প্রকল্প অনুমোদনের ভুয়া চিঠি দেখিয়ে কোটি টাকা লুট

সাতক্ষীরা প্রতিবেদক
 | প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:০৪

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্রের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ। এর অধীনে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ দেখিয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকা নয়ছয় করার অভিযোগ ওঠে।

কিন্তু এখন জানা গেছে, যে চিঠির মাধ্যমে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হয়, সেটিই ছিল ভুয়া। সাতক্ষীরার একজন আইনজীবীর সহযোগিতায় উদ্ঘাটনের পর তোলপাড় চলছে। বিষয়টি তদন্তের দাবি তুলেছে বিভিন্ন মহল।

২০১৫ সালের ৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব জুবাইদা নাসরিন স্বাক্ষরিত স্মারকে বিভিন্ন প্রকল্পের অনুমোদন সংবলিত চিঠিটি আসে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদে। এতে বলা হয়, জেলা পরিষদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে তিন কোটি ১১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ১৮৭টি প্রকল্প ও তিন কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ২৮৪টি প্রকল্প ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাজস্ব তহবিলের সংস্থান সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের জন্য শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হলো। পাঁচটি শর্তের মধ্যে ছিল জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তার একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলো ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মধ্যেই বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনোভাবে সম্ভব না হলে পরবর্তী অর্থবছরে শেষ করতে হবে।

এই অনুমোদন দেখিয়ে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার ঈদগাহ, মসজিদ ও মন্দিরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের নামে গৃহীত প্রকল্পে রাজস্ব তহবিলের টাকা ব্যয় দেখানো হয়।

এ অবস্থায় জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কুমারখালীর বাসিন্দা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সত্যরঞ্জন ম-ল চিঠিটি সঠিক কি না তা জানতে তথ্য অধিকার আইনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানান। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের মনিটরিং শাখার উপ-সচিব সামছুল ইসলাম ওই আইনজীবীকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান।

পরে ১৯ ডিসেম্বর সত্যরঞ্জন ম-ল জানতে পারেন, প্রকল্প অনুমোদনের ওই চিঠিটিই ছিল ভুয়া। একই স্মারকে থাকা চিঠিটি আসলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের শূন্যপদে লোক নিয়োগ-সংক্রান্ত। মূলত অসৎ উদ্দেশে একে অপরের যোগসাজশে ভুয়া চিঠি তৈরি করে প্রকল্পের অনুমোদন দেখানো হয়।

সেই সঙ্গে যেসব প্রকল্প দেখিয়ে টাকা ব্যয় করা হয়েছে, তাতেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজ না করে টাকা ভাগাভাগী করে নেওয়া হয়েছে।

২৩ ডিসেম্বর সত্যরঞ্জন ম-ল জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার দাবিতে দুদকে আবেদন জানান।

জেলা পরিষদের সদস্য মাহফুজা সুলতানা রুবি বলেন, ‘ভুয়া অনুমোদন দেখিয়ে টাকা আত্মসাতের সময় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন এস এম মাহাবুবর রহমান। এখন রাজস্ব তহবিলে অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় মন্ত্রণালয় থেকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় যে ছয় কোটি টাকা অনুদান হিসেবে এসেছে, তা থেকে সমন্বয়ের বিষয়ে জেলা পরিষদের সাধারণ সভায় আলোচনা হয়েছে। অনেকে দুই কোটি টাকা সমন্বয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন। আবার কয়েকজন দ্বিমতও পোষণ করেছেন। ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে টাকা আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে খুব শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন জানাব।’

ভুয়া চিঠিতে প্রকল্প গ্রহণের সময় জেলা পরিষদের প্রশাসক ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ভুয়া অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি নির্বাচনের পর শুনেছি। সে সময় জেলা পরিষদ ও মন্ত্রণালয়ে যারা কর্মকর্তা ছিলেন, তারা এতে জড়িত। তারাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। আমি শুধু ফাইলে স্বাক্ষর করতাম।’

সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ থেকে সম্প্রতি খুলনায় বদলি হওয়া এস এম মাহাবুবর রহমানের সঙ্গে রোববার বিকালে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহসিন আলী বলেন, ‘ভুয়া প্রকল্পের বিষয়টি একজন আইনজীবী উদ্্ঘাটন করেছেন। তিনিই অভিযোগ করেছেন দুদকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দুদক বা মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা পাইনি। কয়েক মাস আগে এখানে যোগদানের কিছুদিন পর সাড়ে তিন কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতির বিষয়টি আমার নজরে আসে। এখন ফান্ড সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত