অবশেষে অরিন্দম কহিলা বিষাদে...

আলম রায়হান
 | প্রকাশিত : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:৪২
ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক শেষে ড. কামাল হোসেন (ফাইল ছবি)

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন জানিয়েছেন ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জামায়াত নেতারা ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন জানলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে তিনি থাকতেন না। ভোট গ্রহণের তিন দিন আগে ২৭ ডিসেম্বর ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত হওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন। তার এ বক্তব্য বেশ আলোচিত হচ্ছে। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জামায়াত প্রশ্নে ধমকিয়ে বেশ সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি।

ভারতীয় সাংবাদিকে না ধমকিয়ে ড. কামাল বলেছেন, দুঃখের সঙ্গে আমাকে বলতে হচ্ছে, জামায়াত নেতাদের মনোনয়ন দেওয়াটা মূর্খের মতো কাজ হয়েছে। আমি লিখিত দিয়েছি যে ধর্ম, মৌলবাদ ও চরমপন্থা আনা যাবে না, জামায়াত নেতাদের কোনো সমর্থন দেব না। তিনি আরও বলেন, আমি যদি জানতাম জামায়াত প্রার্থীদের বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে তাহলে ঐক্যফ্রন্টের অংশীদার হতাম না। এই লোকগুলো যদি সরকারে অংশ হয় তাহলে আমি একদিনও তাদের সঙ্গে থাকব না।

ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তিনি ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান হতে পারেননি। তার নামের আগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী, সংবিধান প্রণেতা ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। ৫০ বছর রাজনীতি করেও রাজনীতিবিদ হতে না পারাটা তাকে বেদনার্ত করে কি না বলা কঠিন। ড. কামালের বয়স যখন ত্রিশের কোঠায়, তখন তিনি আইনজীবী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর স্নেহের ছায়ায় আশ্রয় পান। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানেই রাজনীতিতে আসা ড. কামাল ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম আইনমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বাধীন বাংলাদেশকে দ্রুততম সময়ে একটা অসাধারণ সংবিধান উপহার দেয়ার কৃতিত্বও তার। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতেও ড. কামাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শেখ হাসিনাও তাকে রাষ্ট্রপতি পদে, এমপি পদে মনোনয়ন দিয়েছেন; কিন্তু ড. কামাল কখনো জিততে পারেননি। সারাজীবন অনেক সম্মান পেলেও প্রয়োজনীয় ভোট পাননি তিনি। তিনি আসলে কথনো গণমানুষের নেতা হতে পারেনি। এ হচ্ছে ভোট না পাবার প্রধান কারণে।

এখন তিনি সরকারবিরোধী বৃহত্তর জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক, এখনো কিন্তু কেউ ‘কামাল ভাইয়ের সালাম নিন, ধানের শীষে ভোট দিন’ স্লোগান দেন না। তিনি কখনো সাধারণ কর্মীদের ‘কামাল ভাই’ হতে পারেননি। তবে রাজনীতিবিদ হওয়ার তৃষ্ণাটা রয়েই গেছে অন্তরে তার। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসার পর গণফোরাম গঠন করেন তিনি। এদিকে সারাজীবন গণতন্ত্রের কথা বললেও ড. কামাল কিন্তু প্রায় ৩০ বছর ধরে নিজেই তার দলের সর্বেসর্বা। এই হচ্ছে তার দলে গণফোরামে গণতন্ত্রের নমুনা। অথচ তিনি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ‘জেহাদ’ ঘোষণা করে ফেলেছেন! কিন্তু বাস্তবতা উল্টো; এখানে কামাল হোসেন আনফিট!

সাহস ও দৃঢ়তার অভাবে বা ঘটনাচক্রে ড. কামাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ছিলেন পাকিস্তানে। দেশে ফিরেছেন বঙ্গবন্ধুর বদান্যতায় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও ড. কামাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। কিন্তু এবার তিনি উঠেছেন উল্টো রথে! এবার তার মিশন খালেদা-তারেক রক্ষা। আর বিএনপির দায়িত্ব স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতিভূ জামায়াত-শিবির বাঁচানো! অবশ্য সবাই জানেন, এ লড়াই তার নিজের নয়, সম্ভবত ভাড়ায় খাটছেন। উকিল বলে কথা, মক্কেলের পক্ষে দাঁড়ানোই দায়িত্ব!

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ড. কামাল প্রকারান্তরে সেটা স্বীকারও করেছেন। কয়েক মাস আগে মির্জা ফখরুল সাক্ষাৎ করে দেশের পরিস্থিতি বর্ণনা করে সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্যের দায়িত্ব নিতে বললে তিনি সম্মত হন। এদিকে সবাই জানেন, মির্জা ফখরুল কয়েক মাস আগে ড. কামাল হোসেনের কাছে গিয়েছিলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মামলার দায়িত্ব নেবার অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু ড. কামাল তাতে রাজি হননি। এরপর মির্জা ফখরুল হয়তো বেগম জিয়ার মুক্তির কেসকে গণতন্ত্র মুক্তির লড়াইয়ের আবরণে সাজিয়ে ড. কামালের সামনে উপস্থাপন করেছেন। হয়তো আরও ‘কিছু’ করেছেন! তাতেই গলে যান ড. কামাল। মুখে যাই বলেন না কেন, কার্যত ড. কামাল বেগম জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, বিএনপির পুনর্বাসন, জামায়াত রক্ষা মিশনে আছেন। আসলে তিনি দেশ তুলে দিতে চাইছেন তাদের হাতে যারা একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছে, যারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়েছ। এমনটাই ভাবছেন অনেকে।

কারো মতে, ড. কামাল হোসেন রাজনীতির অথবা লোভের ফাঁদে পড়েছেন। এবং তিনি যে হেরে গেছেন! অবশেষে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে সত্যটা স্বীকার করলেও ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয় না। অথবা পারছেন না। ড. কামাল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ২৬ ডিসেম্বর, প্রকাশিত হয়েছে ২৭ ডিসেম্বর। ড. কামাল তাকে ভুল বুঝিয়ে ফাঁদে ফেলার জন্য যাকে দায়ী করেছেন, সেই মির্জা ফখরুলকে পাশে বসিয়ে ২৭ ডিসেম্বরেই সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। সেখানে অবশ্য জামায়াত প্রসঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তিনি, ‘সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট বিপ্লব করার’ আহ্বান জানিয়েছেন। ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়া মানে কিন্তু জামায়াতের ২২ জনের পক্ষেও ভোট চাওয়া। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, ভোট কথিত ‘ভোট বিপ্লব’ হলে ক্ষমতায় আসবে জামায়াত-বিএনপি। দেশের দায়িত্ব নেবেন বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল, সাঈদী গং। তখন কি করতে পারবেন ড. কামাল হোসেন? তখন তাকে কে রক্ষা করবে? ১৯৭২ সালে তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বদান্যতায়। অবশ্য এখন বঙ্গবন্ধু না থাকলেও তার কন্যা আছেন; হয়তো তিনি ‘চাচাকে’ বাঁচাবেন!

লেখক  : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কলামিস্ট

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :