ভাঙনে দিশেহারা তিস্তাপারের মানুষ

রাহেবুল ইসলাম টিটুল, লালমনিরহাট
| আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৮, ১৩:১৭ | প্রকাশিত : ০৬ জুলাই ২০১৮, ১২:৫৩

লালমনিরহাটে গত এক সপ্তাহে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি। পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি ক্ষেত। ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। একের পর এক ভাঙনে বসত-বাড়ি জমি জমা নিয়ে নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তিস্তাপারের মানুষজন।

ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান এলাকায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত চার দিন ধরে লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলায় বন্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদী ভাঙন।

বৃহস্পতিবার দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৬৫ সেন্টিমিটর, যা বিপদসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার ওপরে।

তিস্তা ব্যারাজ বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ভারী বর্ষণের সঙ্গে উজানের পাহাড়ি ঢলে গত ১ জুলাই সকাল থেকে তিস্তার পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ওই দিন বিকাল তিনটায় পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৫৮ সেন্টিমিটার। পরের দিন কিছুটা কমে গেলেও ৩ জুলাই সকাল থেকে পানিবৃদ্ধি পেতে থাকে। একই গতিতে বৃহস্পতিবার বিকালে এ পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৬৫ সেন্টিমিটার।

এ পয়েন্টের নতুন বিপদসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার। ব্যারাজ রক্ষার্থে প্রায় সব জলকপাট খুলে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার পাঁচটি উপজেলার চরাঞ্চলের নিচু এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী এলাকায় পাঁচ শতাধিক পরিবার গত ১০ দিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় পড়ে আছেন।

এছাড়া ওই উপজেলার গড্ডিমারী, সানিয়াজান, সিঙ্গিমারী, সির্ন্দুনা, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবার গত পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

আদিতমারী উপজেলার গোবর্দ্ধন এলাকার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মতিয়ার রহমান জানান, মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ ভাঙন দেখা দেয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১০টি বসত বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। বাস্তুহারা মানুষগুলো তাদের ঘর বাড়ি বাঁধে ও উঁচু স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।

গোবর্দ্ধন চরাঞ্চলের মানিক, মজমুল ও আজিজুল ইসলাম জানান, ঘরে হাঁটু পানি। মাচাংয়ের ওপর চুলা বসিয়ে কোনোরকমে চাল সিদ্ধ খেয়ে দিনাতিপাত করছেন তারা।

আদিতমারী উপজেলার কুটিরপাড় বালুর বাঁধের প্রায় দুইশ মিটার নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। বাঁধটি রক্ষায় কাজ শুরু করেছে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ। তারা জরুরি প্রতিরক্ষা প্রকল্পের আওতায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ও বাঁশের পাইলিং দিয়ে বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাউবো দাবি করেছে, এ বাঁধে দুই হাজার ৯৮৬টি জিও ব্যাগ নদীতে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তাদের এ হিসাব মানতে নারাজ স্থানীয়রা।

কুটিরপাড় বাঁধের বাসিন্দা সোলেমান আলী, নজরুল ও কলিম মিয়া জানান, শুষ্ক মৌসুমে বাঁধগুলো সংস্কার করলে কাজটা মানসম্মত হতো। কিন্তু তা না করে বর্ষাকালে তাড়াহুড়ো করে নামমাত্র কাজ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তারা।

ভুক্তভোগীদের জানান, বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবার সংকট দেখা দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পাননি তারা। জেলার আদিতমারী উপজেলার গোবর্দ্ধন সলেডি স্প্যার-২ বাঁধের ভাটিতে মঙ্গলবার দুপুর থেকে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়।

ওই এলাকার তালেব, সাইদুল ও আলম মিয়া জানান, গত তিন রাত ধরে চোখে ঘুম নেই। রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন। বাড়ির লোকজন পালাক্রমে ঘুমাচ্ছেন। কখন হিংস্র- স্রোতে ভেসে যায় বসতবাড়ি ও ফসলি জমি এ আতঙ্কে কাটছে তাদের দিন।

আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটির চন্ডিমারী স্প্যার থেকে বারঘড়িয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

মহিষখোচা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মজমুল হক জানান, গত সপ্তাহে ২০টিসহ এ ইউনিয়নে এ পর্যন্ত ৪৫টি বসত বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কুটিরপাড় বালুর বাঁধটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে আরও প্রায় ১০টি গ্রাম পানিবন্দী হয়ে পড়বে।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের পানি উন্নয়ন বোডের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল আলম চৌধুরী জানান, উজানের ঢলে গত ২৪ ঘণ্টায় বিপদসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে তিস্তায় পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। বর্ষাকালে পানি প্রবাহ এভাবে বাড়া-কমার মাঝেই চলবে।

জানতে চাইলে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) শফিউল আরিফ জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোতে কাজ চলমান রয়েছে। বাঁধ রক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে আতঙ্কের কিছু নেই।

(ঢাকাটাইমস/০৬জুলাই/প্রতিনিধি/ওআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :