আমরা মানুষরূপী অমানুষদের ভয় পাচ্ছি!

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বাবু
 | প্রকাশিত : ০৮ অক্টোবর ২০১৬, ১৮:৪৪

ভয় হিজড়া সদৃশ্য করেছে আমায়। ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকা। অনিরাপদ জনপদে তটস্থ জীবন! কাকে ভয় করছি? সৃষ্টিকর্তার ভয়ে তার নিয়ম, অনুশাসন তো মানছি না! অথচ নিৰ্লজ্জভাবে বেঁচে থাকতে মানুষরূপী অমানুষদের ভয় পাচ্ছি। আমি বেশির ভাগ লেখাতেই নিজেকে উপস্থাপন করি নির্লজ্জ, বেহায়া অপরাধী হিসেবে। ওই যে ভয়, কখন কার নাম নিয়ে লিখলে, আমার ওপর আঘাত আসে! তোমরা আমাকে দেখবে মৃতের তালিকায়। শহীদি দরজা সেটা আমার জন্যে নয়, শহীদ শব্দটাও বরাদ্দ হয়ে গেছে বহুকাল পূর্বে। যে যার খুশি মতো নামের পূর্বে শহীদ বসিয়ে নিচ্ছে।

ঘর থেকে আমার স্ত্রী, কন্যা, মা, বোন প্রয়োজনীয় কাজে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান অর্জনে, কর্মস্থলে, জীবন জীবিকার জন্য বের হচ্ছে ভয় নিয়ে। এই বুঝি ঝলসে যাবে সে, এই বুঝি গুম হবে, এই বুঝি খুন হবে। ভীরু পায়ে দুরুদুরু বুকের কাঁপনে চলছে পথ। একটি দিন শেষ হলে কেউ হয়তো খোদার দরবারে শুকরিয়া আদায় করে পড়ছে দুই রাকাত নফল নামাজ। পরিবারের  সদস্যরা চোখ রাখছে মোবাইলে। কে কোথায়, এই মুহূর্তে কেমন আছে? ফিরবে তো অক্ষত অবস্থায়? 

ছোট শিশুপুত্র, কন্যা যেমন অনিরাপদ, তেমন যুবক, যুবতীরাও অনিরাপদ। রাজনৈতিক হিংসায় প্রাণ যায়, পথে ঘাটে রাস্তায় দুর্ঘটনায় প্রাণ যায়। শিক্ষালয়ে রাজনৈতিক হামলার শিকার, রাজপথে, প্রতিবাদে মামলার শিকার, নারী ঘরে, বাইরে, প্রত্যেক স্থানে, যেকোনো সময় ইভটিজিং, হেনস্তা, আক্রমণ, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কর্মক্ষেত্র নারীর জন্য এক চ্যালেঞ্জ! পরিবার সমাজের কাছে সৎ, সতীত্ব প্রমাণ দেয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে নারীর জীবনে। 

ভয় আর ভয়! কেন এই ভয়? কেন করবে না ভয়? অনেকে হিজাব পরাকে ঘৃণা করেন, অনেকে সাধুবাদ জানান, হিজাব পরেও ভয়, হিজাব না পরেও ভয়! কেন এমন হচ্ছে? এর সদুত্তর কেউ দিতে পারছে না। আইনের প্রয়োগ নেই, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলাকে অনেকে দায়ী করবেন! আমি কিন্তু মনের পশুত্বকেই দায়ী করি। যে পশুত্বের সৃষ্টি ঘর থেকে, সমাজ থেকে, দেশ থেকে। অর্থ, পেশীশক্তি, বিচার না হওয়ায়, পাশাপাশি সুস্থ সুন্দর পরিবেশে বেড়ে না উঠার কারণেও মনের ভেতর পশুত্বের জন্ম নেয়। 

অকাল পক্কতা নারী পুরুষ দুই লিঙ্গের ক্ষতি করছে। অতি শাসন আবার অতি না শাসন ( শাসন না করা) , নগ্ন , উম্মুক্ত সংস্কৃতির প্রাদুর্ভাব তো রয়েছেই। অবাক ব্যাপার বিদেশিদের কাছ থেকে মন্দ জিনিসগুলো আমরা নেই, ভালো জিনিস নেই না, শিখি না। মিতু, তনু, রিশা, খাদিজার নাম আমরা জানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে। আরও কত নাম না জানা নারী প্রতিনিয়ত হত্যার শিকার হচ্ছে, স্বেচ্ছায় নিচ্ছে ফাঁসি। নির্যাতন, যৌতুকের বলি হচ্ছে! আমরা ভিডিও করতে পারি, ছবি তুলতে পারি, এখানে ভয় কম, কারণ কাজটা লুকিয়ে করি। প্রতিবাদ করতে ভয় পাই, কারণ যদি আমি আঘাত পাই।

 স্বার্থপরতার কারণে আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না। ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারি না। নকল করে কিংবা পাশের হার বৃদ্ধির বদৌলতে শিক্ষিত হচ্ছি। সুশিক্ষিত হতে পারছি না! অন্যায় এর মাধ্যমে নিচ্ছি সনদপত্র। কিছু নেই মগজে প্রতিবাদ করব কিভাবে? আমি প্রতিবাদ করলে সাক্ষী হতে হবে, কোর্ট কাচারির ঝামেলা, অযথা ঝামেলা জড়াবো কেন বাপু, থাক দূরেই থাকি। পুরুষত্বকে বলি দেই, হয়তো প্রতিবাদীরা হিজড়া বলবে বলুক। প্রতিবাদটাও আজকাল দলীয়করণ হয়েছে! মানবাধিকার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি ভেবেই দেখাই। সমাজ সংস্কারের দায়িত্ব আমার মতো হিজড়ার নয়।

মুখে সমাজটাকে বদলাবার কথা বলি, ফেসবুকেই যখন চলে রাজনীতি, সেখানে একটু আধটু হিজড়াগিরি পরিহার করে ফেসবুকে প্রতিবাদ করি, যেখানে প্রাণের ভয় কিছুটা কম। অপরাধীরা ভাবছে, যা খুশি তাই করব, দলীয় মোহর আছে ভয় কী, অর্থ আছে ভয় কী? শক্তি আছে ভয় কী? আবার কিছু পশু এমনিতেই পশুত্ব দেখায়, নারী অকালে দিচ্ছে প্রাণ, শিক্ষকের কাছে ছোট শিশু আর অভিভাবক থাকছে ভয়ে। ভয়ে বেড়ে উঠছে প্রজন্ম। দুই একজন যদি রেহাই পেয়ে যায় অলৌকিকভাবে তারাও ভুলতে বসেছে ন্যায়ের কথা, ন্যায় কি জিনিস তারা কল্পনাও করতে পারে না। 

৫২ সালে  জাতি প্রতিবাদে এনেছে ভাষার অধিকার, ১৯৭১ সালে  এনেছিল স্বাধীনতা, আজ শুধুই অতীত, গৌরবের অতীত। সে জাতি এখন অভাগা, বেঁচে থাকার লোভে, ভয়ে বেঁচে আছে। ভয়ের সাথেই একদিন নেবে বিদায়। স্বাভাবিক মৃত্যু কজানার কপালে জুটবে তার গ্যারান্টি নিজে দিতে পারে না, কেউ দিতে পারবে না। 

ছোট শিশু যখন খেতে চায় না, পড়তে চায় না তাকে অভিভাবক দেখান ভয়, বিড়াল, কুকুর, বাঘের ভয়, ভয়ে পেয়ে বেড়ে উঠা সন্তান কখনোই প্রতিবাদী হবে না, ন্যায়ের কথা বলবে না, বলার সাহস হবে না। জেল, জুলুম, সম্ভ্রমহানি, মৃত্যুর ভয় ঘিরে আছে জীবনের প্রতিটি ধাপে, আছি মৃত্যুর ভয়ে!! মানুষ নামের অমানুষ হিংস্র জানোয়ারের ভয়ে, আল্লাহকে যদি ভয় পেতাম ইহকালে না হোক পরকালের কিছু ভয় কম হতো আমার বিশ্বাস। 

লেখক: সিঙ্গাপুর প্রবাসী

সংবাদটি শেয়ার করুন

প্রবাসের খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত