খোঁজ নিচ্ছে না কেউ, হতাশায় এলজিইডির আন্দোলনকারীরা

সিরাজুম সালেকীন
| আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:৩৪ | প্রকাশিত : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:২৫

ফেরদৌসি খাতুন। দেড় যুগের বেশি সময় ধরে নড়াইলের লোহাগড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগে (এলজিইডি) অফিস সহকারী পদে কাজ করছেন। কিন্তু তার চাকরি এখনো স্থায়ী হয়নি।

চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি ভবনের সামনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন। শনিবার হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন। পরে সহকর্মীরা তাকে তৎক্ষণাৎ পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে।

দৈনিক মজুরিভিত্তিক (মাস্টার রোল) কর্মচারী ও বিভিন্ন প্রকল্প কর্মকর্তাদের এই আন্দোলন চলছে ১০ দিন ধরে। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এই আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের অনেকে ফেরদৌসির মতো শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই সংখ্যা কুড়িজনের বেশি বলে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন।

এর মধ্যে গুরুতর অসুস্থরা হলেন ফরিদপুর এলজিইডির রোলার চালক শাহজাহান মোল্লা, গাইবান্ধার রোলারচালক সাজেদুল ইসলাম, বদিউজ্জামান, বরিশাল এলজিইডির রোলারচালক মনির, উপ-সহকারী প্রকৌশলী বোরহান উদ্দিন, মমিনুর রহমান, অফিস সহকারী কাজী কামরুল ইসলাম, নড়াইলের লোহাগড়ার ফেরদৌসি খাতুনসহ অনেকে। অসুস্থরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আবার চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন কেউ কেউ।

গত ২৮ জানুয়ারি ঢাকার এলজিইডি ভবনের সামনে চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করে অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যাও বাড়ছে। এতে মাঠ পর্যায়ে এলজিইডির কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে বলে এলজিইডির বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করছেন, তাদের এই লাগাতার আন্দোলনে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ পর্যন্ত তাদের ডেকেও কথা বলেনি কেউ। সব মিলিয়ে হতাশয় ডুবছেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারীদের একজন বলেন, ‘আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দীর্ঘদিন এলজিইডিতে কাজ করেছি। অথচ ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই। কাল চাকরি থেকে বাদ দিয়ে দিলে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই দাবি আদায় না হলে আমরা কেউ ঘরে ফিরে যাবো না।’

২০১০ এবং ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট এলজিইডির মাস্টার রোল ও উন্নয়ন প্রকল্পের সাত হাজার ৫২৬ চাকুরেকে স্থায়ী নিয়োগ দিতে নির্দেশ দেয়। ওই রায়ের পর মাত্র তিনহাজার ৮২৩ জনকে স্থায়ী করা হয়। পদ শূন্য না থাকায় বাকিদের পরে স্থায়ী করা হবে বলে ঘোষণা দেওযা হয়েছিল। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, এখন পদ শূন্য থাকলেও তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। বরং বাইরে থেকে এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।

এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী (অস্থায়ী নিয়োগ) মেহেদী হাসান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘৬৪ জেলা থেকে আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঢাকায় এসে অবস্থান নিয়েছেন। আন্দোলন ও কর্মবিরতি চলবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আন্দোলনে নামতাম না। কিন্তু প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘ তিন বছর ধরে আমাদের আশ^াস দেওয়া ছাড়া কিছুই দিতে পারেননি। তার কারণে তিন হাজার আটশর বেশি পরিবার অনাহারে জীবন কাটাচ্ছে। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি কামনা করছি। তিনি যদি আমাদের জন্য কিছু না করেন, তাহলে মৃত্যু ছাড়া আমাদের কোনো পথ থাকবে না।’

পটুয়াখালী থেকে ঢাকা এসে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় সব সময় বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়। কর্মকর্তা হলেও পিয়নের মতো কাজ করানো হয়। মাঝে মাঝে গালিগালাজ শুনতে হয়। করা হয়। স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো অনুষ্ঠানেও আমাদের মূল্যায়ন হয় না। অনেক সময় খাবার নিয়েও বৈষম্য করা হয়।’

সাইফুল ইসলাম জানান, মাস্টার রোল ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায়ই চার থেকে পাঁচ মাস বেতন বকেয়া থাকে। সারা মাস কাজ করলেও বেতনের সময় ১৮ দিনের বেশি বেতন তারা পান না। এর প্রভাব পড়ে পরিবারে। সংসার চালাতে পারেন না। বাড়িভাড়া দিতে পারেন না। খুবই দুর্বিষহ জীবন কাটে তাদের। তারা এ থেকে মুক্তি চান।

জানতে চাইলে এলজিইডি কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা সোমবার থেকে কালো ব্যাচ পরে অবস্থান ধর্মঘট করে যাচ্ছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে অবস্থান নিয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে নারীদের বেশি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কতটা অমানবিক হলে, আমাদের ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত করে, চিন্তা করা যায় না। তারা এতটায় শক্তিশালী যে আদালতের আদেশও মানছেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমরা এর প্রতিকার চাই।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :