মায়ের টাকা চুরি করে ব্যবসা শুরু অ্যান্ড্রু মাইকেলের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪৬

মায়ের ক্রেডিট কার্ড থেকে ৩০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩৩ লাখ টাকা) চুরি করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা অ্যান্ড্রু মাইকেল। তার মাত্র নয় বছরের মাথায় তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। যা এত বছর পরে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই প্রথম ব্যবসায় নেমেছিলেন মাইকেল।

সম্প্রতি বিবিসির সাপ্তাহিক দি বস সিরিজে তার উদ্যোক্তা জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন মাইকেল। সেখানেই একথা জানিয়েছেন তিনি।

অ্যান্ড্রু মাইকেলে বয়স যখন ১৭ বছর তখন তিনি নিজের জীবন বদলানোর জন্য একধরনের জুয়া খেলেন। ব্যবসার জন্য তার মায়ের ক্রেডিট কার্ড থেকে না জানিয়ে ৩০ হাজার পাউন্ড খরচ করেন। তিনি এটিকে চুরি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

১৯৯৭ সালে যখন পশ্চিম ইংল্যান্ডের শেলটেনহামে মায়ের সঙ্গে থাকতেন তখন তার সামনে ব্যবসার এই সুযোগ আসে। স্কুল সহপাঠীর সঙ্গে নিজের ওয়েবসাইট তৈরি করতে চাইলে স্বঘোষিত এই ‘কম্পিউটার বিজ্ঞানী’ অনুধাবন করেন যে বিদ্যমান কিছু ওয়েব হোস্টিং কোম্পানি সাধারণ লোকজন কিংবা ছোটখাটো ব্যবসাকে টার্গেট করছে না।

তিনি বলেন, ‘ব্রিটেনে সেই সময় প্রায় সব ওয়েব হোস্টিং কোম্পানি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে কাজ করছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রের ব্যক্তিরা সহজেই নিজেদের দ্বারা সহজে পরিচালনযোগ্য কিছু একটা চাইছিলেন।’

তখন বাজারের এই ফাঁকা জায়গাটি দখলের জন্য লক্ষ্য স্থির করলেন তিনি এবং তার বন্ধু। চালু করলেন নিজেদের প্রথম ওয়েব হোস্টিং কোম্পানি ‘ফাস্টহোস্টস’। বাড়িতে শোবার ঘরে সফটওয়্যারটি নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছিলেন। মাইকেল জানান, ‘যেটা আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল সেটা হচ্ছে দ্রুত গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ।  সেটি নিতে হলে রাস্তার নিচে খোঁড়াখুঁড়ির প্রয়োজন হত। এটা ছিল প্রায় ৩০ গ্র্যান্ড খরচ সাপেক্ষ কিন্তু সেসময় আমাদের কাছে কোন টাকাপয়সা ছিল না।’

কোনো উপায় না দেখে মায়ের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ইন্টারনেট আপগ্রেড করার অর্ডার দেন মাইকেল। এছাড়া ম্যাগাজিনে বিজ্ঞাপন বুকিং এবং নতুন বিশাল কম্পিউটার মডেমের ব্যবস্থা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, প্রথম মাসেই ব্যবসা থেকে যথেষ্ট পরিমাণ আয় করতে হবে যেন প্রথম মাসের ক্রেডিট কার্ডের বিল আসার পরই তা পরিশোধ করা যায়।

আশ্চর্যজনকভাবে তা সত্যিই কাজ করেছিল জানিয়ে মাইকেল বলেন, ‘মাসের শেষ নাগাদ আমাদের যথেষ্ট সংখ্যায় ক্লায়েন্ট জুটে গেল এবং ইন্টারনেট লাইন এবং বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধ এর টাকাও উঠে এলো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা চুরির অপরাধ মা ক্ষমা করে দিলেন।’

পরে তার বন্ধু উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলে মাইকেল তার উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা বাতিল করেন। তার বদলে ফাস্টহোস্টসকে প্রতিষ্ঠার জন্য পুরোপুরি মনোযোগ দিলেন।

নয়বছর পরে তার বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১ দশমিক ৫ মিলিয়ন। তার বয়স যখন মাত্র ২৬ বছর তার ব্যবসার ৭৫ শতাংশ শেয়ার ছিল নিজের। সেসময় তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৬ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৫০০ কোটি টাকা)।

দুই বছর পরে ‘লাইভ ড্রাইভ’ নামে একটি ক্লাউড স্টোরেজ ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন মাইকেল। সেটি পরবর্তীতে বিক্রি করে দিলেও অর্থের পরিমাণ জানাননি তিনি। ধারণা করা হয় এই বিক্রির অর্থ দশ মিলিয়নের কম নয়।

দুটি সফল ব্যবসার পর ব্যয়বহুল পার্টির কারণে শিরোনামে আসেন মাইকেল। বড়দিন এবং প্রেমিকার জন্মদিন উপলক্ষে ব্যয়বহুল পার্টির আয়োজন করেন তিনি। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পার্টি পছন্দ করি। লোকজনকে আনন্দে মাতিয়ে রাখতে ভালবাসি এবং আমি কখনো কোনকিছু আধাআধি করি না।’

সাইপ্রাসে জন্ম নিলেও মাইকেল বেড়ে উঠেছেন শেলেটনহামে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, তার ব্যবসায়িক চিন্তাধারা এবং একনিষ্ঠ মনোযোগ পুরোটাই তিনি পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে। বাবার সম্পর্কে মাইকেল বলেন, ‘আমার বাবা সাইপ্রাস থেকে এসেছিলেন এবং খুব ছোট ব্যবসা ব্যবসায়ী ছিলেন। অনেক সাইপ্রিয়টের মতো তিনি মাছের দোকান এবং ক্যাফে খুলেছিলেন। তাই আমার শৈশবের অনেকটা সময় এসব জায়গা দেখে দেখে ব্যবসার জিনিসপত্র সংগ্রহ এবং ব্যবসা বিষয়ে আলোচনার মধ্যে কেটেছে। খুব কম বয়স থেকেই আমার ট্রেডিং, অর্থ উপার্জনের মানসিকতা ছিল।’

ফাস্টহোস্টস কিভাবে আরও বিস্তৃতি লাভ করল সে সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে মাইকেল বলেন, তিনি ছিলেন লেজার ফোকাসড এবং সেটা ছাড়া আর কিছুই মুখ্য ছিলনা।

২০০৬ সালে যখন ব্যবসা তাকে বড় ধরনের ধনী বানায় তখনও তার মধ্যে অপরিপূর্ণতার অনুভূতি ছিল। তিনি জানান, ‘মনে আছে যখন আমার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকত আমি ভাবতাম বিষয়টি আমাকে সত্যি সুখী করবে। কিন্তু যখন অফিসে হাঁটতাম আমার আসলে ডুবে যাওয়ার মত একধরনের অনুভূতি হত এবং উপলব্ধি হত যে, এসবই আমি বিক্রি করে দেব, সবকিছু একটি স্প্রেডশিটে এবং সংখ্যায় চলে আসবে।’

এরই ফলশ্রুতিতে মাইকেল স্বীকার করেন কিছু সময়ের জন্য সব একঘেয়ে হয়ে যায় এবং নিয়মিত মদ্যপ হয়ে যান। ব্যবসা ফিরে পেতে তিনি দুই বছর পর লাইভ ড্রাইভ চালু করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে কোম্পানিটিকে বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় সংগ্রাম করতে হয়। একই সময়ে অনেক লোক একই রকমের আইডিয়া নিয়ে কাজ করেছে ফলে সেই বিজ্ঞাপন চলেনি। এটা ছিল তার প্রথম ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা।

এটিই শেষ হতে পারত তবে এক রাতে ডিক্সনস এর একজন ইলেকট্রনিক্স রিটেইলাইরের সঙ্গে যোগাযোগ হয় মাইকেলের। লাইভড্রাইভের পণ্য আরো উন্নত করার  ক্ষেত্রে সহায়তা করল ডিক্সনস। এরপর ল্যাপটপ এবং ট্যাবলেটের সঙ্গে তা বান্ডেল করে বাজারজাত করা হলো। এটা ছিল ব্যাপক সফলতা। পরবর্তীতে ফাস্টহোস্টস এর চেয়েও বড় ব্যবসায় পরিণত হয় লাইভ ড্রাইভ।

তার সর্বশেষ ব্যবসা হচ্ছে বার্ক ডটকম। এটা এমন একটি ওয়েবসাইট যেখানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পেশাদার পরিষেবা দানকারীকে পাওয়া যাবে যেমন স্যানিটারি মিস্ত্রি থেকে শুরু করে গিটার শিক্ষক, ঘোড়া পালনকারী, কিংবা ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক ক্রিস গ্রিন বলেন, ‘ফাস্টহোস্টস ছিল আশি এবং নব্বই এর দশকে যুক্তরাজ্যে বেডরুম কম্পিউটার উদ্ভাবনের চমৎকার উদাহরণ। ১৭ বছর বয়সী তরুণ মাইকেলের জন্য সেটি কেবল তাৎক্ষনিক সাফল্য নয় এটি ডোমেন নাম নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং অনেকের জন্য ওয়েব হোস্টিং অ্যাক্সেস প্রক্রিয়া সহজতর করেছে।’

এখনো নিজের প্রচুর উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে জানিয়ে মাইকেল বলেন, ‘আমি সেই ধরনের ব্যক্তিদের একজন যার যত বেশি আছে, তত বেশি চাই। যদিও আমার প্রথম দুটি ব্যবসা ভাল ছিল তারপরও আমি নিজেকে দুর্দান্ত সফল শ্রেণীর মধ্যে রাখব না।’

ঢাকা টাইমস/১২ফেব্রুয়ারি/একে

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :