মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রয়োজন

জিনাত আরা আহমেদ
 | প্রকাশিত : ০৯ অক্টোবর ২০১৬, ১৮:৪৮

সুস্থতা হলো শারীরিক-মানসিক এবং সামাজিকতার ভারসাম্যপূর্ণ মেলবন্ধন। তবে বর্তমানে শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে মানসিক সুস্থতাকেও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে অতি গুরুত্বের সাথে। কিছু কিছু অসুখ যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্রের রোগ এগুলোর পেছনে কখনো কখনো মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ইত্যাদিকে কারণ হিসেবে ধরা হয়। আবার মানসিক উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা থেকেও হতে পারে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগ। এসব কারণে চিকিৎসকরা বলেন সার্বিক সুস্থতার জন্য শারিরীক ও মানসিক রোগের সমন্বিত চিকিৎসা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শরীরের পাশাপাশি মনকে গুরুত্ব দিয়ে ১০ অক্টোবরকে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। সুস্থতার স্বরূপ উদঘাটনে প্রত্যেকেরই প্রয়োজন সার্বিক সচেতনতা।

বর্তমানে সামাজিক ও পারিপার্শি¦ক নানা কারণে মানুষ হৃদয়ের স্বাভাবিক প্রকৃতি হারিয়ে ফেলছে। কুসুম-কোমল, প্রাণপ্রাচুর্যে পূর্ণ, সংস্কৃতিবান, উদারচিত্তের বন্ধুহৃদয়ের আজ বড়ই অভাব। সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী এবং জননিরাপত্তায় হুমকিস্বরূপ কিছু অসুস্থ মানুষ যেন জনমনের আতঙ্ক। নিরীহ মানুষের প্রাণহানিসহ সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টের পেছনে রয়েছে ভ্রান্ত ধারণায় বিকারগ্রস্ত কিছুসংখ্যক লোক। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ব্যক্তি আর পারিবারিক জীবনকে দাঁড় করাচ্ছে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এসবের জন্য দায়ী মনের অজানা রোগ সম্পর্কে অজ্ঞতা। অসুস্থ মনের পরিণতিতে ঘটছে সন্ত্রাস এবং নাশকতার মতো ঘটনা।

আমরা সবাই চাই সুস্বাস্থ্য বজায় থাক। শারীরিক যেকোনো অসুস্থতায় আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, কিন্তু মানসিক সমস্যাকে আমরা আমলে নেই না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা যায়, আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৬ ভাগ যে-কোনো ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। আমাদের সবাইকে জীবনের কোনো-না-কোনো সময় সাময়িকভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। ব্যক্তিগত বা কর্মজীবনে বাধা মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেকে মানসিক অবসাদ ও উদ্বিগ্নতার শিকার হন। শারীরিক অসুস্থতা সম্পর্কে আমাদের মাঝে একটা স্পষ্ট ধারণা কাজ করে। এর বাইরে যেকোনো অসুস্থতা যে মানসিক সমস্যা থেকেও হতে পারে এ বিষয় ভাবতে আমরা অভ্যস্ত নই। কিন্তু, যখন দেখা যায় আমাদের স্বাভাবিক কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে, তখনই মানসিক অসুস্থতার প্রসঙ্গ আসে।

মানসিক সমস্যার রূপ নানা ধরনের। মন খারাপ, উদ্বেগ, ভয়- এগুলো স্বাভাবিক আবেগীয় প্রকাশ। দুঃখ বা ব্যর্থতায় যে কারো মন খারাপ হতে পারে। যে-কোনো দুঃসংবাদ, উৎকণ্ঠা এবং অনেকের ক্ষেত্রে কোনো প্রাণি, উচ্চতা বা অন্ধকারে ভীতিবোধ ইত্যাদিও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন তা স্বাভাবিক মাত্রাকে অতিক্রম করে ব্যক্তি জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে তখনই একে রোগ হিসেবে ধরা হয়। মানসিক রোগকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একটি নিউরোসিস, অন্যটি সাইকোসিস। মূলত বিষন্নতা, উদ্বেগাধিক্য, অহেতুক ভীতি, শুচিবায়ু প্রভৃতি নিউরোসিসের উদাহরণ। অন্যদিকে সাইকোসিস রোগীদের আচার-আচরণ, ব্যবহার-কথাবার্তা, ব্যক্তিত্ব এলোমেলো বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। বাস্তবের সাথে তাদের সংযোগ থাকে না। অনেকের মাঝে অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন কিন্তু দৃঢ় সন্দেহ দেখা দেয়। অনেকে গায়েবি আওয়াজ শোনে বা দেখে। তারা সাধারণত নিজেরা বুঝতে পারে না যে তারা রোগাক্রান্ত। আশপাশের মানুষের কাছে তাদের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়।

মানসিক সমস্যায় আক্রান্তদের মধ্যে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে দেখা যায় বিষন্নতা। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ এর হিসাবে বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ বিষন্নতায় আক্রান্ত। আমাদের দেশেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বিষন্নতায় আক্রান্ত রোগী রয়েছেÑ যার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ব্যক্তি জীবনের যেকোনো সময় এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। গবেষকরা বলেন, বিষন্নতা আত্মহত্যার জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মানসিক রোগ। এ রোগে আক্রান্তরা অধিকাংশ সময়ই মন খারাপ করে থাকেন। কোনো কাজে উদ্যম-উৎসাহ বা মনোযোগ থাকে না। ঘুম ও খাওয়ার রুচি কমে যায়। দিনে দিনে সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করলে আক্রান্তরা নিজেদের জীবনকে বোঝা মনে করতে থাকেন। সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। ফলে কেউ কেউ আত্মঘাতী চিন্তায় আচ্ছন্ন হতে হতে একপর্যায়ে কঠিন পরিণতির কাছে আত্মসমর্পণ করে ফেলেন। 

দুই.

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর (১৮ বছর ও তদুর্ধ্ব) শতকরা প্রায় ১৬ ভাগই যেকোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে উন্নয়নশীল দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় বরাদ্দকৃত বাজেট কমপক্ষে শতকরা ৫ ভাগ হওয়া উচিত। এ বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করে সরকার মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবার মডেল বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি ৬ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রায় ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। এখানে মানসিক সমস্যায় কাউন্সেলিং করা হয়। দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন হেলথ সেন্টার, ৫০৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়াও প্রতিটি জেলা সদরে হাসপাতাল এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ বিদ্যমান। এগুলোর বেশির ভাগেই মানসিক রোগ চিকিৎসার জন্য অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ রয়েছে।

সুস্থ, স্বাভাবিক সম্ভাবনাপূর্ণ জীবন পেতে হলে প্রতিটি মানুষের কিছু নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত থেকে নিয়মানুবর্তী জীবনযাপন ব্যক্তিকে নতুন আশায় উজ্জীবিত রাখে, সুখী হতে সাহায্য করে। প্রতিদিন গোসল, নিয়মিত দাঁত ব্রাশ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সাথে সুষম খাবার, পুষ্টিকর খাদ্যাভাস এবং নিয়মিত ব্যায়াম সুস্বাস্থ্যের প্রধানতম বিষয়। অনিয়মিত খাবার গ্রহণ যেমন গ্যাসট্রিক-আলসারসহ শারীরিক অসুস্থতার কারণ তেমনি তা মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়। আবার রাত জাগা দিনে ঘুমানো মস্তিস্কের বায়োলজিক্যাল ক্লক এলোমেলো করে দেয়। ফলে উদ্যমের অভাবে জড়তা এসে ভর করলে কোনো কিছুই ভালো লাগে না। ক্ষুধা-ঘুম অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এভাবেই মানসিক অবসাদে ভোগে। এজন্য মনের রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকাটা খুব দরকার। পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহ, সন্দেহ প্রবণতা, মিথ্যা বলা, অহেতুক হিংসা, কুটিলতা, অন্যায়ভাবে অন্যের ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, পেশা জীবনে অনৈতিকতার চর্চা, অধিক বিলাসী জীবনের মোহ মনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। এটা এক ধরনের ব্যাধি, যা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। মনের অজান্তে মানুষ আরো গুরুতর পাপ কাজের দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির অমোঘ নিয়মে প্রকৃতির অভিশাপ মানুষকে ধ্বংসের দিকে টানে। নিজের ক্ষতির সাথে সাথে পরিবার-সমাজের ক্ষতিও যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা খুবই প্রয়োজন।

-পিআইডি ফিচার

সংবাদটি শেয়ার করুন

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত