ইতিহাসের আলোকে আশুরা

আমিনুল হক সাদী
| আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৬, ১৯:১০ | প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৬, ১৯:০৭

ইসলামের ইতিহাসে আশুরা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র হাসান (রা.) এর দুই ছেলে কাসেম ও মুহাম্মদ এবং হযরত হুসাইন (রা.) ও তার পরিবারবর্গ,সঙ্গী-সাথীসহ মোট ৭২ জন কারবালার প্রান্তরে শাহাদাৎ বরণ করেন। মুহাররম ইসলামী বা হিজরি বর্ষের প্রথম মাস। এর অর্থ পবিত্র ও নিষিদ্ধ মাস। হযরত মুহাম্মাদ (স.) এর সময়ে ও ইসলামপূর্ব যুগেও এ মাসে যুদ্ধ করা ছিল বেআইনি (হারাম)। এ মাসের ৯ ও ১০ তারিখ সিয়াম পালন করার নির্দেশ হাদীসে আছে।

রমজানের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে আশুরার (১০ তারিখ) রোযা রাখা ফরয ছিল। মুহররমের প্রথম দশ দিন শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন হযরত মুহাম্মদ (স.) এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের জন্য আশুরাকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে। মুহররম মাসের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়।

৬১ হিজরির ১০ মুহররম মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর মেয়ে খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা) ও হযরত আলী (রা)-এর ছেলে হযরত হুসাইন (রা) তার পরিবারবর্গ, সঙ্গী-সাথীসহ কারবালা প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। তাদের লোমহর্ষক শাহাদাতের ঘটনার কারণে ১০ মুহাররম মুসলমানদের হৃদয়ে শোকাবহ হয়ে আছে।

উমাইয়া খলিফা মুআবিয়ার (রা.) ছেলে ইয়াজিদের সৈনিকদের হাতে ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদত বরণ করেন। শিয়ারা এদিন ইমাম হুসাইনের সমাধির প্রতীক তাজিয়া নিয়ে মিছিল করে। শোক প্রকাশের জন্য তারা বুক চাপড়ায় অথবা ছুরি বা চেইন দিয়ে নিজেদের শরীরে আঘাত করে। খৃষ্টীয় দশম শতক থেকে সর্বজনীনভাবে মুহররম পালিত হয়ে আসছে। বাংলায় কয়েকশ বছর ধরে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

ঢাকার হোসনী দালান ইমামবাড়া মুহররমের মূল কেন্দ্র। শিয়ারা মুহররমের প্রথম দশদিন শোকের প্রতীক কালো পোশাক পরিধান করে। এ সময় তারা আনন্দ-ফুর্তি করা, গান শোনা বা নাটক-সিনেমা দেখা থেকেও বিরত থাকে। এ মাসে তারা বিবাহের আয়োজনও করে না। শিয়াদের কেউ কেউ এ সময় হুসাইন এবং তাঁর অনুসারীদের পানির কষ্টের কথা স্মরণ করে মাছ খাওয়া থেকেও বিরত থাকে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়,বাংলায় আঠার শতক জাঁকজমকপূর্ণভাবে মুহররমের মিছিল বের হতো। তাতে ঘোড়া এবং হাতিও ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে তা অনেকটা সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে। ঢাকায় এই মিছিল হোসনী দালান থেকে শুরু হয় এবং বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে নির্মিত কৃত্রিম কারবালায় এসে শেষ হয়। মিছিলে দুলদুল ও পতাকা বহনের মাধ্যমে ইমাম হুসাইনকে স্মরণ করা হয়।

মুহররমের সময় হুসাইন ও ইয়াজিদ বাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধেও স্মরণে লাঠিখেলা প্রদর্শন করা হয়। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামেও বৃহত্তর তাজিয়া মিছিল বের করে সেখানকার লোকজন। এতে জেলাসহ আশপাশের জেলার লোকজন অংশ নেন। এ উপলক্ষে মহররমের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা শহরের হারুয়ায় তাজিয়া মিছিল বের করে। এছাড়াও বৌলাইয়ে ঝাকঝমকভাবে তাজিয়া মিছিল বের করে। কারবালার জারি পরিবেশন করে বৌলাই পীরবাড়িতে। এটি পরিচালনা করেন বৌলাই ইউপি চেয়ারম্যান আওলাদ হোসেন।

১০ মুহাররম এবং তার আগে বা পরে এক দিন দুটি রোজা রাখা ইসলামের আদর্শ। রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার সিয়াম পালন করেছেন ও উম্মতগণকে পালনের আদেশ দিয়েছেন। এটিই মূলত ১০ মুহাররম আশুরার ইবাদতের শরয়ি বিধান। হযরত হুসাইন (রা) হযরত আলী (রা)-এর দ্বিতীয় পুত্র। চতুর্থ বা পঞ্চম হিজরিতে তিনি মদিনায় জন্ম নেন। তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হযরত হাসান (রা)। পিতা হযরত আলীর (রা) মৃত্যুর পর তিনি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে মদীনায় নির্জন জীবন-যাপন করেন। মুআবিয়ার রাজত্বকালে হাসানের (রা) মৃত্যুর পর হযরত আলীর (রা) অনুগতদের নেতৃত্বপদ গ্রহণের জন্য ইরাকি সমর্থকদের অনুরোধ গ্রাহ্য না করে তিনি উমাইয়াদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেন। তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হাসানের (রা) অধিকতর হৃদ্যতাপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণ প্রদর্শন করে ইসলামের মহান আদর্শ বুকে ধারণ করেন।

ইয়াজিদ সিংহাসন আরোহন করলে এবং ইরাকি সমর্থকরা পুনরায় নেতৃত্বপদ গ্রহণের আবেদন জানালে তিনি আবেদনে সাড়া দিয়ে তদীয় জ্ঞাতী ভ্রাতা মুসলিম ইবনে আকীলের সাহায্যে পরিস্থিতি যাচাই করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুসলিম ইবনে আকীল ইরাকে গমন করলে হাজার হাজার শিয়া তার সামনে উপস্থিত হয়ে হুসাইনের (রা) প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শপথ গ্রহণ করে। মুসলিম ইবনে আকীল সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে হযরত হুসাইনকে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তাকে (হুসাইন) ইরাকে গমনপূর্বক আন্দোলনের ভার গ্রহণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। চিঠি পাওয়ার পর হযরত হুসাইন (রা) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং পথিমধ্যে ইরাকের নবনিযুক্ত শাসনকর্তা উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ কর্তৃক তার দূত মুসলিম ইবনে আকীলকে বন্দী করে হত্যা করা হয়েছে বলে সংবাদ পান।

শাসনকর্তা উবায়দুল্লাহ হিজায থেকে ইরাক পর্যন্ত সড়কে ফাঁড়ি ও অশ্বারোহী সেনাবাহিনী প্রহরা ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। হুসাইন (রা) তাদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন কিন্তু মাঝপথে যাত্রা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানালে উবায়দুল্লাহ’র বাহিনী তাদের সঙ্গে অগ্রসর হতে থাকে। একপর্যায়ে তারা কারবালা প্রান্তরে পৌঁছলে উবয়দুল্লাহ বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন। উমাইয়া শাসনকর্তা আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ফুরাত নদীর পানি পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিলেন। পানি তৃষ্ণায় হুসাইন (রা)-এর সঙ্গী-সাথীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠে। সেনাপতি উমার ইবনে সাদ এর পক্ষ থেকে হুসাইনকে আত্মসমর্পণ করার আহবান জানানো হয়। হুসাইন (রা) রাজি না হওয়ায় শুরু হয় যুদ্ধ। তার প্রিয় লোকজন আত্মসমর্পণ করতে চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না, হুসাইন (রা) গুরুতর আহত হলেন এবং তার মস্তক ছেদন করা হলো। নির্মম ও লোমহর্ষক এই হত্যাযজ্ঞ বিশ্ব ইতিহাসে একটি জঘন্যতম অধ্যায়ের স্বাক্ষী হয়ে আছে।

আমিনুল হক সাদী, লেখক ও গবেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

ইসলাম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত