কোথায় হারিয়ে গেল ‘হুনহুনা হুনহুনা’

মো. শাখাওয়াত হোসেন, সিরাজদিখান (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি
 | প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৪৬

গ্রামের পথে ভেসে আসছে ‘হুনহুনা’ ‘হুনহুনা’ ধ্বনি। দূরাগত ধ্বনি কাছে আসতে দেখা যায় পালকি কাঁধে চার বেহারার ছন্দময় চলা। কনুই আধা ভাঁজ করা তাদের এক হাত আগে-পিছে দুলছে। তালে তালে পা ফেলে, সুরেলা ছন্দোময় ধ্বনি ছড়িয়ে তারা পালকিতে বয়ে নিচ্ছে নববধূ কিংবা বর। রঙিন ঝালর দেয়া আর নানা রঙের ফুল ও কাগজে সাজানো পালকির ভেতর ঘোমটা দেয়া বধূর মুখখানি দেখতে আশপাশের মানুষ এসে দাঁড়ায় রাস্তার পাশে। লাজুক মুখে নববধূও দরজার ফাঁক দিয়ে চোখ ফেলে বাইরে। গ্রামের পর গ্রাম ছাড়িয়ে বেহারারা তালে তালে ছুটে চলে তাকে নিয়ে যায় শ্বশুরবাড়ি। পালকির সেই দুলুনি আবেশ ছড়ায় গ্রামবধূর মনে।

এই দৃশ্য একসময় গ্রামবাংলায় দেখা যেত নিয়মিত। শুধু বধূ বহন নয়, অভিজাত শ্রেণির মানুষ ও রাজরাজড়াদেরও প্রধান বাহন ছিল পালকি। সেই পালকির ছিল কত না রূপ, কত না রকম।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বীরপুরুষ’ কবিতায় লেখেন, ‘মনে কর, বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে,/ তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে।’ পালকি নিয়ে তার আরেক কবিতায় আছে- ‘পালকি চলে, পালকি চলে, গগণতলে আগুন জ্বলে’। পালকি নিয়ে আছে গানও। কুমার বিশ্বজিতের একটি জনপ্রিয় গান এখনো শোনা যায়- ‘চতুর দোলায় চড়ে দেখো বধূ যায়, স্বপ্ন-সুখে তার চোখ দুটো উছলায়/হুনহুনা... হুনহুনা...’।

এখন আর সেই আবিষ্ট করা হুনহুনা ধ্বনি ভেসে আসে না কোথাও। গ্রামবধূর সেই লাজুক মুখ আর দেখা যায় না পালকির দরজার ফাঁক দিয়ে। কালপরিক্রমায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাহন পালকি আজ বিলুপ্তির পথে।

সংস্কৃত ‘পল্যঙ্ক’ বা ‘পর্যঙ্ক’ থেকে বাংলায় উদ্ভূত ‘পালকি’। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে এবং পরবর্তী সময়ে সেনাধ্যক্ষরা যাতায়াত করতেন পালকিতে চড়ে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পালকি ব্যবহার করতেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহে ছিল তার পৈতৃক জমিদারি। তিনি দীর্ঘদিন শিলাইদহে থেকে জমিদারি দেখাশোনা করেছেন। শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে এখনো সংরক্ষিত আছে তার ব্যবহৃত পালকিটি।

আধুনিক যানবাহন আবিষ্কৃত হওয়ার আগে অভিজাত শ্রেণির লোকেরা পালকিতে চড়েই যাতায়াত করতেন। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিয়েতে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে বর-কনের জন্য পালকি ব্যবহারের প্রথা চালু ছিল দীর্ঘদিন ধরে।

৭৫ বছরের বৃদ্ধা করিমন বেওয়ার মনে এখনো অনুরণন তোলে সেই হুনহুনা ধ্বনি আর দুলুনি।  মাত্র ১২ বছর বয়সে পালকিতে চড়ে বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর ঘরে এসেছিলেন তিনি। জীবনের সায়াহ্নে এসে এখনো তার মনে পড়ে সেই দিনের কথা।
তিনি বলেন, গ্রামেগঞ্জে বিয়ের বর-কনেকে পালকিতে তুলে বেহারারা বয়ে নিয়ে চলত তালে তালে। তাদের মুখ থেকে ছন্দে ছন্দে নিঃসৃত হতো ‘হুনহুনা’ ‘হুনহুনা’ সুর। চলার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুরের  তাল-লয়ও বদলাত। এ দৃশ্য আনন্দ দিত ছেলে-বুড়ো সবাইকে।

এখন আর সেই পালকি দেখা যায় না। কালে-ভদ্রে কেউ শখের বশে কিংবা অনুষ্ঠানে ভিন্নতা আনতে পালকির খোঁজ করেন বটে। কিন্তু বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য এই বাহনটির দেখা পাওয়া ভার।

পালকি বিভিন্ন আকৃতি ও ধরনের হয়ে থাকে। সেগুন কাঠ, শিমুল কাঠ দিয়েও বানানো হতো পালকি। বটগাছের বড় ঝুরি দিয়ে তৈরি করা হতো পালকির বাঁট।

সাধারণত তিন ধরনের পালকি বানানো হতো। সাধারণ পালকি, আয়না পালকি ও ময়ূরপঙ্খী পালকি।  সবচেয়ে ছোট পালকি ‘ডুলি’ বহন করে দুই বেহারা। বড় পালকি চলে চার বেহারা ও আট বেহারায়। এক বা দুজন যাত্রী নিয়ে বেহারারা পালকি কাঁধে ছুটে চলে পথ-ঘাট, মাঠ-প্রান্তর। আর ছড়িয়ে যায় হুনহুনা, হুনহুনা ধ্বনি।

(ঢাকাটাইমস/১৪অক্টোবর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত