কবি ভবনের দাবি ও এক প্রবাসীর ভাবনা

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বাবু
 | প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০১৬, ২০:৪৭

অনেকে ইয়ার্কি শুরু করেছে দেখছি। কবি ভবন নাম হলেও সব লিখিয়ের জন্য এ ভবন। বলছিলাম একটি বহুতল বিশিষ্ট কবি ভবনের দাবি তোলা প্রসঙ্গে। কবিতা বা যত সহজে মানুষের কাছে, হৃদয়ে, মননে পৌঁছোতে পারে অন্য বিষয়গুলো তুলনামূলক কম আমার দৃষ্টিতে। তাই নাম ‘কবি ভবন’ হওয়াটা সমীচীন। কবি ভবনের দাবিটি ফেসবুকে জোরেশোরে শুরু হওয়ার পর হাতে গোনা কয়েকজন বিদ্রুপ করছেন। অনেকেই আলাদা করে ছড়া ভবন, লেখক ভবন এর কথাও বলছেন, টিপ্পনি  করছেন। ভালো কাজে এই সব কীর্তি নতুন নয়। শিক্ষিতরাই এই সবে আঙুল তোলেন। কারণ কি জানেন, ইগো!

যেকোনো বিষয় যেকোনো একজন তোলেন বা প্রকাশ করেন। হয়তো এ বিষয়টি অনেকের মাথায় ছিল। এখন শুধু  বাংলাদেশ কবি পরিষদ সভাপতি টিপু রহমান এর  নাম হবে, এ ভেবে বাঁকা চোখে ভালো কাজে বাগড়া দিচ্ছেন। অথচ যদি কোনো দিন সফল হয়, কবি ভবন হয় প্রথম আহ্বানকারী বা উদ্যোগতার নাম ভুলে চেয়ার নিয়ে কক্ষ নিয়ে দলীয়  প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি কর্মযজ্ঞে লিপ্ত হবেন। এখন যে দলীয় প্রভাব নেই একেবারে তা নয়।

সেদিন জাদুঘরে যখন কবিতা পাঠের মঞ্চে টিপু রহমান বিষয়টি উচ্চারণ করেন তার গলা কাঁপছিল, হাত-পা নড়ছিলো। কী ভাবছেন? ভয়ে, মোটেই না। তিনি একটা দাবি, একটা অধিকার, একটা সৃষ্টির শুরু করছিলেন। তখন শুধু যে আমার মতো নগণ্য প্রবাসীর চোখ টিপু সাহেবের দিকেই ছিল তা নয়। চোখ ছিল মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিদের দিকে, চোখ ছিল দর্শক সারিতে কবিদের দিকে, আবৃত্তিকারদের দিকে। আমরা প্রবাসে যারা লেখালেখি করি দেশের খ্যাতিমানদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য, ব্যক্তি পরিচয় কতটা শক্তিধর এর প্রমাণ যে পাইনি ত কিন্তু নয়। 

টিপু সাহেব মঞ্চে উঠার পূর্বে আমরা ক্যান্টিনের পেছনে রক্তে নিকোটিন দিতে যাই। সেখানে তিনি বলেছিলেন, আজ মঞ্চে উঠলে একটা সারপ্রাইজ পাবেন। ভেবেছিলাম, উনি বোধহয় আমার সাথে লাগেজ দেখে ভেবেছেন, আমার থাকার জায়গা নেই, তাই তার ঢাকায় বাসায় যাবার অফার দেবেন। এই রকম ভাবার কারণ বেশ কয়েকবার এক সাথে আড্ডা দেয়ার প্রোগ্রাম হয়েছিল। আবার ভাবলাম হয়তো তিনি তার স্থলে আমাকে পাঠাবেন কবিতা আবৃত্তি করতে। না তেমন  হয়নি, হলে এই কবি ভবনের দাবি শুরুটা সে দিন দেখা  হতো না, শোনা হতো না। মিস করতাম, এই দাবির প্রথম দিনের শ্রোতা হওয়া থেকে বঞ্চিত হতাম।

সে দিন প্রাণের প্রিয় বন্ধুকে দেখেছি আবৃত্তি করতে। দেখেছি দেশবরেণ্য কবিদের। আবৃত্তিকারদের আবৃত্তি শুনেছি। ফেসবুকের কল্যাণে অনেক প্রিয় মুখ ছিল জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে। যেখানে শুদ্ধতার কবি খ্যাত কবি অসীম সাহা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনে বঙ্গোত্তম উপাধি দেন। সারা মিলনায়তনে করতালিতে বার বার বঙ্গোত্তম উচ্চারণ করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্ম উপলক্ষে বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদের অনুষ্ঠানে, বঙ্গোত্তম উপাধির সন্ধ্যায় অনেকেই সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি উদার মনোভাবাপন্ন প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই কবি ভবনের দাবিটাকে আমলে নেননি। হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন, নীরব ছিলেন। 

আমার কাছে দুটি কাজই ভালো লেগেছিল। কিন্তু মঞ্চের কেউ কবি ভবনের দাবিটাকে সাথে সাথে সাধুবাদ দেননি। কারণটা আমার কাছে মনে  হয়, তারা দাবি করেননি বা তাদের কেউ এই দাবি উত্থাপন করেননি বলে  কেউ উচ্ছ্বসিত ছিলেন না। এখন এই দাবি তীব্র হচ্ছে দিন দিন। 

ফেসবুক এখন প্রচার প্রসারের সহজ মাধ্যম, কবি ভবনের দাবিতে কবিরা দেশ বিদেশের  বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিজের ছবি দিয়ে কবি ভবনের দাবি করছেন। আমি সে দিন তাৎক্ষণিক একাত্মতা জানিয়ে পত্রিকায় লিখেছি। আমি চাই সর্বশ্রেণীর লেখকদের একটা মিলন স্থান হোক। নাট্যমঞ্চ প্রেসক্লাবের মতো কবি লেখক সাহিত্যিক লিখিয়েদের একটা নির্ধারিত স্থান থাক। ব্যক্তি ছবি দিয়ে কবি ভবনের দাবিটা চোখে লাগছে বটে। কেমন যেন কবি ভবনের চাইতে আত্মপ্রচারটা বেশি। 

কবি লেখকদের নিয়ে একটা বৈঠক করে প্রেস রিলিজ দিয়ে কমিটির মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত না পৌঁছালে দাবি আদায় কঠিন হবে। দিন দিন ছড়া ভবন, গল্প ভবন, উপন্যাস ভবনেরও দাবি উঠিতে পারে। গা জ্বালা ধরা মানুষ যারা ফ্রন্ট লাইনে আসেও না, অন্যকে দেখতে চায় না তারা চুলকাবে জায়গা, বেজাগায়। কবি ভবন হলে দলাদলি হবে। ঘরে ঘরে আজ হচ্ছে দলাদলি আরতো সাহিত্যাঙ্গন। ব্যাঙের ছাতার মতো গ্রুপিং দেখে অনুমান করা যায় পদ পদবি কতটা জরুরি। 

কবি ভবন হোক আর সাহিত্য ভবন হোক আসলে একটা স্থান দরকার। আমরা  প্রবাসীরা না হয় থাকবো দর্শক সারিতে। অবশ্য আরেকটি অনুষ্ঠানে কবি অভিনেতা সোহেল রশিদের তৎপরতায়, কবি ইউনুস ফার্সির সহযোগিতায় অনুপ্রাসের অনুষ্ঠানে কয়েকটি লাইন পড়ার সুযোগ হয়েছিল অনুষ্ঠানের শেষ দিকে। প্রবাসে কাজের মাঝে ব্যাস্ত সময় আমাদের, ছুটিতে গেলে কখনো সখনো দেখবো মুখ চেনা লোকের হাতে মাইক্রোফোন। তারা পড়বে স্তুতি কবিতা। প্রবাসী দর্শক হিসাবে তালি দেব ঠাস ঠাস। ভেদাভেদ ভুলে, ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ফিচারিস্ট, কলামিস্ট এর আলাদা ভবনের দাবি না তুলে লেখকদের জন্য একটি স্থানের দাবি তুলি। হোক না নাম তার কবি ভবন, এ দাবি কবি টিপু রহমানের একার দাবি নয়, কবি ভবন সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য সময়ের দাবি।

লেখক: সিঙ্গাপুর প্রবাসী

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

প্রবাসের খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত