ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না শিক্ষা ভবনে

মহিউদ্দিন মাহী
 | প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০৮:৩৬

তিনি একজন শিক্ষক। এসেছেন বরিশাল থেকে। মঙ্গলবার দুপুরে তার সঙ্গে দেখা হয় রাজধানীর আবদুল গনি রোডের শিক্ষা ভবনে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ছয় মাসের আইসিটি কোর্স করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। ডিপ্লোমা না থাকায় আমার এমপিও হয়নি। পরে আদালতের মাধ্যমে রায় পক্ষে এনে আজকে এমপিওর জন্য আবেদন করলাম।’

তার পাশে ছিলেন আরও ১২ জন শিক্ষক। তারাও এমপিওবঞ্চনার শিকার। এবার এমপিওভুক্ত শিক্ষক হতে আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। এতক্ষণ যা হলো, তা নিয়মের কথা। মূল বিষয়টি জানা গেল কিছুক্ষণ পর। মাউশির ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন একজন। দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে বললেন, ‘কাজ হয়ে গেছে। ২০ তারিখের পর ফাইনাল রেজাল্ট পাওয়া যাবে। মাল জায়গা মতো দিয়ে এসেছি।’ আরও কিছু বলতে চাইলেন ওই শিক্ষক। কিন্তু এরই মধ্যে একজন ইশারা দিয়ে থামিয়ে দিলেন তাকে। কারণ আমি ওই গ্রুপের মধ্যে একজন অপরিচিত। সব জেনে ফেললে আবার ঝামেলা হয়ে যায় কিনা!

তবে ওই শিক্ষকের আলাদা কথা বলে জানা গেল মাধ্যমিক শাখার এক ব্যক্তিকে তাদের গ্রুপের সবাই মিলে আপাতত ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। কাজ চূড়ান্ত হলে আরও টাকা দিতে হবে। তার পরিমাণ আরও বেশি। তবে মাধ্যমিক শাখার কাকে টাকা দিয়েছেন, তিনি কর্মকর্তা নাকি কর্মচারী- তা স্পষ্ট করলেন না তিনি।

‘ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, নথি নড়ে না’- শিক্ষা ভবন বিষয়ে এসব কথা নতুন কিছু নয়। কেবল সময় বদলায়, ব্যক্তি বদলায়, বদলায় ভুক্তভোগীর চেহারা। এই কারণে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ এই দপ্তরে বদলি হতে চায় অনেকেই। এর জন্যও অবৈধ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

গতকাল পুরো কর্মঘণ্টায় অসহায় অনেক শিক্ষকেরই দেখা মিলল। ভবনের নিচতলায় দর্শনার্থী কক্ষে ছিলেন তাদের অনেকে। কেউ এসেছেন এমপিওর কাজে। কেউবা বদলি বা অন্য কোনো তদবিরের জন্য।

তবে গোপন লেনদেন গোপন রাখতে তৎপর সব পক্ষ। বাড়তি টাকা গুজে দিয়েও অনেকে সেবা পাননি। হয়েছেন প্রতারিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এমনি একজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হলো। তিনি জানালেন, ২০০৭ সালে এমপিও করে দেওয়ার জন্য টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই দালাল এখন উধাও। এখন পর্যন্ত এমপিও হয়নি। তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে এখন মামলা চলছে। ‘দুই দিক দিয়েই ধরা খেয়ে গেলাম। টাকাটা যদি এই ভবনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দিতাম, তাহলে আমার কাজটা এতদিনে হয়ে যেত। কিন্তু এখন তো আর সে উপায়ও নেই।’- আফসোস করছিলেন এই শিক্ষক।

শিক্ষা ভবনে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, এ কথা মানতে নারাজ মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘যেসব শিক্ষক টাকা লেনদেন করে তারা শিক্ষক নামে কলঙ্ক। এদের স্থান আমার দপ্তরে হবে না।’ 

আইসিটি শিক্ষকদের এমপিওবঞ্চনা বিষয়ে তার দাবি, ‘আইসিটির শিক্ষকদের এমপিও তো হয়েছে।’

উধাও অভিযোগ বক্স!

শিক্ষা ভবনের দুর্নীতি বন্ধে ২০১১ সালে ভবনের নিচতলায় মূল ফটকের পাশে বসানো হয়েছিল অভিযোগ করার বাক্স। ভুক্তভোগীরা যাতে হয়রানির কথা জানাতে পারে, তার জন্যে ছিল এই বাক্স। তখনকার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এই ‘অভিযোগ বক্স’ উদ্বোধন করেছিলেন।  কিন্তু সেই বাক্স এখন আর নেই। হেল্প ডেস্কের সামনে ছিল এর অবস্থান।

বক্সের বিষয়ে হেল্প ডেস্কের একজন কর্মী বলেন, ‘১৩০ নম্বর রুমে গিয়ে দেখেন।’ ১৩০ নম্বর রুমে গিয়ে দেখা যায়, রুমটি দর্শনার্থীদের। সেখানে কোনো অভিযোগ বক্স নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

আর মাউশির পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক শামছুল হুদার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) বলেন, ‘আমি এই ভবনে এসেছি এক বছর হলো। এতদিনে অভিযোগ বক্স আমার চোখে পড়েনি।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :