দুর্নীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার যুদ্ধ ঘোষণা

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:০১

কেমন হলো বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের ইশতেহার? চমক আছে, না নেই? ইশতেহার কি আসলে চমকে দেয়ার বিষয়? অবাস্তব অঙ্গীকার করলে মানুষ ঠিকই অনুধাবন করতে পারে। যেমন ঐক্যফ্রন্ট তাদের ইশতেহারে বলেছে, সরকারি চাকরিতে নাকি প্রবেশের বয়সসীমা থাকবে না! এ নিয়ে সারাদেশে তরুণ-তরুণীরা হাসাহাসি করছে। একটি তেজী ছেলে বা মেয়ে যদি আজীবন সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেয়ার জন্য মানসিকতা অর্জন করে তাহলে তার জীবনে সাধ-আহ্লাদ, স্বপ্ন, সংসার, প্রেম, ভালোবাসা বলে কিছু থাকবে? হাস্যকর চমক দেয়ার চাইতে বাস্তবসম্মত ইশতেহারই সাধারণ মানুষের কাম্য।

গত ১০ বছরের সবচেয়ে বড় চমক আসলে আওয়ামী লীগ নিজেই। শুরুতেই বিডিআর বিদ্রোহের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যে জয়জাত্রা শুরু করেছিল সেটি আজ অবধি অব্যাহত রাখাই সময়ের সবচেয়ে বড় চমক। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো দেশের মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস জন্মেছে যে, বাংলাদেশের পক্ষে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব। বলা বাহুল্য, শেখ হাসিনাই হলেন সেই নেতা যিনি এই পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি তার বাকশাল কায়েম করতে পারতেন, তাহলে বহু আগেই বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারত। বাকশাল ছিল উন্নত ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র নির্মাণের সে সময়ের সবচেয়ে কার্যকর পরিকল্পনা। কিন্তু জিয়াউর রহমান আর খোন্দকার মোশতাক গং বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করে দেয়। দীর্ঘ অন্ধকারের পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সহায়তায় বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের নেয়া সব উন্নয়ন কাজ বন্ধ করে দেয়। তারেক রহমান হয়ে উঠেন দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ। আর বাকিটা কালো ইতিহাস। সাধারণ মানুষ জানে কী হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত ও পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে নতুন করে জয়যাত্রা শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ এমন সব সাফল্য অর্জন করেছে যা আমরা কল্পনাও করিনি। ২০২১ সালের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে দিন বদলের সনদ ঘোষণা করেছিল আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াত জোট আর তাদের বিদেশি প্রভুদের শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ একের পর এক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে গেছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। জাতির রাজনৈতিক কলঙ্ক মোচনের পাশাপাশি  রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে অভূতপূর্ব। প্রতিটি মানুষের উপার্জন বেড়েছে। সরকারি চাকরিতে বেতন বেড়েছে ৩৪৪ শতাংশ পর্যন্ত। বেসরকারি খাতেও সুযোগ-সুবিধা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে।

২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৭.৮৬ হারে, যা বিশ্বের অপরাপর উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। আওয়ামী লীগ যদি উন্নয়ন অব্যাহত রাখার সুযোগ পায় তাহলে ২০২৫-২০৩০ সালে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। সাধারণ মানুষ প্রবৃদ্ধি বুঝে না। তারা শুধু নিজের এবং অপরের ইনকাম বুঝে। সবাই সবাইকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, আপনার আয়-উপার্জন বেড়েছে কি না? লাখ লাখ তরুণ-তরুণী উদ্যোক্তা হয়েছে গত ১০ বছরে। অর্থনীতি এতই সক্রিয় যে, যে কেউ গঠনমূলক কিছু করলে তার আয়-উপার্জন হবেই। সবাই সবাইকে জিজ্ঞেস করুন। তাহলেই উন্নয়নের চিত্র দেখতে পারবেন।  ২০০৬ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৪২৭ ডলার, বর্তমানে এর পরিমাণ এক হাজার ৭৫১ ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ এখন স্বীকৃত উন্নয়নশীল দেশ।

এই উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় থাকার ফলে। এখন সামনে আরেকটি নির্বাচন। দেশের মানুষের হাতে ভোটের ক্ষমতা। এই ক্ষমতা কি তারা সম্ভাবনার পেছনে খরচ করবেন নাকি ধ্বংসের পেছনে, এই সিদ্ধান্ত তাদেরকেই নিতে হবে। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা ইশতেহার পাঠ করার শেষে অতীতের ‘ভুল-ভ্রান্তির’ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য দেশবাসীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন! একজন  সফল ও প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার এই বিনয় সবাইকে মুগ্ধ করেছে।  সাফল্যের জন্য গর্বিত, কিন্তু বিন্দুমাত্র অহংকারী নন শেখ হাসিনা। অন্যদিকে কামাল হোসেনদের মতো মানুষেরা প্রকাশ্যে ‘খামোশ’ বলে সাংবাদিকদের পর্যন্ত দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া বেড়াচ্ছেন।

ইশতেহারে অত্যন্ত প্রত্যাশিতভাবেই শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের  ঘোষণা দিয়েছেন। গত দশ বছরে প্রশাসনের নানা পর্যায়ে দুর্নীতি কমেছে, কিন্তু জনগণের প্রতাশামাফিক হয়নি। এটাও সত্য যে, কয়েক যুগের জঞ্জাল শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষে মাত্র ১০ বছরে সরানো সম্ভব ছিল না। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের অন্যতম সুফল হিসেবে প্রশাসনে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে দুর্নীতি হ্রাস পেয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালী করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, দুর্নীতি কমে গেলে উন্নয়ন স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের এক নম্বর সমস্যা আসলে দুর্নীতি। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে তাই দুর্নীতি দমন অভিযানের ওপর সম্যক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দুর্নীতি কমে গেলে যোগ্য ও মেধাবীদের পক্ষে প্রশাসনে কর্মসংস্থান করা অনেক সহজ হবে। কোনো রকম ঘুষ না দিয়ে সরকারি চাকরি প্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়বে।

ইশতেহারে আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত এক কোটি ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আরও বলা হয়েছে যে, উক্ত সময়ে নতুনভাবে এক কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার মানুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রণয়ন করা হবে ‘তরুণ উদ্যোক্তা নীতি’। অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০১৮ সালে দারিদ্রের হার ২১ শতাংশে এবং অতি দারিদ্রের হার ১১.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি ও ভবঘুরেপনা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হবে । দারিদ্রসীমা ও চরম দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ১২.৩  এবং ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হলে দরিদ্র জনসংখ্যা ২.২ কোটির নিচে নেমে আসবে।

এবারের ইশতেহারের অন্যতম চমক হচ্ছে, ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ প্রকল্প। গ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ঠিক রেখে নাগরিক সুবিধা বাড়ানো হবে। গ্রামে-গঞ্জে ডিজিটাল বাংলাদেশের সমস্ত সুবিধা ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত হলে পুরো বাংলাদেশ হয়ে উঠবে আলো ঝলমলে। একটি দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের সংগ্রামে শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র কর্তব্য।

দলীয় অন্ধ আনুগত্য নয়, যুক্তির শক্তিতে দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে ভোটের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভোটের শক্তিকে অপশক্তির পক্ষে ব্যবহার না করে উন্নয়ন-বান্ধব শক্তিকে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় আনার জন্য ব্যবহার করতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আজ সারাবিশ্বে স্বীকৃত। এমনকি চিরশত্রু পাকিস্তানের নেতারাও এখন শেখ হাসিনার রেফারেন্স দেন, বাংলাদেশের উদাহরণ দেন। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ সহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট গুলোতে বিধৃত আছে শেখ হাসিনার সরকারের সাফল্য গাঁথা। এক পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে শেখ হাসিনা বুঝিয়ে দিয়েছেন, সাম্রাজ্যবাদী আর ধর্মব্যবসায়ীদের দিন শেষ। পদ্মা সেতুর কিছু কাজ বাকি। মেট্রো রেলও ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতিটি মেগা প্রকল্পের কাজ বাকি। বিএনপি-জামাত তথা ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় আসলে সব বন্ধ করে দেবে। তাই উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হলে শেখ হাসিনাকে আবারও ক্ষমতায় আনার কোনো বিকল্প নেই। তরুণ সমাজসহ দেশের মানুষকে তাই বিভ্রান্ত হলে চলবে না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :