তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ...

কাওসার শাকিল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৬, ১৭:০৩ | প্রকাশিত : ১২ অক্টোবর ২০১৬, ১৫:১৬

১৯০৪ সালের একটি দৃশ্য। পাঁচ বছরের মেয়েটার সদ্য কাটা পড়া এক হাত আর এক পা সামনে নিয়ে বসে আছে বাবা। হতবিহ্বল একজন কালোমানুষ। পৃথিবীতে সাদা মানুষ কালো মানুষের সাথে কতটা নির্দয় হতে পারে সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা সেই বাবার ঠিকানা ছিল বেলজিয়ান কঙ্গো।

রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের সময় কঙ্গো, বেলজিয়ামের আয়ের বিরাট এক উৎস। মূল ব্যাবসা ছিল রাবারের। মোমের মতন নরম খাঁটি রাবারের সঙ্গে কয়লা মানে কার্বন মেশালে সেটা যে প্রায় অক্ষয় এক বস্তুতে পরিণত হয় সেটা আবিষ্কার হয়েছে তার কিছুকাল আগে। গাড়ির শক্ত চাকাকে সেই কালো বস্তুতে মুড়ে দিলে চলাফেরা হয় মসৃন।

টায়ারের তখন ব্যাপক চাহিদা। আর সেজন্য চাই মণকে মণ রাবার। পশ্চিমের সৌখিন রথের চাকা মুড়তে রাবারের মূল যোগানদাতা হল কঙ্গো। সেখানে প্রাকৃতিক ভাবেই রাবার হত, ব্যাপক চাহিদা দেখে শুরু হল বাণিজ্যিক চাষ। খামার ছিল সাদাদের। চাষ করতো তাদের কালো ক্রীতদাসেরা। কঙ্গোর আরেক নাম হয়ে গেল ‘রাবাররিজিম’ বা রাবারের সম্রাজ্য।

 

সেই সময় বেলজিয়ান কঙ্গোর রাবার বাগানের নিয়ম ছিল খুব সহজ। নিদৃষ্ট পরিমাণ রাবার মালিকের ঘরে জমা দিতে না পারলে ক্রীতদাসের ছেলে মেয়েদের এক হাত এক পা কেটে নেয়া হত।

এই ছবিটা যার তোলা সেই মানুষটার নাম এলিস সি লেহ্যারিস। তার লেখা ‘ডোন্ট কল মি লেডি: অ্যা জার্নি অফ লেডি এলিস সি লেহ্যারিস’। বইতে ঘটনাটার এ রকম একটা বর্ণনা পাওয়া যায়- লোকটার নাম ছিল এনসালা। তার জন্য নির্ধারিত রাবারের কোটা পূরণ করতে পারেননি বলে বেলজিয়ামের নিয়োগপ্রাপ্ত রাবার বাগানের কর্মকর্তা প্রথমে তার মেয়ের এক হাত আর এক পা কেটে নিল। মেয়েটার নাম ছিল বোয়ালী, বয়স পাঁচ বছর। হাত পা কাটার পর ওরা মেয়েটাকে মেরে ফেললো। তারপর মারলো তার স্ত্রীকে। সেটাও যথেষ্ঠ মনে না হওয়ায় এনসালার মেয়ে আর বউ দুজনকেই কেটে টুকরো টুকরো করে ওই গোষ্ঠীকেই খাইয়ে দিল। অবশিষ্ট যা ছিল সেটুকু রাখা হল এনসালাকে দেখানোর জন্য।

 

লোকটার জীবন এমনিতেই শেষ হয়ে গেছিল রাবাররেজিমের ক্রীতদাস হয়ে। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সেটুকুও শেষ হয়ে গেল তার সন্তান আর স্ত্রীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। সমস্ত নির্মমতার জন্য দায়ী মাত্র একজন মানুষ। যে কিনা সমুদ্রের ওপারে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে এই দেশটাকে নিজের জমি বলে দাবি করেছে। এই মানুষগুলোকে নিজের দাস বানিয়েছে। রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের লোভের শিকার হয়েছে তারা। অথচ তিনি একটাবারও ভাবলেন না এই মানুষগুলোও সেই একজনেরই সৃষ্টি, যে হাতে তার ই্‌উরোপীয়ান পরম্পরার সৃষ্টি, এরাও তারই সৃষ্টি, তার মতই মানুষ।

ঠিক কতজন রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের হাতে মারা পড়েছিল তার কোন সংখ্যা শেষ পর্যন্ত আর জানা যায়নি। তবে কঙ্গোর প্রায় এক কোটি মানুষ তাদের হাত পা হারায় রাবাররেজিমের পেট ভরাতে ব্যর্থ হয়ে। অথচ ২৩ বছরের শাসনামলে রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড একবারের জন্যও কঙ্গোয় পা ফেলননি। অতুলনীয় নিষ্ঠুর এই রাজাকে লোকে এখনোও কঙ্গোর কসাই বলে জানে।

মজার ব্যাপার হল লিওপোল্ড কঙ্গোর দখল নেয়ার সময় ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীকে বুঝিয়েছিলেন যে তিনি জনকল্যাণের জন্যই কঙ্গোর মালিকানা দাবি করছেন। তার আর কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু পরের ইতিহাস সবারই জানা। সেই ভূমির সমস্ত রস নিংড়ে, মাটির সন্তানদের মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে, সমস্ত সম্পদ লুট করে বেলজিয়াম যখন তাদের নিয়ন্ত্রণ আস্তে আস্তে তুলে নিল ততদিনে কঙ্গো এক ঘৃণার সম্রাজ্যে পরিণতহয়েছে। আভ্যন্তরীণ কোন্দলে ক্লান্ত এক দেশ। ইউরোপীয়দের ভাষায় ‘আনসেফ টেরিটরি’।


 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার উপেন নিজের দখল হওয়া বাস্তুভিটায় কুড়িয়ে পাওয়া তারই জমিতে লাগানো গাছের দুটো আম হাতে নিতে গিয়ে দখলবাজ জমিদারের কাছে চোরের আখ্যা পান। বড় আক্ষে তিনি বলেছিলন-

‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ,
আমি আজ চোর বটে।’


এ ঘটনাটা চোখে পড়ার পর খোঁজ নিয়ে দেখলাম মানবাধিকারের বিভিন্ন পরিসংখ্যানে (হিউম্যান রাইটস রিস্কইনডেক্স, জাতিসংঘের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট, ইত্যাদি) মানবিক দেশগুলোর মধ্যে বেলজিয়ামের অবস্থান ১৮ থেকে ২৫ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আর এ তালিকার প্রায়ত লানীতে পড়ে আছে একটা দেশ। বলেন তো দেখি সেই দেশটার নাম কি?

ঢাকাটাইমস/১২অক্টোবর/কেএস/ডব্লিউবি

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত