দিনাজপুর আ.লীগে উৎসব, বিএনপি জোটে উৎকণ্ঠা

শাহ্ আলম শাহী
 | প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:০১
বামে দিনাজপুর-২ এ প্রচারণায় ধানের শীষ, ডানে দিনাজপুর-৪ আসনে প্রচারণায় নৌকা

ভোটের প্রচার চলাকালে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে ১৫ হাজারের বেশি নেতাকর্মী বিএনপি ছেড়ে এসেছে আওয়ামী লীগে। আসনগুলোর মধ্যে ছয়টিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকলেও বিএনপির প্রার্থী তিনজন। আর দুজন জামায়াতের নেতা লড়ছেন ধানের শীষ নিয়ে।

একটি আসনে বিএনপির প্রার্থী ভোটের বাইরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে। ফলে এই আসনটি বাদ দিয়েই চিন্তা করতে হয়েছে বিএনপি জোটকে।

অতীতে ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, ৯১ সাল থেকে তিনটি আসনে কখনো জিততে পারেনি বিএনপি জোট। একটি আসনে একবার এবং দুটি আসনে দুইবার করে জয় পেয়েছে তাদের জোট। নবম সংসদ নির্বাচনে সব কটি জেতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট।

জেলার কোনো আসনেই বলতে গেলে নির্বিঘেœ প্রচার চালাতে পারেনি বিএনপি জোটের প্রার্থীরা। এ নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আছে হতাশা।

বিএনপি জোটের অভিযোগ, তাদের ৫০ জনেরও বেশি নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন উপজেলা চেয়ারম্যানও আছেন। বিএনপির একাধিক নির্বাচনী অফিস ভেঙে ফেলা হয়েছে।

দিনাজপুর-১

বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ১৯৯১ সাল থেকেই লড়াই হয়ে আসছে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে। বিএনপি নিজের প্রার্থী না দিয়ে শরিক দলকেই ছেড়ে দিয়েছে। নৌকা নিয়ে লড়ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মনোরঞ্জনশীল গোপাল। ধানের শীষ পেয়েছেন জামায়াতের মোহাম্মদ হানিফ। আরো চারজন প্রার্থী থাকলেও লড়াইটা এই দুজনের মধ্যেই।

১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ভালো করতে না পারার পর পরের তিনটি নির্বাচনে আসনটি জোটের শরিক জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। ২০০১ সালে জয়ও পায় এই জোট। তবে ২০০৮ সালে ৩৫ হাজার ৯২৯ ভোটে হারে তারা।

আসনটিতে জাতীয় পার্টিরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট আছে। আর নৌকার প্রার্থী এর আগে লাঙ্গল নিয়ে ভোটও করেছেন। সাবেক দলের নেতাকর্মীরাও আছেন তার পাশে।

এই আসনে হিন্দু, সাঁওতাল ভোট মোট ভোটারের এক তৃতীয়াংশ এবং তারা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবেই স্বীকৃত। তারা নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসতে পারলে সুবিধা পাবেন মহাজোটের প্রার্থী।

এই আসনে বিএনপি এবং জামায়াতের প্রকাশ্য প্রচার সেভাবে দেখা যায়নি। মিছিল, সমাবেশ আর ব্যানার-পোস্টারে ভোট না চেয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা দলে দলে ভাগ হয়ে বাড়ি বাড়ি ও মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে ভোট চেয়েছেন।

দিনাজপুর-২

বিরল ও বোচাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনেও হিন্দু ও সাঁওতাল ভোটারের সংখ্যা ভোটের ফলকে পাল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। 

এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ২০০৮ সালে ৪৮ হাজার ৭৮৭ ভোটে জিতে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হন। এখানে লাঙ্গল প্রতীকে জুলফিকার হোসেন প্রার্থী হলেও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা আছেন নৌকার পক্ষেই। আবার ভোটের প্রচার চলার মধ্যে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে এসেছেন অন্তত তিন হাজার নেতাকর্মী।

এই আসনটিতে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে লড়াই হয়েছে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে। ২০০১ সালে বিএনপির হয়ে জিতে চমক দেখান সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান।

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সাদেক রিয়াজ চৌধুরী। তার পক্ষে সেভাবে প্রচার নেই। আর মনোনয়ন দিয়ে দলের ভেতর বিভক্তি ও মান অভিমানও কাটাতে পারেননি ধানের শীষের প্রার্থী।

দিনাজপুর-৩

সদর আসনে ভীষণ বেকায়দায় বিএনপি। দলের নেতা সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমের প্রার্থিতা স্থগিত হয়ে গেছে উচ্চ আদালতের আদেশে। আর এই সিদ্ধান্ত আসার পর হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে।

জেলার এই আসনটিতেই বিএনপির শক্তি সবচেয়ে বেশি। ১৯৯১ সালে তৃতীয় হলেও ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার বোন খুরশিদ জাহান হক জেতেন। তবে তার মৃত্যুর পর জোটের প্রার্থী ৩৩ হাজার ৫৮১ ভোটে হেরে যান।

বিএনপির প্রার্থিতা স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর দুইবারের সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিমের সামনে দৃশ্যত কোনো চ্যালেঞ্জ রইল না। আবার ভোটের প্রচার চলার মধ্যেই বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে এসেছে ছয় হাজারের বেশি নেতাকর্মী।

দিনাজপুর-৪

চিরিরবন্দর ও খানসামা আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। বিএনপি প্রতীক দিয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য আকতারুজ্জমান মিয়াকে। জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে প্রার্থী থাকলেও দলটির নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষেই কাজ করছে।

২০০৮ সালে এই আসনে দুই প্রার্থী লড়াই করেন। সে সময় মাহমুদ আলী জেতেন ৩৯ হাজার ৪৭ ভোটে। বিএনপি এখানে এরশাদ সরকার পতনের পর ২০০১ সালে একবারই জিতেছিল। আবার প্রচারের মধ্যে বিএনপি থেকে দুই হাজার নেতাকর্মী এসেছে ক্ষমতাসীন দলে।

তবে এই আসনে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। অন্যদিকে আওয়ামী লীগে শুরুতে নানা দ্বিধা-বিভক্তি ছিল। যদিও প্রচারের মধ্যে সেই বিভেদ মিটে যাওয়ার দাবি করছেন নৌকার প্রার্থী। 

দিনাজপুর-৫

ফুলবাড়ী ও পার্বতীপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য দুর্গের একটি। টানা ছয়টি নির্বাচনে জেতা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার এবারও আত্মবিশ্বাসী।

মোস্তাফিজুরের মোকাবেলায় বিএনপিতে আছেন এ জেড এম রেজওয়ানুল হক। তিনি ২০০১ ও ২০০৮ সালে ছিলেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এর আগে এই আসনে লড়াই করেছে নৌকা ও লাঙ্গল।

জাতীয় পার্টির নেতা সামিউল সামিও এই আসনের প্রার্থী। তিনি লাঙ্গল প্রতীকে ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে।

দিনাজপুর-৬

বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট ও হাকিমপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনে লড়াই হবে আওয়ামী লীগ-জামায়াতে। নৌকার প্রার্থী শিবলী সাদিক আর ধানের শীষে সওয়ার জামায়াতের আনোয়ারুল ইসলাম।

এই আসনে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জামায়াত এবং ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে জেতে আওয়ামী লীগ। নবম সংসদ নির্বাচনে নৌকা ও দাঁড়িপাল্লার ভোটের ব্যবধান ছিল ৮৫৮ মাত্র। শিবলী সাদিক নির্বিঘেœ প্রচার চালালেও জামায়াতের নেতাকর্মীরা ভোট চেয়েছে গোপনে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :