চিরি নদীর বাতিঘর

ইরফান রানা
 | প্রকাশিত : ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:১৯

লাল-সবুজে রাঙানো ছোট একটি ঘর। প্রবেশপথের পাশে স্ট্যান্ডে দৈনিক পত্রিকা বিছানো। ঘরের ভেতরে তাকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা বই-ম্যাগাজিন। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এসে বসে মাঝখানের টেবিলে। একমনে পড়ে নিজের পছন্দের বইটি।

‘চিরি নদীর বাতিঘর’। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার প্রাণকেন্দ্রের এই গ্রন্থাগারে প্রতিদিন শত শত পাঠক ছুটে আসেন বই পড়তে। বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে নিজের মনকে আলোকিত ও  বিকশিত করেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সংগঠন স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব চিরিরবন্দর (স্যাক) প্রতিষ্ঠা করেছে পাঠাগারটি।

গত বছরের ১১ মার্চ চিরিরবন্দর ডাকবাংলোর পাশে গড়ে ওঠা চিরি নদীর বাতিঘরে রয়েছে ১ হাজার ৬০০ বই। এলাকার ২০০ শিক্ষক-শিক্ষার্থী, উপজেলার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এই গ্রন্থাগারের নিয়মিত পাঠক।

গ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে চলে নিয়মিত পাঠচক্র, কবিতা পাঠ, স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি ও নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ। গ্রন্থাগারিক হিসেবে বিনামূল্যে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী মোকছেদ আলী।

চিরি নদীর বাতিঘরের নিয়মিত পাঠক সুদীপ্তা রায়। তিনি বলেন, ‘চিরি নদীর বাতিঘরে হুমায়ূন আহমেদ ও জাফর ইকবাল স্যারের অসংখ্য বই, কিশোর আলো, বিজ্ঞান চিন্তাসহ অন্যান্য বইয়ের মাধ্যমে আমরা পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বই পড়ার সুযোগ পাই, যা জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে সহায়তা করছে।’

বাতিঘরে বই পড়ে আনন্দ পাচ্ছে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আসিফ মাহমুদ। অবসর পেলেই ছুটে যায় চিরি নদীর বাতিঘরে। তার ভাষ্য, ‘এখানে রয়েছে হরেক রকম মজার বই। এখানে এসে বই পড়ার সময়টা অনেক উপভোগ করি।’

এই পাঠাগারের শিশুসাহিত্যের সব বই পড়ে ফেলেছে ক্ষুদে পাঠক চন্দ্রিমা রায়। বই পড়তে খুব মজা পায় সে। তাই এ রকম আর বই চায় চন্দ্রিমা।

দশম শ্রেণীর ছাত্র আমির আব্দুল্লাহ আগে ফেসবুক আর ইন্টারনেটে চোখ গুঁজে রাখত। সেসব দূরে ঠেলেছে চিরি নদীর বাতিঘর। আমির বলে, ‘ফেসবুক ও ইন্টারনেটে পড়ে থাকার চেয়ে বাতিঘরের পুরনো বইয়ের মধ্যে অনেক বেশি আনন্দ খুঁজে পাই। সময় পেলেই ছুটে আসি এই চিরি নদীর বাতিঘরে।’

গ্রন্থাগারের একজন নিয়মিত পাঠক চিরিরবন্দর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রন্থাগারের উদ্যেগটি এক অনন্য সাধারণ। বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বইগুলো গ্রন্থাগার থেকে নিয়ে পড়ছি। অনেকে এখান থেকে বই পড়ে উপকৃত হচ্ছে। আমি এর সমৃদ্ধি কামনা করি।’

কথা হয় গ্রন্থাগার কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এমন একটি সময় ছিল চিরিরবন্দরে কোনো গ্রন্থাগার ছিল না। সেই অভাববোধ থেকে চিরি নদীর বাতিঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। অনেকে বই দিয়ে সংগ্রহ সমৃদ্ধ করেছেন। পাঠকদের চাহিদার তুলনায় বইয়ের অপ্রতুলতা, আসবাবপত্রের অভাব এবং আর্থিক টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন পাঠকদের আগমন আশার আলো জাগিয়ে তোলে।’

গ্রন্থাগারের মাধ্যমে যুবসমাজ মাদক ও অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি থেকে মুক্তি পাবে এবং নিয়মিত পাঠচর্চার মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হোক এ কামনা করেন হাবিব।

এই গ্রন্থাগারের আরেক সংগঠক পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আক্তারুজ্জামান। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ পরিচালনা কমিটিতে রয়েছেন ২১ জন সদস্য। উপদেষ্টা কমিটির আর্থিক অনুদান এবং সদস্যদের মাসিক চাঁদায় পরিচালতি হয় চিরি নদীর বাতিঘর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :