বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস

ইউজিসিতে জমা দেয়া তথ্যের মিল নেই বাস্তবে

মহিউদ্দিন মাহী, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৬, ১০:২৬ | প্রকাশিত : ০৭ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৪৮

দেশে একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি অনুমোদন নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাদের বেশির ভাগেরই নেই নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। অথচ স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকার বিধান প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে। সেই শর্ত পালনে উদাসীনতা দেখিয়ে যাচ্ছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়।

২০১০ সালে আইন পাস হওয়ার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তরের জন্য ইতিমধ্যে চার দফা সময় দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ চতুর্থ দফার সময়সীমা শেষ হচ্ছে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে। কিন্তু এ তিন মাস সময়ের মধ্যে সব কটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেয়া ‘আল্টিমেটাম’-এর পরিপ্রেক্ষিতে যারা স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপনে জমি কেনাসহ স্থাপনা নির্মাণসংক্রান্ত তথ্যাদি ইউজিসিকে দিয়েছে, সেগুলোর ৩০টি প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শন শেষ করেছে ইউজিসির পরিদর্শক দল। এখন চলছে প্রতিবেদন তৈরির কাজ।  

ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, সামনের মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হবে প্রতিবেদন। তার আলোকে ব্যবস্থা নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউজিসির একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, “৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশেরই অবস্থা শোচনীয়। ইউজিসিতে জমা দেয়া তথ্যের সঙ্গে কোনো মিল নেই বাস্তব অবস্থার।”

এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, “৩০টির মধ্যে ৮০ শতাংশই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারবে না।”

ইউজিসি বলছে, যারা নির্ধারিত সময়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারবে না, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় চাইলে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধসহ আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাটাইমসকে জানান, “এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগের চেয়ে কঠোর অবস্থায় আছে। যারা এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।”

ইউজিসি সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক মো. আখতার হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা ৩০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য-প্রমাণ সরেজমিন পরিদর্শন করে সচিত্র তথ্য সংগ্রহ করেছি।  এখন প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। আশা করছি এ মাসেই তা শেষ হবে।’

অধ্যাপক আখতার হোসেন বলেন, “আমাদের জনবল কম। সব বিশ্ববিদ্যালয় একসঙ্গে পরিদর্শন করা সম্ভব না। শুধু যেসব বিশ্ববিদ্যালয় তথ্য জমা দিয়েছে, সেগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসের বিষয়ে কোনো তথ্যই জমা দেয়নি।”

দেশে বর্তমানে সরকার অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৯৫টি । তবে এর মধ্যে ১০টির কার্যক্রম শুরু হয়নি।

২০১৪ সালে প্রকাশিত ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন করেছে। ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকটি নিজস্ব ক্যাম্পাসে আংশিক কার্যক্রম শুরু করেছে, কেউ জমি কিনেছে, কোনোটির জমি ট্রাস্টের নামে কেনা, কারো জমি শর্তের চেয়ে কম-এভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে চার দফা সময় বাড়িয়েও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থনান্তর করতে পারছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি।

তবে অনেকে বলছেন, “শিক্ষার্থী এবং উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকার কথা চিন্তা করে কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি। এ সুযোগটাই নিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি-নির্ধারকরা।  তারা সরকারের নিয়ম-নীতির বদলে ‘যত দিন চলা যায়’ নীতি মেনে চলছে।

জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকাটাইমসকে বলেন, “স্থায়ী ক্যাম্পাস একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত। অর্থাৎ  বিশ্ববিদ্যালয় চালুর আগেই স্থায়ী ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা করা উচিত। তা না করে কীভাবে শিক্ষাকার্যক্রম চালায় সেটাই আমি বুঝি না। একজন শিক্ষার্থী যদি শিক্ষার মনোরম পরিবেশই না পায় তাহলে সে কীভাবে নিজেকে বিকশিত করবে।”  এসব বিষয়ে সরকারকে অনুমোদনের শুরুতেই চিন্তা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিদেশে থাকায় এ বিষয়ে ইউজিসির সভাপতির বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ বিষয়ে ঢাকাটাইমসকে বলেন,  “ইউজিসির প্রতিবেদন হাতে পেলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার সাত বছরের মধ্যে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে। অথচ ২০ বছরেও নিজস্ব ক্যাম্পাসে যায়নি এমন প্রতিষ্ঠানও আছে।

এর আগে ১৯৯২ সালের আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার নির্দেশনা ছিল।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ পাস হওয়ার পর প্রথম ২০১২ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সময় বেঁধে দেয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় ২০১৩, তৃতীয় দফায় ২০১৫ এবং চতুর্থ দফায় ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়।

আইন অনুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য এক একর, অন্যান্য স্থানের জন্য দুই একর নিষ্কণ্টক, দায়মুক্ত ও অখণ্ড জমি থাকার বাধ্যবাধতকা নির্ধারণ করা হয়।

তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, “প্রতিষ্ঠার সাত বা পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রামে তিন বিঘা জমি কেনা এবং স্থাপনা নির্মাণ করা দুঃসাধ্য  ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা খুব প্রয়োজন। সরকার সহযোগিতা করলে নিজস্ব স্থায়ী জমিতে ক্যাম্পাস স্থানান্তর করার কাজটি অনেক সহজ হতো।”

(ঢাকাটাইমস/৭অক্টোবর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত