ভোট নিয়ে মামলার আগেই হতাশ ঐক্যফ্রন্ট

জহির রায়হান
 | প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০৮:৪৩

নির্বাচনের ফলাফলের বিরুদ্ধে মামলার ঘোষণা থাকলেও এর সুফল মিলবে কি না এ নিয়ে সংশয় আছে খোদ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেই। জয়ের আশা না থাকলেও আইনি সব সুযোগ নেওয়াই মামলা করার উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন জোটের একাধিক নেতা।

অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনের পর যত মামলা হয়েছে, তার মধ্যে সংসদের মেয়াদকালে নিষ্পত্তি হয়েছে কেবল তিনটি। একাধিক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য পদ শূন্য ঘোষণা হলেও আপিল করে সংসদের মেয়াদ থাকা পর্যন্ত পদ টিকিয়ে রাখার উদাহরণ রয়েছে।

গত ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে ২৯৯টি আসনের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট পেয়েছে কেবল আটটি। দুটি আসনে জিতেছেন দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী যাদের একজন আওয়ামী লীগ সমর্থিত এবং একজন বিএনপি সমর্থিত। বাকি ২৮৮টি আসন জিতেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট, যার মধ্যে ২৫৭টি এককভাবে আওয়ামী লীগ, ২২টি জাতীয় পার্টি এবং নয়টি আসন নৌকা নিয়ে পেয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বিকল্প ধারা এবং তরীকত ফেডারেশন।

বিএনপির দাবি, এই ফলাফলে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। তাদের হারানো হয়েছে ভোট ডাকাতি করে। আর প্রতিটি আসনেই পরাজিত প্রার্থীরা মামলা করবে বলে ঘোষণা এসেছে। আর মামলা করতে তথ্য প্রমাণ কেন্দ্রে পাঠাতে নির্দেশও দেওয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। অবশ্য ১০ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন আসেনি বেশির ভাগ আসন থেকেই।

ভোটের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের এক মাসের মধ্যে মামলা করতে হয়। তবে গত ১০টি সংসদ নির্বাচনের পর মামলার পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, মামলার নিষ্পত্তিই করা যায় না

বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সংসদের মেয়াদ থাকা অবস্থায় মামলা শেষ না হলে এর আর প্রাসঙ্গিকতা থাকে না।’

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে নবম সংসদ নির্বাচনের পর। ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের করা ১০টি মামলার মধ্যে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা যায় কেবল দুটির। বাকি মামলায় সংসদ সদস্যরা মেয়াদ শেষ করেছেন। দশম সংসদ নির্বাচনে চারজন আবার হন পুনর্নির্বাচিত। ফলে আগের মামলার আর কার্যকারিতা থাকেনি।

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলের বিরুদ্ধে মামলা করে সংসদে বসেছেন দুজন। একজন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং অপরজন মাহমুদুল হাসান। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতা ও তখন ন্যাপ (মোজাফফর) নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে মামলাটি করেন। দ্বিতীয়বার এই ঘটনা ঘটতে লেগে যায় প্রায় চার দশক। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসনে বিএনপি নেতা মাহমুদুল হাসান হারার পর মামলা করে তিনি ওই সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

নবম সংসদ থাকাকালে আরও একটি মামলার ফয়সালা হয়। ভোলা-৩ আসনের ফলাফলের বিরুদ্ধে মামলা করে জেতেন বিএনপি নেতা হাফিজউদ্দিন আহমেদ। তবে তিনি সংসদে বসতে পারেননি। আবার নির্বাচন হলেও হেরে যান তিনি।

এর আগে ১৯৭৯ সালে সুনামগঞ্জের একটি আসনে বিজয়ী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে মামলা করে জয়ী হয়েছিলেন গোলাম জিলানী নামে একজন প্রার্থী। তবে তিনি সংসদে যোগ দেওয়ার আগেই সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এইচএম এরশাদ সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

অষ্টম সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসনে জয়ী জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং নবম সংসদ নির্বাচনের চাঁদপুর-১ আসনে জয়ী মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে সংসদ সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা হলেও আপিল করে তারা পুরো মেয়াদ পার করেন।

ময়মনসিংহ-৯ আসনে আবদুস সালাম (আ.লীগ), ঝিনাইদহ-৩ আসনে শফিকুল আজম খান (আ.লীগ), নড়াইল-১ আসনের কবিরুল হক (আ.লীগের বিদ্রোহী), বরিশাল-৪ আসনের মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ (বিএনপি), বরিশাল-৬ আসনের এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার (জাতীয় পার্টি) এবং সংরক্ষিত নারী আসন ৪২ এর সদস্য নাসরিন জাহান রতœা (জাতীয় পার্টি) সংসদের মেয়াদ পার করে দেন মামলা নিষ্পত্তির আগে।

সবশেষ দশম সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলার মধ্যে দুটি খারিজ হয়ে যায় সরাসরি। বাকিগুলোর কী হয়েছে, সে তথ্যও পাওয় যায় না।

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেই মামলার সুফল মিলবে কি না, এ নিয়ে তার সংশয়ের কথা বলেন। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘ফলাফল কী আর হবে? সঠিক ফল পাব না, তারপরও মামলা করছি।’

তবে মামলায় কেন যাচ্ছেন - জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘তারা যেন বলতে না পারে আমরা মামলা করিনি, অভিযোগ করিনি।’

তবে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল না পাওয়ায় মামলার প্রস্তুতিতে বিঘœ ঘটছে। জাফরুল্লাহ বলেন, ‘জেলা রিটারিং কর্মকর্তা কাগজ দিচ্ছে না। আমাদের হাতে সময় আছে ১০ দিন। তার পরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

ঐক্যফ্রন্টের আরেক নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘মামলা করে এর ফলাফল কী হবে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। সব কিছু দলীয়করণ করা হয়েছে। এ জন্য ফলাফল আশা করছি না। রেজিস্ট্রি করার জন্য মামলাগুলো করছি। অন্তত ইস্যু তো থাকল, রেজাল্ট কী হয় সেটা বিষয় নয়।’

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রার্থীর আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে তিনি মামলা করতে পরেন। হাইকোর্টের বিভাগে নির্ধারিত বেঞ্চে এই মামলা করতে হবে। সেখানে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে আপিল বিভাগে যেতে হবে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘নির্বাচনী বিরোধ নিয়ে মামলার রায় যেন দ্রুত দেওয়া হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ট্রাইবুনালকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দীর্ঘ সময় লাগলে অনেকে মামলা করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমার জানা মতে ছয় মাসের মধ্যে এই মামলা নিস্পত্তি করতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যর বিষয় আমাদের সেটা হচ্ছে না। মামলা দ্রুত শেষ করার ব্যপারে আদালতকেই ভূমিকা নিতে হবে। তবে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশকেও উদ্যোগী হতে হবে, তাদের চাপ প্রয়োগ করতে হবে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :