নিরাপত্তা চায় হিন্দুরা

বাগেরহাট প্রতিনিধি
 | প্রকাশিত : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৩:১০
বাগেরহাটের হিন্দু ভোটাররা। (ফাইল ছবি)

বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের পশ্চিম সায়েড়া গ্রামের বিকাশ চন্দ্র পাল আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নৌকার পক্ষে কাজ করেছিলেন। ভোটের পরদিন বাড়ির সামনে রাস্তায় ফেলে পেটানো হয়। শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে দুই সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে বিকাশকে ভারতে পালিয়ে যান। আর কখনো দেশে ফেরেনি।

আবার ভোট এসেছে। পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে তাই চিন্তিত বিকাশের ৭৭ বছর বয়সী বাবা অধীর কুমার পাল। ঢাকা টাইমসকে বলেন, জাতীয় ‘সংসদ নির্বাচনের কথা মনে পড়লে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। আমার বড় ছেলে ২০০১ সালের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের পক্ষে কাজ করায় বিএনপিদলীয় সন্ত্রাসীরা দিনের বেলায় সবার সামনে বাড়ির সামনে রাস্তার ওপর ফেলে তাকে লাঠিসোঁটা দিয়ে বেদম প্রহার করে। আমরা সেদিন কিছুই করতে পারিনি। বরং প্রাণনাশের ভয়ে তাকে ভারতে পাঠিয়ে দিই। এবার আবার কি হয় জানি না।’

একই রকম ঘটনা ঘটেছিল সায়েড়া মধুদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রয়াত সহকারী শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র ম-লের পরিবারে। নৌকায় ভোট দেওয়ায় তার বড় ছেলে বিপ্লব কুমার ম-লকেও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। আর কোনোদিন দেশে ফেরেননি। জগদীশ নিজে ১৮ মাস পর ফেরেন। কয়েক বছর পর রোগে ভুগে মারা যান। তার ছোট ছেলে পল্লব ম-লকে বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজে যাওয়ার পথে মারধর করে তার সাইকেলটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পল্লব তখন বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজের ছাত্র। বর্তমানে তিনি রামপাল উপজেলার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

পল্লব ম-ল ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর বিএনপি সমর্থকরা আমার প্রয়াত স্কুল শিক্ষক বাবার সাবেক ছাত্ররা আমার বাবা ও বড় ভাইকে

খুঁজতে বাড়িতে আসেন। ভয়ে আমরা সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই। আমার বড় ভাই বিপ্লব ভারতে যায় এবং বাবা দেড় বছর এলাকার বাইরে পালিয়ে থেকে বাড়িতে ফিরে আসে। আমার বড় ভাই ভারতেই থেকে গেছেন। ভবিষ্যতে আসারও ইচ্ছা নেই।’

‘ওই সময়ে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করার অপরাধে আমাদের পরিবারকে অনেক মাসুল দিতে হয়েছে। আমরা তো এদেশের নাগরিক। তবুও আমাদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়াতেই যেন জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসে। অজানা ভয়ভীতি আমাদের তাড়া করে।’

১৭ বছর আগে ভোটের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের ঘটনা ছিল তুমুলভাবে আলোচিত। সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন যেসব জেলার বাসিন্দারা, তাদের একটি বাগেরহাট। সেখানে হামলায় কেউ হারান প্রাণ, ব্যাপকভাবে ঘটে ধর্ষণের ঘটনা। কেউ টাকা খুইয়েছেন, কারও পুকুরের মাছ আর গোলার ধান লুট হয়ে যায়। 

সে সময় অন্যতম আলোচিত ছিল মোরেলগঞ্জ উপজেলার চিংড়াখালির বাণিকান্ত মিস্ত্রী হত্যা ও ‘স’ অদ্যাক্ষরের এক নারীকে গণধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দুটি। আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল করার অপরাধে বাণিকান্তকে জোট সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করেছিল। 

মোল্লাহাট উপজেলার গাওলা ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত গাওলা গ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তারাপদ পোদ্দারের বাড়িতে সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জামাআতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশের ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলা, রামপালের ছবিরাণী নির্যাতন, যাত্রাপুরের কোমরপুরের ঠাকুরবাড়ি গণধর্ষণ, ডাকাতি ও হত্যা এর কয়েকটা উদাহরণ। 

বাগেরহাট হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী বাগেরহাট-১ আসনের ফকিরহাট, চিতলমারী ও মোল্লাহাট উপজেলায় মোট ভোটারের প্রায় ৩২ শতাংশ, বাগেরহাট-২ আসনের সদর ও কচুয়া উপজেলায় প্রায় ২৫ শতাংশ, বাগেরহাট-৩ আসনের রামপাল ও মংলা উপজেলায় প্রায় ২৮ শতাংশ এবং বাগেরহাট-৪ আসনের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ২০ শতাংশ ভোট রয়েছে। প্রতিপক্ষের প্রচলিত ধারণা যে এই ভোটের ওপর আওয়ামী লীগের একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই ভোট নিজেদের পক্ষে আনতে বিএনপিসহ সমমনাদের এই নির্যাতনমূলক কর্মকা- চলে প্রতিটি ভোটের আগে ও পরে।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বাগেরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মিলন কুমার ব্যানার্জি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবরের নির্বাচনের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়েছিল। ওই সময়ে বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় এলাকায় খুন, হামলা, গণধর্ষণ, চাঁদাবাজির অসংখ্য ঘটনা ঘটে। এই এলাকার অনেক পরিবার ওই সময়ে জীবন বাঁচাতে ভারতে পালিয়ে যায়।

‘২০০৮ সালের পর অনেকে এই দেশে ফিরেছেন আবার অনেকে ফেরেননি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অজানা ভয়ভীতি ও আতঙ্ক বিরাজ করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা তো এদেশেরই নাগরিক। তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার আছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের একাধিকবার মতবিনিময় সভা হয়েছে। তারা আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার আশ^াস দিয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে এবং ভোটের পরে যেন কোনো সংখ্যালঘুর ওপর নির্যাতন নেমে না আসে সেদিকে নজর রাখতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’

বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আহাদ উদ্দীন হায়দার এই প্রতিবেদককে বলেন, বাগেরহাটের চারটি আসনে প্রায় ২২ শতাংশ ভোট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। প্রতিপক্ষের প্রচলিত ধারণা যে এই ভোটের ওপর আওয়ামী লীগের একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তাই এই ভোট নিজেদের পক্ষে আনতে বিএনপিসহ সমমনাদের এই নির্যাতনমূলক কর্মকা- প্রতিটি ভোটের আগে ও পরে চলে আসছে। ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবরের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর অবর্ণণীয় নির্যাতন হয়েছিল। তাদের নির্যাতনের খবর ওই সময়ে দেশি বিদেশি গণমাধ্যমে ছিল আলোচিত বিষয়। তবে এখনকার চিত্র অনেক ভালো। তারপরও নির্বাচন আসলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অজানা শঙ্কা থেকেই যায়। তাই প্রশাসন আসন্ন নির্বাচনে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এটাই দাবি জানাই।’ 

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা পূজা উদযাপন ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে প্রশাসন একাধিক সভা করেছে। সংখ্যালঘুরা এদেশের নাগরিক। তাদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।’

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তপন কুমার বিশ^াস বলেন, ‘শুধু সংখ্যালঘু কেন, কোনো নাগরিককের ওপর হুমকি আসলে প্রশাসন জিরো টলারেন্সে অবস্থান করবে। তাই আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা-অত্যাচার বা নির্যাতন সহ্য করা হবে না। অপরাধীদের সব ধরনের অপতৎপরতা কঠোর হাতে দমন করা হবে। এ জন্য প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :