দেশের কৃষির জন্য বিপদসংকেত, ফসলখেকো ‘আর্মিওয়ার্ম’ শনাক্ত

রাজিবুল হক সুমন, মেহেরপুর
| আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৫১ | প্রকাশিত : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:৩৭

আফ্রিকা মহাদেশে বিপর্যয় তৈরি করা ফসলবিধ্বংসী পোকা ‘ফল আর্মিওয়ার্ম’ ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশে। এই পোকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কার্যকর অস্ত্র কী হতে পারে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে এই খবরকে কৃষির জন্য বিপদসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই পোকাটি আমেরিকা মহাদেশে প্রথম শনাক্ত হয়। তবে এরা দ্রুত অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ২০১৬ সালে এটির প্রথম আক্রমণ হয় আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে। ২০১৭ সালের প্রথম দিকেই সে অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে ব্যাপক ফসলহানি করে এমনকি দুর্ভিক্ষেরও সৃষ্টি হয়।

কৃষিবিদরা জানান, এই পোকার সংক্রমণ দেখা দিলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফসলের ক্ষেত পুরোটারই ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। আর বাংলাদেশের আবহাওয়া আর যে ধরনের ফসল এখানে চাষ হয়, তাতে এই দেশটি ভয়ঙ্কর এই পোকার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ জায়গা হতে পারে।
ভুট্টাসহ বেশ কিছু ফসলের ক্ষেতে এই পোকার আক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মেহেরপুরের কৃষি কর্মকর্তারা। কীটনাশক প্রয়োগ করেও মিলছে না সুফল। 
সম্প্রতি ভারতের কর্নাটক এবং তামিলনাড়– রাজ্যে এ পোকার আক্রমণ দেখা যায়। ইন্টারনেট ঘেঁটে পাওয়া তথ্য বলছে, এই পোকা দিনে ১০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। তাদের বংশবিস্তার হয় দ্রুত। এটি ভুট্টা, তুলা, বাদাম, তামাক, ধান, বিভিন্ন ধরনের ফলসহ প্রায় ৮০টি ফসলে আক্রমণ করে থাকে। তবে ভুট্টা ফসলে এর আক্রমণের হার সর্বাধিক।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মঞ্জুরী আখতার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ভয়ানক এই পোকা গত বছর থেকে দেশের বেশ কিছু জায়গায় প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। এরই মধ্যে মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ এবং চুয়াডাঙ্গাতে এ পোকার হাতে ফসল ধ্বংস করার খবর জানা গেছে।’

এই বিশেষজ্ঞের আশঙ্কার কথা হচ্ছে, আবহাওয়া এবং ফসলের ধরনের কারণে এই পোকার আদর্শ স্থান হতে পারে বাংলাদেশ। এ দেশের অধিকাংশ ফসলই ঘাস জাতীয় এবং পোকা এসব ফসলেই বেশি আক্রমণ করে থাকে। যে কারণে আমাদের দেশের ফসলের ক্ষেতে পোকাটির বিস্তারের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

পোকাগুলো শুককীট থাকা অবস্থায় গাছের পাতা ও ফল খেয়ে থাকে। এই পর্যায়ে এদের খাদ্য চাহিদা অনেক কম থাকে, তবে তারা বড় হলে খাদ্য চাহিদা প্রায় ৫০ গুণ বাড়ে। সেকারণে পূর্ণাঙ্গ পোকা হয়ে ওঠার আগেই তারা রাক্ষুসে হয়ে ওঠে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। এক রাত্রের মধ্যেই তারা সব ফসল বিনষ্ট করে ফেলতে পারে।
পোকাটি সঙ্গনিরোধ বালাই হিসেবে পরিচিত। ডিম ও পুত্তলি অবস্থায় বিভিন্ন উদ্ভিদজাত উপাদান যেমন বীজ, চারা, কলম, কন্দ, চারা সংলগ্ন মাটি ইত্যাদির মাধ্যমে বিস্তারলাভ করতে পারে। পূর্ণাঙ্গ পোকা অনেক দূর পর্যন্ত উড়তে পারে এমনকি ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে কয়েক শত কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তারলাভ করতে পারে।

পোকাটির জীবনচক্রে চারটি ধাপ রয়েছে: গ্রীষ্মকালে ৩০ থেকে ৩৫ দিন এবং শীতকালে ৭০ থেকে ৮০ দিনে তারা জীবনচক্র সম্পন্ন করে। এর মধ্যে ডিম ৩ থেকে ৫ দিন, শুককীট ১৪ থেকে ২৮ দিন, পুত্তলি ৭ থেকে ১৪ দিন এবং পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় ১১ থেকে ১৪ দিন অতিবাহিত করে। স্ত্রী পোকা সাধারণত পাতার নিচের দিকে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে শুককীট বের হয়ে পাতা বা ফল খাওয়া শুরু করে।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক স্বপন আলীর ভুট্টা ক্ষেতে দেখা মিলেছে ‘ফল আর্মি ওয়ার্ম’ পোকার। তারা গাছের পাতা থেকে শুরু করে কা- পর্যন্ত খেয়ে ফেলছে। যেসব গাছে ইতোমধ্যে আক্রমণ করেছে সেই গাছগুলোতে আর ভুট্টা হবে না।

এই পোকার মুখের দিকটা ইংরেজি ওআই আকৃতির এবং পেছনের দিকে চারটি কালো ফোটা আছে। যা অন্যান্য ‘ল্যাদা পোকা’র চেয়ে আলাদা। একটি পরিণত বয়সের ‘আর্মিওয়ার্ম’ অসংখ্য বাচ্চা দিতে পারে। দিনের বেলায় পোকাগুলো গাছের কা-ের মধ্যে ও মাটিতে অবস্থান করলেও সন্ধ্যার পর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিটি গাছে।
ক্ষেতে পোকার আক্রমণ দেখে কীটনাশক দিয়েও কাজ হয়নি, এখন স্বর্ণা দিয়ে খুঁজে বের করে মেরে ফেলছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক। দমন করা না গেলে মারত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে এই পোকা।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এই পোকাটি আমেরিকা ও কানাডায় শনাক্ত হলেও কীটনাশক দিয়ে দমন করা সম্ভব হয়নি। 

গাংনীর কৃষক স্বপন আলী বলেন, ‘দিন দশেক আগে আমার ভুট্টা ক্ষেতে পোকার আক্রমণ চোখে পড়ে। এই পোকা আগে কখনো দেখিনি। কয়েক দফা কীটনাশক ছিটিয়েও কোনো কাজ হয়নি। ফসল বাঁচাতে সুচ ও স্বর্ণা দিয়ে খুঁজে বের করে মেরে ফেলছি। এ ছাড়া আর কোনো উপায়ও দেখছি না। কারণ চোখের সামনের পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাবে।’
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘বিধ্বংসী এই পোকাটি ফসলের শতভাগ ক্ষতি করতে পারে। এই পোকা কীটনাশক দিয়ে দমন করা বেশ কষ্টকর। দেখা মাত্রই হাত দিয়ে মেরে ফেলতে হবে, না হলে দ্রুত বংশবিস্তার করে। অথবা জমিতে প্লাবন সেচ দিতে হবে।’

এই পোকা মাটির নিচে থাকলে কিছূটা নির্মূল করা সম্ভব বলেও জানান এই কৃষি কর্মকর্তা। বলেন, ‘না হলে ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। তবে কৃষি বিভাগ বিষয়টি নিয়ে বেশ তৎপর রয়েছে পোকাটি যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য কাজ করছে। এ ছাড়াও এই পোকা দমনে কৃষকদের মধ্যে ফেরোমন ফাঁদ সরবরাহ করা হচ্ছে।’
প্রস্তুতি নেই বাংলাদেশের
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের মঞ্জুরী আখতার ঢাকা টাইমসকে বলেন, আর্মিওয়ার্ম’ প্রতিরোধের মতো উল্লেখ করার মতো কোনো প্রস্তুতি নেই বাংলাদেশের। এই অবস্থায় যদি কোনোভাবে দেশজুড়ে এ পোকার বিস্তার ঘটে, তাহলে সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় এ পোকার কারণে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই এ বিষয়ে কালবিলম্ব না করে আমাদের সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এখন।’


করণীয় কী?

ভয়ঙ্কর এই পোকা প্রতিরোধ করাও অনেক কঠিন বলেও জানান মঞ্জুরী আখতার। এর লার্ভাটাকে পুড়িয়ে ফেলা বা মাটিতে পুঁতে ফেলাই এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে ভালো বিকল্প। কিন্তু বেশিসংখ্যক পোকা নিধনের ক্ষেত্রে তো এটা সম্ভব নয়। 

আর একটা উপায় আছে, তা হলো এর জন্য বিশেষ কীটনাশক হেলিকপ্টার থেকে স্প্রে করতে হবে। আবার স্প্রে করতেও হবে খুব জোরে যাতে পোকা মাটিতে পড়ে যায়।
কৃষকদের সতর্ক থকার পরামর্শ দিয়ে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, ‘ফসলের মাঠে এ ধরনের  পোকা দেখতে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্মীদের বিষয়টি অবহিত করার পাশাপাশি তাদের কাছে পরামর্শ নিতে হবে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :