৫০ আসনে তিনটিতে ‘সুষ্ঠু’ ভোট দেখেছে টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৪ | প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:০০
ফাইল ছবি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যাবেক্ষণ করা ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৭টি আসনে অনিয়ম পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বাকি তিনটিতেই কোনো অভিযোগ ছিল না।

ভোটের মূল্যায়নে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থাটি বলেছে, ‘‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ বলা গেলেও ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ বলা যায় না।’’

গবেষণার প্রাথমিক প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার প্রকাশ করে টিআইবি। তফসিল ঘোষণার পূর্ব থেকে শুরু করে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। তবে আসনওয়ারি তথ্য প্রকাশ করা হবে পরে।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট। ২৯৯টি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল এককভাবে ২৫৭টিতে এবং জোটগতভাবে পেয়েছে ২৮৮ আসন। বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা সব মিলিয়ে আটটি আসন। আর একটি করে আসনে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

বিএনপি শুরু থেকেই এ নির্বাচনকে কারচুপি আখ্যা দিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, আগের রাতে সিল মারা, ভোটের দিন তাদের কর্মী- সমর্থকদের কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

টিআইবি বলছে, তাদের পর্যবেক্ষণ করা ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৭টিতে কোনো না কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়াা গেছে। এর মধ্যে বিএনপি যেসব অভিযোগ করছে, সেগুলো উঠে এসেছে টিআইবির প্রতিবেদনেও।

টিআইবির গবেষণা বলছে, তাদের পর্যবেক্ষণ করা ৫০টি আসনের মধ্যে ৪১টি আসনে জাল ভোট হয়েছে। ৩৩টি আসনে ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। ২১টি আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়েছে। ৩০টি আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট দেয়া হয়েছে। ২৬টি আসনে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
২০টিতে ভোট শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা হয়। ২২টিতে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। ২৯টিতে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

৩৬টি আসনে বিরোধীদলের প্রচারে বাধা দেয়া হয়েছে। ৪৪টি আসনে সরকারবিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীদের নামে মামলা করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও কর্মী কর্তৃক ভয়-ভীতি দেখানো হয়।

টিআইবি বলছে, তফসিল ঘোষণার পূর্ব থেকে নির্বাচন পর্যন্ত প্রার্থীদের গড় ব্যয় ছিল ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫ টাকা, যা নির্বাচন কমিশন দ্বারা নির্ধারিত ব্যয়সীমার তিনগুণেরও বেশি। আর প্রচারে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা (গড়ে পাঁচগুণের বেশি) এবং সবচেয়ে কম ব্যয় করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

‘নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ’
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি। নির্বাচনের সময়ে তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মোবাইলের জন্য ফোর-জি ও থ্রি-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়েছে। জরুরি ছাড়া মোটরচালিত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞাও নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক রফিকুল হাসান।

গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম। গবেষক দলের অপর সদস্যরা হলেন জুলিয়েট রোজেটি, তাসলিমা আক্তার, বিশ^জিৎ কুমার দাস এবং নাজমুল হুদা মিনা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো আসনেই নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা এককভাবে সক্রিয় ছিলেন। কোনো কোনো আসনে ক্ষমতাসীন দল প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে সুবিধা আদায় করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও প্রার্থীর প্রচারে অংশ নিয়েছেন এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে প্রচার চলেছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসনের একাংশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে, যেটি আইনের লঙ্ঘন এবং নীতিবিবর্জিত।’

‘সর্বোপরি আংশিকভাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে। কারণ একদিকে সকল রাজনৈতিক দল প্রার্থীতার মাপকাঠিতে নির্বাচনে ছিল, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয়তার বিবেচনায় বৈষম্য প্রকট ছিল। তাছাড়া অনেকক্ষেত্রে ভোটারগণ অবাধে ভোট দিতে পারেননি। আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অবশ্যই ব্যাপকভাবে লজ্জাজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকাও ছিল বিতর্কিত।’

‘আর এসব কারণেই নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বলা যায়, অভূতপূর্ব একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে; যার ফলাফলও অনেকের কাছেই অবিশ^াস্য হিসেবে আলোচিত হয়েছে।’

সুলতানা কামাল বলেন, ‘সংশয় থেকে যায়, যারা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে গেলেন, তারা আমাদের কতটুকু প্রতিনিধিত্ব করবেন, জনগণের স্বার্থ কতখানি দেখবেন।’

ছয় সুপারিশ

নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও কার্যকর করতে সংবাদ সম্মেলনে ৬ দফা সুপারিশ পেশ করে সংস্থাটি। সেগুলো হলো- একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহুমুখী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তাদের ব্যর্থতা নিরূপণ করে জনসমক্ষে প্রকাশ, সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সৎ, যোগ্য, সাহসী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ অন্যান্য অংশীজনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ হওয়া, নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ডিজিটালাইজ করা এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :