অপূর্ব সৌন্দর্য বুকে নিয়ে ডাকছে রাজার পাহাড়

শেরপুর প্রতিবেদক
 | প্রকাশিত : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:১৪

চারপাশে পাহাড়, ছোট-বড় অসংখ্য টিলা আর নদীঘেরা রাজার পাহাড় অবারিত সবুজের সমারোহে সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা প্রায় ১৫০ ফুট উচ্চতার টিলাটিকে ঘিরে রয়েছে নানা কিংবদন্তিও।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গারো পাহাড়ের অংশ এই রাজার পাহাড়। মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশছোঁয়া বিশাল পাহাড়টির সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য প্রতিবেশী পাহাড়গুলোর তুলনায় আলাদা, উচ্চতাও সবচেয়ে বেশি। এর চূড়ায় শতাধিক হেক্টরের সমতলভূমি সবুজ আর নীলের সংমিশ্রণ। চূড়ায় যাওয়ার সরু পথের অদ্ভুত নির্জন পরিবেশ।

ইতিহাস বলছে, প্রাচীনকাল থেকেই এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। সম্ভ্রান্ত রাজবংশের এক রাজাও থাকতেন। তার কারণেই এর নাম হয়েছে রাজার পাহাড়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন শত শত মানুষের সমাগম ঘটছে। শেরপুর শহর থেকে ৩৪ কিলোমিটার এবং শ্রীবরদী পৌর শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের পাহাড়টি পরিণত হয়েছে বিনোদন স্পটে। এর নৈসর্গিক দৃশ্যসহ দূর থেকে মেঘালয় রাজ্যের সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করা ভ্রমণপিপাসুদের দাবি, এটি পর্যটনকেন্দ্র হলে তাদের চাহিদা পূরণে যোগ হবে নতুন মাত্রা। দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। প্রতিবেশী গ্রামগুলোর বেকারদের জন্য হবে কর্মসংস্থানের নতুন পথ। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদভারে আরও মুখরিত হবে রাজার পাহাড়।

জেলা প্রশাসন বলছে, ‘তুলসীমালার সুগন্ধে পর্যটনের আনন্দে’- স্লেøাগানে দেশ-বিদেশে শেরপুরকে ব্র্যান্ডিং করছে তারা, যেখানে নতুন মাত্রায় যুক্ত হয়েছে রাজার পাহাড়।

পাহাড়ের পাশে আদিবাসী জনপদ বাবেলাকোনা ও চান্দাপাড়া। অসংখ্য উঁচু টিলায় ঘেরা অনন্যসুন্দর গ্রাম দুটিতে গারো, হাজং ও কোচ সম্প্রদায়ের বসবাস। তাদের জীবনধারা ও নানা ধরনের সংস্কৃতি ভিন্নমাত্রার ও বৈচিত্রপূর্ণ। জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে তাদের মিতালি এই জনপদের চলমান জীবনসংগ্রামের বিরল দৃশ্য তুলে ধরে। তাদের চালচলন, কথাবার্তা ও জীবনপ্রণালিও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। 

বর্ষাকালের জোয়ারে পাহাড়টির কর্নঝোড়া ঢেউফা নদী কানায় কানায় ভরে ওঠে। কিন্তু দিনের শেষে ভাটা পড়ে শুকিয়ে যায় নদীর পানি। এর বুকজুড়ে রয়েছে বিশাল বালুচর, যা নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শহরে। এটি যেন পাহাড়ের কুলঘেঁষা বিকল্প সমুদ্রসৈকত।

রাজার পাহাড়ের চারপাশের নানা প্রজাতির গাছগাছালিও অপূর্ব সৌন্দর্যময়। সেখানকার বাসিন্দা নির্মল কোচ ও দেবেন্দ্র মারমা জানান, ১৯৮০ সালে রাজার পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করতেন পাগলা দারোগা। তিনি মারা গেলেও ছেলেমেয়েরা রয়ে গেছেন এখানেই। তারাই টিলার এক কোনায় গড়ে তুলেছেন কাঁঠাল, লিচু ও কলার বাগান।

চাঙ্খু শেখ, প্রমোদ বেরা, রমেশ হাগিতক, সঞ্চিতা মারমা ও ভূপেন চাকমা বলেন, সারা বছরই জেলার সদর, নকলা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীর স্থানীয় বাসিন্দা এবং পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার ভ্রমণপিপাসুরা রাজার পাহাড়ের নির্মল পরিবেশে বেড়াতে আসেন।

স্থানীয় উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আউয়াল ও শ্রীবরদী ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান প্রাঞ্জল এম সাংমা বলেন, এখানে রয়েছে আদিবাসী সংস্কৃতি, সংরক্ষণ ও চর্চাকেন্দ্র বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি, জাদুঘর, লাইব্রেরি, গবেষণা বিভাগ ও মিলনায়তন, আদিবাসীদের কারুকার্যময় গির্জা, মন্দির, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং অসংখ্য প্রাকৃতিক নিদর্শনের সমাহার। এগুলো থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো সম্পর্কে জানা যায় অনেক কিছুই।

তারা জানান, মিশনারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় হচ্ছে এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর পাহাড়ের পাশে রয়েছে বিডিআর ক্যাম্প, ফরেস্ট বিট অফিস, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস ও রাবারবাগান।

স্থানীয় ব্যবসায়ী হায়দার আল মাহমুদ বলেন, রাজার পাহাড়ের পাশেই লাউচাপড়া অবসরকেন্দ্র। রয়েছে বনফুল নামে আরেকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন পর্যটনকেন্দ্র। এখানে রাজার পাহাড় আর গারো পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর স্থানগুলো অবলোকনের রয়েছে অপূর্ব সুযোগ, যা মনে আলাদাভাবে স্থান করে নেবে ভ্রমণপিপাসুদের। এখানে যেকোনো যানবাহনে আসা যায়।

কিশোরগঞ্জের নিকলী থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক আসলামুল হক বলেন, ‘রাজার পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে এসে একই সঙ্গে আদিবাসীদের জীবনযাত্রার নানা দিকও জানতে পেরেছি।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :