ইতালির মাফিয়াদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশিদের প্রতিরোধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪৪
ইতালির পালেরমোর অভিবাসীদের মার্কেট। ছবি: বিবিসি

ভিনদেশে দুর্ধর্ষ মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ইতালির সিসিলি দ্বীপের রাজধানী পালেরমোর শতাধিক অভিবাসী। যাদের একটি বড় অংশই বাংলাদেশি। এই প্রতিরোধের অংশীদার ছিলেন সেখানকার একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং স্থানীয় সাংবাদিক তোফাজ্জাল তপু। বিবিসিকে তিনি জানিয়েছিলেন, তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার গল্প।

আশির দশক বা তার কিছু আগে থেকেই বাংলাদেশিরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ইতালিতে যেতে শুরু করে। সেসময় তারা ছোটখাটো চুরি বা ছিনতাইয়ের মুখে পড়লেও এখনকার মতো মাফিয়াদের হুমকির মুখে কখনো পড়তে হয়নি। আগে যখন অভিবাসী ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কম ছিল তখন এই মাফিয়া চক্র স্থানীয় ইতালীয়দের থেকেই মোটা অংকের চাঁদা সংগ্রহ করতো।

এক পর্যায়ে ইতালীয়রা প্রতিবাদ শুরু করলে প্রশাসন তাদের ধরপাকড় শুরু করে এবং মামলা দায়ের করে। এমন অবস্থায় মাফিয়ারা ইতালীয়দের থেকে সরে এসে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অভিবাসী ব্যবসায়ীদের লুটপাট করতে শুরু করে। দিন দিন অভিবাসীদের কমিউনিটি বড় হতে থাকলে তাদের ওপর মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য বাড়তেই থাকে।

বর্তমানে সিসিলিকে ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী আছেন বলে জানান তপু। শুরুতে শুরুতে অভিবাসীদের ব্যবসায়ীদের থেকে নামে বেনামে চাঁদা তোলা শুরু হয়। এক পর্যায়ে সেটা ডাকাতি, প্রাণনাশের হুমকি এবং খুনাখুনি পর্যায়ে চলে যায়।

তপু বলেন, ‘ধরেন আপনি বাজারে একটা দোকান নিয়ে বসেছেন। এজন্য প্রতিমাসে আপনাকে বাজার ভাড়ার সঙ্গে গির্জার কর দিতে হত। এটা থেকেই মূলত শুরু। তারপর অনেক মাফিয়ারা বাজারে প্রবেশ করে মানুষদের জিনিষপত্র ইচ্ছামতো নিয়ে চলে যেত। কারও টাকা পরিশোধ করত না।’

মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যে পালেরমোর অভিবাসীদের মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিন চার বছর আগেও প্রতিটি মানি এক্সচেঞ্জ এক থেকে একাধিকবার ছিনতাইয়ের শিকার হয়। পালেরমোতে ছোট বড় যতো অপরাধই হোক না কেন এর মূল কলকাঠি নাড়ায় মাফিয়ারা। এটাই ওপেন সিক্রেট।’

তপু জানান, ইতালির মাফিয়া ডনদের আখড়া সিসিলি। তাদের বিরুদ্ধে আগে যারাই মামলা করেছিল তাদের অনেককেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেউই মুখ খোলার সাহস করত না।

তপু বলেন, ‘পালেরমোতে থেকে মাফিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা মানে হল, জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করার মতো। কেননা যিনি মামলা করবেন তার নাম রেকর্ড থাকায় তার জীবনটাই হুমকির মুখে পড়ে যায়। এটা কেউ চাইত না বলেই চুপ থাকত। হুমকি বা চাঁদাবাজির কোন অভিযোগ তারা করতো না।’

সম্প্রতি পালেরমোর বাজারে ইউসোফা সুসো নামে এক গাম্বিয়ান অভিবাসীকে এক মাফিয়া সদস্য প্রকাশ্যে হত্যা করলে সেটা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্য দেশের অভিবাসীরাও ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে যান। এতদিন তারা মুখে কুলুপ আঁটলেও এই হত্যার ঘটনায় তারা প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে গোপনে প্রতিরোধ শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন মাফিয়া বিরোধী সংগঠন।

এই হত্যাকাণ্ড ও হয়রানির বিরুদ্ধে এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল শুরু হলে দেশি ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি শুরু করে। ইতালির বর্তমান সরকার অবৈধ অভিবাসীদের প্রবেশ বন্ধে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও পালেরমোর অভিবাসী-বান্ধব মেয়র নিজ শহরের অভিবাসীদের ওপর মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য বন্ধে সোচ্চার ভূমিকা নেন। এমন অবস্থায় নাড়াচাড়া দিয়ে ওঠে প্রশাসনও। এক পর্যায়ে সবার সহায়তায় পালেরমোর প্রায় দুটি হাজার একশটি দোকানের মালিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাফিয়াদের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন।

এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে প্রায় অর্ধশত মাফিয়া সদস্যদের গ্রেফতার করে। পালেরমোর সিটি মেয়র মাফিয়াদের বিরুদ্ধে খুবই কঠোর ভূমিকা নেয়ায় এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন তপু। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ী আর মাফিয়াদের বসবাস কাছাকাছি স্থানে। তাই তাদের বিরুদ্ধে আমরা প্রকাশ্য লড়াইয়ে যাচ্ছিনা বরং আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে আমরা যদি মাফিয়াদের নজরে পড়ে যাই, তাহলে যে কোন সময় যে কোন কিছু হয়ে যেতে পারে।’

এতো নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও কোন অবস্থা থেকেই প্রতিরোধ থেকে পিছু হটবেন না বলে জানিয়েছেন তপু। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, ‘এই প্রথমবারের সব অভিবাসী ব্যবসায়ীরা এক হয়েছে। স্থানীয় কিছু ইতালীয় নাগরিকও প্রতিবাদ করছে। মাফিয়া বিরোধী সংগঠন সেইসঙ্গে প্রশাসনের সুনজর থাকায় আমাদের কিছুটা হলেও সাহস আছে। এটা আমরা ভেঙ্গে যেতে দেব না।’

তপুর মতে, এই প্রতিরোধের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে অভিবাসীরা এখানে শুধু টাকা উপার্জনের জন্য আসেনি। বরং তারাও ইতালির ভাল মন্দের অংশীদার। তিনি বলেন ‘এই দেশকে আমরা নিজের বলেই মনে করি, কেননা এখানে কোন সংকট হওয়া মানে আমাদেরও ক্ষতি হওয়া। এ কারণে আমরাও দেখিয়ে দিয়েছি যে এই দেশের শান্তির জন্য ইতালীয়দের পাশাপাশি আমরা অভিবাসীরাও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি।’

ঢাকা টাইমস/১৬জানুয়ারি/একে

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত