, ‘আমি আগেই বলেছি চাঁদাবাজি করা যাবে না। খরচ হবে দলীয় তহবিল থেকে।’
একটা অনলাইন মিডিয়াতে এই খবরটা যখন দেখলাম, শুরুতে আমি কিছুটা চমকিত হয়ে পড়েছিলাম। একটু সন্দেহও সৃষ্টি হলো। আসলেই কি শেখ হাসিনা এমন কথা বলেছেন? যে রাজনীতি দেখতে দেখতে আমাদের চোখ পচে গেছে, যে রাজনৈতিক কর্মকা- দেখে দেখে আমরা মনেপ্রাণে কামনা করি আমাদের সন্তানরা যেন কোনোভাবেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহী না হয়, সেই রাজনীতিতেই এমন কিছু ঘটেছে? তেমনই একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রী এমন কথা বলেছেন? মিডিয়াগুলো মাঝেমধ্যে বাড়াবাড়ি করে, অতিরঞ্জিত করেও কিছু কিছু নিউজ করে। তেমন কিছু কি হয়েছে এক্ষেত্রে? না, তা বোধকরি হয়নি। কারণ, ওই নিউজটি প্রকাশিত হওয়ার পর এরই মধ্যে তিনদিন পার হয়ে গেছে, কেউ যখন কোনো প্রতিবাদ করেনি, তখন ধরে নেওয়া যায় ঘটনা সত্য।
এই দেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি মানেই এলাহী কা-। ঢাকা শহরে একটা জনসভা করার বাজেট কত? খরচের অনেক খাত। মঞ্চ তৈরি, ডেকোরেটরের ভাড়া, মাইক ভাড়া, জনসভার আগের প্রচারণা, কর্মীদের আসা-যাওয়া-খাবারের খরচ, কর্মী-সমর্থকদের হাত খরচÑ সব মিলিয়ে অঙ্কটা এমন দাঁড়াবে যে, আমাদের মতো মানুষের পক্ষে সে বিষয়ে ধারণা করাই হয়ত সম্ভব হবে না। মাঝারি মানের একটা জনসভা করতে গেলেও আজকাল কোটি টাকার উপরে খরচ আছে। তো এত টাকা আসে কোথা থেকে? এই প্রশ্ন কোনো দলকে, দলের কোনো নেতাকে করাই যাবে না। করলে প্রশ্নকর্তার দিকে এমনভাবে তাকানো হবে যেন তারা একটা নর্দমার কীটকে দেখছে। একটা জনসভারই যেখানে এত খরচ, তাহলে জাতীয় সম্মেলনে সেই অঙ্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
তবে আমরা আমজনতা এবার খুশি, খুব খুশি। কারণ এবার আমাদের হয়ে প্রশ্নটা করেছেন স্বয়ং শেখ হাসিনা। জানতে চেয়েছেন এত অর্থ কোথা থেকে আসবে? জানি না ওনার এই মোক্ষম প্রশ্নের কি জবাব দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। হয়ত দিয়েছেন, আমতা আমতা করে কিছু একটা বলেছেন। অথবা দেননি, বিব্রত ভঙ্গিতে মাথা চুলকেছেন। তবে তাদের সেই জবাব দেওয়া বা না দেওয়ায় বঙ্গবন্ধু-কন্যা যে সন্তুষ্ট হননি, সেটি বুঝতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। তাই তিনি বলেছেন, নো চাঁদাবাজি। পার্টি ফান্ড থেকে খরচ করতে হবে।
প্রশ্নটা কিন্তু আসলেই জরুরি। এত অর্থ কোথা থেকে আসবে? সাধারণত কোথা থেকে আসে? উত্তরটা খুবই সহজ। অর্থ আসবে চাঁদাবাজি থেকে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, রাজনৈতিক পা-াদের কাছে চাঁদাবাজি খুবই প্রিয় একটা কাজ। অনেকটা যেন এবাদতের মতো। দলের যেকোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে চাঁদা চাওয়া যায়। পাওয়াও যায়। দল যদি ক্ষমতায় থাকে তাহলে চাওয়ার এক রকম ভঙ্গি, আর ক্ষমতায় না থাকলে অন্য এপ্রোচ। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তাই মূল দল বা সহযোগী সংগঠনের একেবারে ওয়ার্ড পর্যায়ে একজন কর্মীও যদি চাঁদা দাবি করে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাহস অনেক বড় ব্যবসায়ীও করবেন না। অনেক সময় আবার ব্যবসায়ী সাহেব নিজে থেকেই দলীয় নেতাদের সেধে গিয়ে চাঁদা দিয়ে আসেন। কেন দিয়ে আসেন? এখানেই এসে যায় সেই গুরুত্বপূর্ণ সম্পূরক প্রশ্নটি, রাজনৈতিক দলকে অর্থ যারা দেয়, তারা সেটা কেন দেয়? দলকে ভালোবেসে, দলীয় আদর্শকে ভালোবেসে? আসলে ভালোবাসার চেয়ে এখানে ভীতি থেকে রক্ষা পাওয়া কিংবা অনৈতিক সুবিধা লাভের প্রত্যাশাটিই যে বেশি কাজ করে, সেটি বুঝতে তেমন পরিশ্রম করতে হয় না।

আচ্ছা, চাঁদার কি কোনো ক্যাশমেমো হয়? বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তাম, দেখতাম বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন তাদের কর্মীদের কাছ থেকে ক্যাশমেমো দিয়েই চাঁদা তুলছে। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো রসিদ দিয়ে গণচাঁদা তুলত। সাধারণ মানুষের কাছে যেত, নিজেদের রাজনীতির কথা বলত, এক টাকা দুই টাকা করে চাঁদা তুলত। বিনিময়ে রসিদ দিত। সেই টাকা আবার রসিদের সঙ্গে মিলিয়ে পার্টি অফিসে জমাও দিত। ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও কি তেমন কিছু করত? আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে এখন যে নেই, সেটা বলতে পারি নির্দ্বিধায়। ক্ষমতাসীন দলের কোনো প্রোগ্রামকে কেন্দ্র করে ধরা যাক চাঁদা তোলা হচ্ছে। একজন ব্যবসায়ী চাঁদা দিতেও আগ্রহী। হয়ত সেই দলের রাজনীতির প্রতি বিশ্বাস থাকার কারণেই আগ্রহী। চাঁদা হিসাবে মোটা অঙ্কের একটা অর্থ দেওয়ার পর তিনি কি কোনো রসিদ দাবি করতে পারবেন? ঘুষেরও কিন্তু কোনো ক্যাশমেমো হয় না। তাহলে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ আর রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের চাঁদাবাজি কি সমার্থক?
আসলে চাঁদাবাজির মজাটা এখানেই। আপনি কত তুললেন, কত জমা দিলেনÑ কেউ প্রশ্ন করবে না। দশ টাকা তুলে তিন টাকা পার্টিকে দিলেন, আর সাত টাকা পকেটে পুরলেনÑ জবাবদিহিতার কোনো সিস্টেমই নেই। এ কারণেই বোধকরি দুষ্ট লোকদের এই কাজে এত প্রবল আগ্রহ।
আর একটা কথা। লোকে ঘুষ দেয় কেন? অনৈতিক কিছু সুবিধা পাওয়ার জন্যই তো। তাহলে যে সব ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দেয় তারাও কি ওই রকম কিছু অনৈতিক সুবিধা পেতে চায়? যারা দ্বিতীয়বার দেয়, তারা কি প্রথমবারের বিনিময় মূল্যে সন্তুষ্ট হয়েই দেয়? কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ কি জনগণের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা নয়? কিছু লোককে অনৈতিক সুবিধা দিলে শেষ বিচারে গিয়ে কি সেটা জনগণের অধিকারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না? ব্যবসায়ীরা আর কিছু বুঝুক আর না বুঝুক, হিসাব-নিকাশটা বড় ভালোভাবে বোঝে। কাজেই কোনো ব্যবসায়ী যখন দশ টাকা চাঁদা দেবে, বিনিময়ে সে তার পঁচিশ টাকা প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করেই দেবে। সেক্ষেত্রে এই দশ টাকা তার বিবেচনায় চাঁদা নয়, বরং বিনিয়োগ।  
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী একটা দুর্দান্ত কথা বলেছেন। বলেছেন, সাজসজ্জার খরচ যা কিছু হবে পার্টি তহবিল থেকে করতে হবে। এটা ভালো, একেবারে নতুন ধরনের ভালো কথা। তিনি সব কিছুকেই একটা জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে চাচ্ছেন। রাজনৈতিক দলে চাঁদা, অনুদান থাকবেই। সারা দুনিয়াতেই এটা আছে। নয়ত দলটি চলবে কিভাবে? এটা তো আর কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। তাকে দলীয় নেতা-কর্মী আর শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েই চলতে হবে। কিন্তু সেই সাহায্যের একটা হিসাব থাকবে না? কে কত দিল তার যেমন হিসাব থাকবে, তেমনি প্রাপ্ত সেই অর্থ কিভাবে ব্যয় হলো, তারও হিসাব থাকতে হবে। যে মাত্র এক টাকাও দিল, সেও যেন জানতে পারে তার টাকাটা কিভাবে ব্যয় হলো। ব্যয়ের কারণ ও পদ্ধতি পছন্দ হলে আগামীতে সে হয়ত আরও বেশি অর্থ দিতে উৎসাহী হবে। এ জন্যই দলের একটা তহবিল থাকতে হয়। সেই তহবিলের চুলচেরা হিসাব-নিকাশও থাকতে হয়। বছর শেষে একটা অডিট রিপোর্টও থাকা লাগে। নয়ত সাধারণ মানুষের মধ্যে দলের প্রতি আস্থাটা আসবে কিভাবে?
সভানেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাজসজ্জা উপ-কমিটির নেতাদের প্রত্যাশা যে পূরণ হয়নি, সেটা বলাই বাহুল্য। তারা আসলে ভেবেছিলেন অন্যরকম। ভেবেছিলেন, জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের কথা শুনে দলনেত্রী বুঝি খুশি হবেন। তাদের ভাবনার উল্টো পথে হেঁটেছেন শেখ হাসিনা। আড়ম্বরের প্রতি তিনি তার বিরাগ প্রদর্শন করেছেন। এরই মধ্যে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের একাধিক সদস্য কাউন্সিলর হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই সদস্যদের প্রায় সবাই ব্রিটেন কিংবা আমেরিকায় বেড়ে ওঠেছেন। অনেকে বসবাসও করেন ওইসব দেশে। ওইসব দেশের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনাতে একধরনের নীতিবোধ সক্রিয় থাকে। তাহলে কি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আগামীতে একটা গুণগত পরিবর্তন আসছে?
উন্নত বিশ্বের রাজনীতির কথা যখন উঠলই, তখন বরং প্রাসঙ্গিক হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ে দু-একটা কথা বলে ফেলি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিক দলের প্রার্থী তিনি। একেবারে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও কৌতুকের জন্ম দিয়েছেন। তবে ভোটের বাজারে তার যে আচরণটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে সেটি হলো আয়কর প্রদানের হিসাব জমা না দেওয়ার বিষয়টি। নিজেকে অনেক ধনী হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু কত ধনী, কত অর্থ তিনি দাতব্য খাতে ব্যয় করেন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলেন না। জনগণ জানতে চায় তিনি কত আয় করেন, কিভাবে করেন। জানতে চায় অর্জিত সেই অর্থ কিভাবে ব্যয়িত হয়। অর্থাৎ আপনি যখন একজন পাবলিক ফিগার হবেন, আপনাকে তখন ট্রান্সপ্যারেন্ট হতে হবে। দলকে জনগণের দলে পরিণত করতে হলে দলের কাজকর্ম, আয়ব্যয়ের হিসাব উন্মুক্ত করতে হবে। দলের জন্য পা-াদের দিয়ে চাঁদাবাজি করানোর দরকার নেই, জনগণ নিজেই গিয়ে দলের জন্য চাঁদা দিয়ে আসবে। আপনার দায়িত্ব হবে তাকে একটা ক্যাশমেমো দেওয়া, আর বছর শেষে ট্যান্সপ্যারেন্ট একটা হিসাব প্রকাশ করা। নিয়ত ঠিক থাকলে এটা কোনো কঠিন কাজ নয়।
আর তা না হলে দেশজুড়ে চাঁদাবাজি হবে। মানুষের পকেট থেকে দশ টাকা যাবে, দলের ফান্ডে পৌঁছবে বড়জোর তিন টাকা। মন্দ লোকেরা চুরি-চামারি করে বিপুল অর্থ কামাবে, তা থেকে একটা অংশ দলকে দেবে, দলের তহবিল ফুলে ফেঁপে উঠবে। সেই অর্থে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে, কিন্তু এতে লাভটা কি হবে? সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বটেই, এমনকি দলের মধ্যে ন্যূনতম নীতিবোধও যাদের আছে, তাদের অস্বস্তি বাড়তে থাকবে।
বিবেচনায় রাখা দরকার, মন্দ লোকের টাকায় মসজিদ করা হলে মসজিদের একটা কাঠামো হয়ত দাঁড়াবে, তবে সেখানে দ্বিধাহীনচিত্তে নামাজ আদায় করতে বেশি লোক হয়ত যাবে না।

মাসুদ কামাল: সিনিয়র নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত