অচেনা আপন

মোহাম্মদ অয়েজুল হক
 | প্রকাশিত : ১৪ অক্টোবর ২০১৬, ২১:৪৮

কালই খবরটা জেনেছে সিমি। তারপর আর একটুও ঘুমাতে পারেনি। চোখজুড়ে দুঃস্বপ্ন। বাঁধন কিভাবে করলো কাজটা! এতোকিছুর পর আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুললো? অথচ ওকে নিয়ে সিমির সব স্বপ্ন। বুকে আঁকা, গাঁথা। স্বপ্নগুলো ঝলসে গেল সাবিহার কথায়, ‘সিমি এখন কী হবে তোর!’

‘অপেক্ষায় আছি, বউ করে ঘরে তুলবে। বিয়ে তো অনেক আগেই হয়ে গেছে। দু’জন সাক্ষীর সামনে আমাকে বউ বলে স্বীকার করেছে।’

সাবিহা কেমন করে যেন হাসে। কষ্ট মেশানো হাসি। সিমি বলে যায়, ‘আমার তো বাবা-মা থেকেও নেই।’

‘জানি।’ জবাব দেয় সাবিহা।

সাবিহা সিমির খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওর প্রায় সব কথাই জানে সাবিহা। জানে একটা দুঃখী মেয়ে সিমি। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত। ভালোবাসা পায়নি। ভালোবাসার জন্য অদ্ভুত ধরনের পাগল একটা মেয়ে। কেউ যদি ওকে সামান্য ভালোবাসা দেয়, তাকে খুব আপন ভাবে ও। নিজেকে তার জন্য উজাড় করে দেয় কাউকে চরম-পরম আপন হিসাবে না পাওয়ার জন্মগত আকাঙ্ক্ষা থেকে। সিমি যখন ছোট তখন ওর বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বাবা নাকি অর্পণা নামের এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। একই সাথে চাকরি করতো মেয়েটা। সিমির মাকে ছেড়ে দিলেন আর তার কিছুদিন পরই অর্পণার সাথে বিয়ে হয় সিমির বাবার। ঘর বাঁধেন অর্পণার সাথে। সিমির মা কয়েকদিন বাবার বাড়িতে ছিলেন। পরে ভাইরা থেকে বোনের বিয়ে দেন অন্য একটা ছেলের সাথে। সিমি থেকে যায় তার নানা বাড়ি।

কতোটুকুইবা বয়স তখন! তোতা পাখির মতো কয়েকটা কথা বলতে শিখেছে মাত্র। আব্বু- আব.... বা, আম্মু- আম ... মা। না, মিষ্টি কণ্ঠে প্রথম যাদের ডেকেছে সে মানুষগুলো তাদের স্নেহ- ভালোবাসা, মমত্ব দিয়ে তাকে বড় করেনি। নিজেদের প্রয়োজনে, স্বপ্ন পূরণের জন্য সিমিকে ফেলেই ছুটেছে। সিমি কয়েকদিন ডাকে বাবা, আ....ম্মু। বা....বা। কাঁদে। ওর কচি কণ্ঠ শুনে নানি ছুটে আসেন। কোলে নেন, আদর করেন। তারপর থেকে সিমি বোবা হয়ে যায়। বাবা-মা দুটো শব্দের বোবা। শৈশব থেকে বাবা-মাকে ডাকতে না পারার কষ্টটা কাউকে বোঝাতে পারে না সিমি। সিমিকে নীরব থাকতে দেখে সাবিহা ডাক দেয়, ‘সিমি।’

 ‘হ্যাঁ।’ ‘বাঁধন তোর সাথে প্রতারণা করেছে।’

 ‘আরে না।’

 সিমির কণ্ঠে দৃঢ়তার পরশ। ‘বাঁধনকে আমি জানি সাবিহা। ওর সব জানি। আমার সাথে প্রতারণা করতেই পারে না।’

 ‘পেরেছে।’

 ‘কী বলতে চাস তুই!’

‘বাঁধন বিয়ে করেছে গতকাল। ওর ঘরে নতুন বউ।’

সিমির কষ্ট হয়। বুকের ভেতর ব্যাথা করে ওঠে। এই ব্যাথাটাই ওর আপন। সেই শৈশব থেকে ওর সাথেই লেগে আছে। বুকের ভেতর বসে সুর করে গান করছে। বাঁধনের কাছে যাবে সিমি। সাবিহার কথাকে মিথ্যা ভেবে নয়, যাবে তার মুখটা দেখার জন্য। কী সুন্দর বাঁধন। সিমির চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নিজের অজান্তেই। সাবিহা সিমির হাত ধরে। ‘কাঁদছিস?’

‘হ্যাঁ।’ মাথা নাড়ে সিমি।

‘কেন?’  প্রশ্ন করে সাবিহা। ‘একটা জানোয়ারের জন্য কান্না কিসের?’

 ‘না না, বাঁধন খুব ভালো। খুব ভালো সাবিহা।’

‘দেখ সিমি, ওর কিন্তু ওপরটাই সুন্দর।’

 ‘অসুন্দর কী?’

 ‘তুই বুঝিস না!’

 ‘আমি ওর সবকে সুন্দর বুঝি।’

 ‘তুই একটা পাগলি। একটা একটা করে গোন আমি ওর এক হাজার খারাপ বলি। নাম্বার ওয়ান....’

 ‘সার্টআপ ফ্রেন্ড। র্সাটআপ।’ সাবিহা থেমে যায়। আর কী বলবে সে! কিভাবে বোঝবে অবুঝ মানুষকে। আবার কথা বলে সিমি, ‘ফুল কেন ফোটে জানিস?’

 ‘না জানি না।’

‘ঝরে যাবার জন্য। কেউ যদি পাপড়িগুলো ঝরে পড়ার আগে ফুলকে বুকে নেয় তো ফুলের সৌভাগ্য। সে তো পরের জন্যই ফোটে। আমি বনফুলরে....’কেঁদে ফেলে সিমি।‘ বনের ফুল সবার অজান্তেই ফোটে আবার অজান্তেই ঝরে যায়। তাকে কেউ ভালোবেসে বুকে টেনে নেয় না।’

`কাদিস না ‍সিমি। সব ঠিক হয়ে যাবে। একটা কথা ভাব বাঁধন যদি তোকে ছেড়ে থাকতে পারে তুই কেন পারবি না?’

‘পারবো’ হঠাৎ কেমন কঠোর হয়ে যায় সিমি। ‘ওকে ছেড়েই থাকবো আমি।’

‘ভেরি গুড। এই তো ভালো মেয়ের মতো কথা বলেছিস। সাবিহা খুশি হয়।’

 সন্ধ্যা নামার আগেই ওরা বাড়ির দিকে রওনা দেয়। সাবিহার বাবা-মা খুব কড়া প্রকৃতির। খুব কড়া। মেয়েকে শাসন করেন। খোঁজখবর নেন। অধিকাংশ বাবা-মা ই তো সেরকম। সিমিকে কেউ শাসন করেনি কোনোদিন। খোঁজখবর নেয়নি। বড়জোর এতটুকু, অনেক রাত করে ঘরে ফিরেছে, মামা কিংবা মামি বললেন, কোথায় ছিলি সিমি? সংক্ষেপে একটা জবাব, এই তো এক বান্ধবির বাড়িতে গিয়েছিলাম। ব্যস শেষ।

অবশ্য মামা-মামির দোষ দেওয়া চলে না। আর নানি তো বৃদ্ধ মানুষ। তারা সবাই চাইতো অনাথ দুঃখী মেয়েটা কখনো যেন একটুও কষ্ট না পায়। সব সময় ওর সাথে হাসি মুখে কথা বলেছেন। এমন মামা-মামি পাওয়াটাও সৌভাগ্যের ব্যাপার। সিমির মামা অ্যডভোকেট মানুষ। মামি গৃহিনী। তাদের সংসারে এক বৃদ্ধ মা আর সিমি। ডাক্তার বলেছেন, মামি মহিলাটা নাকি বন্ধ্যা। কোনোদিন তার সন্তান হবে না। মামি বন্ধ্যা জানার পরও মামা আর বিয়ে করেননি। মামি বরাবরই বলে আসছেন আর একটা বিয়ে করতে। কতো অনুরোধ করেছেন, প্লিজ আর একটা বিয়ে করো। কেন! মামার বেরসিক প্রশ্ন। আমি তোমার আশা পূরণ করতে পারছি না। মামা হাসতে হাসতে বলতেন, আমাদের সিমি আছে না। সিমি তো বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে। মামার মনটা খারাপ হতো তখন। মুখটা কালো হয়ে যেত। বেশ মলিন।

আজ রাতেই বাঁধনের কাছে যাবে সিমি। শেষবারের মতো ওকে কিছু কথা বলবে। বিনীতভাবে ওকে পাওয়ার প্রার্থনা জানাবে। বাঁধনদের বাসা ওদের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। একটা ভাড়া বাড়িতে থাকে ওরা। চাকরির জন্য সেই মাধবপুর থেকে এখানে এসেছে। বাঁধন আর ওর মা। বাবা-ভাইরা থাকেন গ্রামে। সিমি গেট পেরিয়ে রাসত্দায় পা দেয়। চিরচেনা রাসত্দাটাকে কেমন অচেনা মনে হয়। একা একা হাঁটে।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাঁধনদের ভাড়া বাড়ির সামনে পৌঁছে যায় সিমি। একতলা চার রুমের একটা সাদা বিল্ডিং। একটা ডাইনিং রুম, একটা গেস্ট রুম আর দুটো রুমে ওরা দুজন থাকে। বাড়িটা, বাড়ির দুজন মানুষ এমনকি প্রতিটি জিনিসপত্রের সাথে সিমির ঘনিষ্ঠতা ছিল, সখ্যতা ছিল, ভালোবাসা ছিল। বাইরে দাঁড়িয়ে কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলে দেন বাঁধনের মা। সিমিকে দেখে মোটেও অবাক হন না ভদ্র মহিলা। মুখে হাসি টেনে বলেন, এসো, ভেতরে এসো। সিমি ভেতরে যায়। গেস্ট রুমে গিয়ে বসে দুজন। বাঁধনের মা একটু উচ্চস্বরে বলেন, বউ মা নাস্তা নিয়ে এসো।

সিমি চমকায় না, অবাক হয় না। এই ঘরে তার ছেলের সাথে থেকেছে সিমি। ভদ্রমহিলা কোনোদিন কিছু বলেননি বরং প্রশ্রয় দিয়েছেন। সিমির সাথে তো ওদের পুরানো কোনো শত্রুতা ছিল না। ওরা এমন প্রতারণা করলো কেন? লোভ চাপিয়ে রাখতে পারেনা সিমি। ঝাঝালো কণ্ঠে বলে, বাঁধন বিয়ে করেছে? হ্যাঁ, কেন তোমাকে বলেনি? আমাকে তো বলে এসেছে আমি তার বউ। কেন আপনি কিছু জানতেন না!

ওসব ছেলেমানুষি বাদ দাও মেয়ে। পণ্ডিতের মতো কথা বলেন বাঁধনের মা।

লাল শাড়ি পরা একটা মেয়ে বিস্কুট, চানাচুর..  নিয়ে রুমে প্রবেশ করে। বাঁধনের বউ। এদের বউ আবার দুই প্রকার। একটা ঘরের বউ আর একটা বাইরের ! একটা না অনেক। সিমি মেয়েটাকে দেখে। বেশ সুন্দরী মেয়ে।

ওর কপাল ভালো নাকি খারাপ! সিমি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। আপনার ছেলে কোথায়? প্রশ্ন করে সিমি।

কেন? তার সাথে আমার কথা আছে।

কিসের কথা?

আমার সাথে কেন প্রতারণা করলো শুধু এই প্রশ্নটা করবো।

আমার ছেলে কারও সাথে প্রতারণা করেনি।

আপনিও করেছেন।

কী বলতে চাও তুমি? বেশ গরম মেজাজে কথা বলেন বাঁধনের মা।

সিমির কেন যেন কান্না আসে না। মেজাজ খারাপ হয়।

বাঁধনের নতুন বউটা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছে। মা সিমির কণ্ঠস্বর হঠাৎ পরিবর্তিত হয়। ওর সাদা মুখে যেন একরাশ কালবৈশাখীর ঘন কালো মেঘ জমা হয়। আমি বড় দুঃখী সেই ছোটবেলা থেকেই। বাবা-মাকে পাইনি কোনোদিন। ওনারা কোনোদিন দেখতে আসেনি তার মেয়ের দুঃখ-ব্যাথা। বাঁধনকে পেয়ে, বাঁধনকে নিয়ে আমি সব ব্যথা ভোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম।

সিমি দুঃখ ভরা হাসি হাসে। আবার বলে, আমি চলে যাচ্ছি। আপনার ছেলেকে বলবেন সে যেন আমাকে তালাক দিয়ে দেয়।

কথা শেষ করে সিমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। ইচ্ছা করে রাস্তায় গড়াগড়ি খেয়ে কাঁদতে। রাতের অন্ধকার রাস্তা। আকাশে কি চাঁদ উঠবে! পূর্ণিমা। একটা কালো কুকুর একটা লাল কুকুরকে দাবড়ায়। লাল কুকুরটা দ্রুত গতিতে সিমির পাশ দিয়ে দৌড়ে পালায়। কালো কুকুরটা পেছনে। পরমুহূর্তে সেও সিমিকে অতিক্রম করে। সিমির ভয় করে না। কেমন বিশ্রী শব্দ করে প্রায় একই রকম গতিতে দৌড়াচ্ছে দুটো প্রাণি। একটা পালাচ্ছে, আরেকটা ধাওয়া করছে। মানুষ কি মানুষকে ধাওয়া করে? দাঁত মুখ সিটকিয়ে আক্রমণ করে! কামড় দেয়! বিষাক্ত কামড়?

পাঁচ মিনিটের পথ হেঁটে আসতে সিমির আধাঘণ্টা লাগে। বিড়ালের মতো নিঃশব্দে হেঁটে হেঁটে আসে। নিজের রুমে এসে অনেক কিছু চিন্তা করে। ওর গর্ভে বাঁধনের সন্তান। কাকে বলবে ওর ব্যথা, কে বুঝবে? ভাবতে ভাবতে এক সময় হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে।

সিমির কান্না শুনে মামা-মামি, নানি সবাই ছুটে আসে। মামা কোর্ট থেকে ফিরেছেন একটু আগে। কান্ত শরীর তার মুখ দেখে বোঝা যায়। সিমির পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কিরে সিমি কাদঁছিস কেন?’ সিমি কাঁদে। কিছু বলতে পারে না। সারাদিন কষ্ট করে বাড়ি ফেরা ভদ্রলোক সিমির মাথায় হাত রাখেন।

 ‘মারে আমি তোর বাবা, আমি তোর মা। আমি তোর সব। কোনোদিন তোর চোখে পানি দেখতে চাইনি। তুই কাদছিস কেনরে...?’ সিমি আরও জোরে ঢুকরে কেদে ওঠে। ওর কান্নার শব্দ আকাশ বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায়। সিমি একে একে বলে যায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি। সবাই নীরবে শোনে।

মামি-নানির মুখে চিন্তার ছাপ পড়লেও মামা বেশ নিশ্চিন্ত। মুখে হাসি টেনে বলেন, ‘এগুলো কোনো ব্যাপার না।’ শোন। সিমি মামার মুখের দিকে তাকায়। ‘ বাঁধনের সাথে তোর বিয়ে হয়েছিল না?

’হ্যাঁ।’ তুই ওকে মন থেকে মুছে ফেল। হ্যাঁ, দম নেন মামা। ‘পারবি না?’ সিমি মাথা নাড়ে। ‘তোর সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। লেখাপড়া কর ভালো রেজাল্ট করতে হবে।’

‘আমার গর্ভে ওর সন্তান।’ কথাটা বলতে গিয়ে সিমির মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে।  কোনো সমস্যা নেই। আমরা এখান থেকে চলে যাবো। তোর সন্তান তো বৈধ। জানি তারপরও সমাজ অন্য দৃষ্টিতে দেখবে।’

 ‘ আমার জন্য এতো কষ্ট করবে কেন মামা?’

‘একদম চুপ।’ ধমক দেন মামা। ‘তুই শুধু দেখবি কিভাবে কী হয়।’ যেই কথা সেই কাজ। এক সপ্তাহের মধ্যে বাবা মায়ের ভিটা বাড়ি ছেড়ে তারা সবাই মিলে পাড়ি জমালেন ঢাকায়। মামা সিমিকে সান্ত্বনা দিয়ে শুধু একটা কথা বলতেন বারবার, কিছু হারিয়ে কষ্ট পেয়ে যে ধৈর্য ধরে, প্রভু তাকে হারানো জিনিসের চেয়ে ভালো কিছু দান করেন এক সময়। প্রতারকরা শাস্তি পায়ই।

সময় চলে যেতে থাকে প্রবহমান স্রোতের মতো, কেটে যায় ঘণ্টা, দিন, মাস, বছর। ইতালি থেকে পাঁচচ বছর পর দেশে ফিরছে সিমি। সাথে ওর বর। একটা ছয় বছরের ছেলে আছে ওদের। দেশে বেশিদিন থাকবেও না। দিন পনের থাকবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছে। এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে এসে দাঁড়ায়। ঢাকা শহরটা অনেকখানি বদলে গেছে। একটার পর একটা বিল্ডিং। নিজেদের দেশটাকে প্রাণভরে দেখে দুজন মানুষ। দু’জনের চোখেই যেন অশ্রু এসে ভর করে। ফাহিম ছোট ছেলেটা বোঝে না। বলে, ‘আব্বু-আম্মু তোমরা কাঁদছো!’ সিমি ছেলেটাকে বুকে টেনে নেয়। রেজওয়ান ওর পালিত পিতা মাথা নেড়ে বলে, ‘হ্যারে কাঁদছি।’ রেজওয়ান খুব ভালো মানুষ।

‘কেন! কাদঁছো কেন?’ ‘এটা আমাদের দেশ, জন্মভূমি।’ ‘দেশ, জন্মভূমি। ভেরিগুড। তোমরা তো হাসবে। খুশি হবে। আমি যেমন স্কুল ছুটির পর তোমাদের কাছে পেয়ে খুশি হই, আনন্দ পাই...’ কথা শেষ করতে পারে না ফাহিম। সিমি ছেলেটার মুখ টিপে ধরে। ‘ ছোট মানুষ তুই এসব বুঝবি না। এতো কথা বলিস কেন?’ মুখ থেকে হাত সরাতেই আবার কথা বলে ফাহিম। ‘ আমিও কি তোমাদের মতো কাঁদবো?’

 ‘না, তোমার কাঁদতে হবে না।’ ‘কেন!’

 ‘এদেশের প্রতি তোমার মমত্ব নেই।’

 ‘আছে।’ ‘চুপ কর।’ ছেলেকে ধাতানি দেয় সিমি। স্বামীকে বলে, ‘এই ট্যাক্সি‍ দেখ না।’ সিমির কথা শুনে রেজওয়ান সামনে মেইন রাস্তার দিকে এগিয়ে যায়। সিমি তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে। ব্যস্ত সড়ক। গাড়ি যাচ্ছে, আসছে। একের পর এক। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখে ফাহিম নেই। চমকে ওঠে। দ্রুত চারিদিকে দৃষ্টি ঘোরাতেই চোখে পড়ে বিশ গজ দূরে একটা পাগলের সাথে কথা বলছে ফাহিম। জট পাকানো চুল। নোংরা পোশাক। সিমি দ্রুত এগিয়ে যায়। ‘ এই কিরে এখানে কী! চল। ’ দ্রুত কথা বলে সিমি। নিকের টেনশানে ওর শরীরটা কাঁপে। ছেলের চোখের দিকে তাকাতেই দেখে ওর চোখ অশ্রুভেজা। পাগলের সাথে কী এমন আলাপ হলো যে ওর চোখে পানি এসে গেল! পাগলটার দিকে ভালো করে তাকায়। নিকের জন্য পাথর হয়ে যায় সিমি। বাঁধন!? ওর রক্ত ফাহিমের শরীরে। ফাহিম না জানলেও সিমি জানে ও তার বাবা। অচেনা আপন। তা ওর এই দুর্দশা কেন! ভাবতে ইচ্ছা করে না সিমির। রেজওয়ান দূর থেকে হাঁক দেয়, ‘গাড়ি ঠিক করেছি এসো।’ ছেলের হাত ধরে সিমি সামনের দিকে পা বাড়ায়। পাগলটা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ফাহিমও বার বার পেছন ফিরে তাকায়। অচেনা আপন মানুষটার দিকে। তার চোখে অশ্রু। সিমি ফেরে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত