খেজুর রস পোড়ে ইটের ভাটায়

আরিফিন তুষার, বরিশাল ব্যুরো
 | প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:২৮

শীতের সকালে আবছা আলোয় প্রকৃতি থাকে ভেজা, এক চুমুক খেজুরের রস প্রাণকে করে তাজা। নানা রকম খাবার, ফুল-ফল, সবজি ও পিঠাপুলির সমারোহ নিয়ে হাজির হয় শীত ঋতুকাল। এ সময়ে খাদ্যতালিকার প্রথমেই আসে সবার প্রিয় খেজুরের রস।

কিন্তু বরিশালের গ্রামগুলোতে গাছি ও গাছের অভাবে মুখরোচক খেজুর রস এখন বিলুপ্তির পথে। ইটভাটায় পুড়ছে স্বাদের খেজুরের রস। 
এলাকাবাসী জানায়, একসময় কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালটা খেজুরের রস ছাড়া জমত না। সকালের ঠান্ডায় মিষ্টি খেজুরের রস অমৃত হয়ে আসত তাদের কাছে। আশ্বিন থেকে রস সংগ্রহ শুরু হয়। সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায় পৌষ ও মাঘ মাসে। আবহাওয়া যত ঠান্ডা, গাছ তত বেশি রস দেয়। 

হিজলা ডিগ্রি কালেজের ছাত্র শাওন বলেন, একসময় শীতের সকালে সূর্যি মামা উঁকি দেওয়ার আগেই গাছিরা গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামিয়ে ছুটতেন দূর-দূরান্তের হাটবাজারে। কুয়াশাঘেরা সকালে গাছিদের কাঁধে করে হাঁড়ি ভরা রস নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এখন আর সচরাচর দেখা যায় না।

গৃহবধূ ফাতিমা বেগম বলেন, শীতের সকালে গাছ থেকে নামানো কাঁচা রসের স্বাদ যেমন বর্ণনা করা সম্ভব নয়, তেমনি জ্বাল দিয়ে রসের তৈরি বিভিন্ন খাবারের স্বাদও অতুলনীয়। কুয়াশামাখা সকালে খেজুর রসের তৈরি পায়েসের গন্ধে মৌ মৌ করত চারদিক। রসের অভাবে সেসব উৎসব এখন আর নেই। 

বিভিন্ন উপজেলার গাছিদের কাছ থেকে জানা যায়, ইটভাটার কারণে গত কয়েক বছরে অনেক খেজুরের গাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার বেশ কিছু অঞ্চলে অনেক খেজুরের গাছ দেখা যায়। সব অঞ্চলে কমবেশি খেজুর গাছ থাকলেও গাছির অভাবে মিলছে না রসের দেখা। নগরায়ণের ফলে পেশা বদলাচ্ছেন গাছিরা। 
তারা আরও জানান, একটি খেজুর গাছ লাগানোর পর রস দেওয়ার উপযুক্ত হতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। ২৫ বছর পর্যন্ত রস দিয়ে থাকে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে দৈনিক ১০-১২ লিটার রস পাওয়া যায়। তবে খেজুর রসের পরিমাণ গাছ কাটার কৌশল ও যত্নের ওপর নির্ভর করে। 

এবার ৩০টি খেজুর গাছ কেটেছেন হিজলা উপজেলার গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের মেমানিয়া গ্রামের গাছি রতন হাওলাদার। তিনি বলেন, তার কাছে প্রায় দুই ডজন গ্রামবাসী রস চাইলেও তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারেননি তিনি। প্রতিদিন গাছ থেকে রসের হাঁড়ি চুরি হয়ে যাচ্ছে। সারা রাত খেজুর গাছ পাহারা দিচ্ছেন। 
তিনি জানান, এখন গাছিরা  খেজুর  রস ও গুড় বিক্রি করে তাদের সংসার চালাতে পারছেন না। তাই এ ব্যবসার প্রতিও তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই।

একসময় গ্রামের প্রায় সব মানুষ শীতের সকালে বাজার করতে গিয়ে প্রথমেই এক গ্লাস খেজুরের রস খেয়ে নিতেন। হিজলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক তপন চক্রবর্তী বলেন, ‘এখন সেই দৃশ্য দেখা যায় না বললেই চলে। সরকারি উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে খেজুর গাছ লাগালে হয়তো আমাদের ছেে মেয়েদের মাঝে সেই পিঠা উৎসব ও শীত ঘিরে বাঙালির আনন্দোল্লাস আবার ফিরে আসবে।’ 
মুলাদী বন্দরে গুড়ের ব্যবসা করেন রোকন উজ্জামান। তার দোকানে আসল খেজুর রসের গুড় খুব বেশি নেই। শীত এলেই অনেক পাটালি গুড় বিক্রি হয়। প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এখন সাধারণ গুড় দিয়েই শীতকালীন নানান পিঠা খেতে হয়।

(ঢাকাটাইমস/১৩জানুয়ারি/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :