জামায়াত ছাড়ার বিষয়ে লাইভে যা বললেন রাজ্জাক

ঢাকা টাইমস ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:২২

বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা ও গঠনগত ভাবে বড় সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে পদত্যাগ করেছেন দলটির শীর্ষ নেতা ব্যরিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। পদত্যাগের পর জামায়াত ও ব্যক্তিগত বিষয়ে বিবিসি বাংলার ফেসবুক লাইভে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি।

বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ এবং যুবসমাজকে ধর্ম নিরপেক্ষ সংবিধানের অধীনে দেশের অবদান রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক।

জামায়াতের বর্তমান এই চরম সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যে কেন দলত্যগের সিদ্ধান্ত নিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজ্জাক বলেন, আমি দীর্ঘ তিরিশ বছর জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। দলটির আইন ও কূটনৈতিক বিষয়ে কাজ করেছি। ১৯৯২ সালে গোলাম আজমের নাগরিকত্ব মামলায় আমি জুনিয়র আইনজীবী ছিলাম। এছাড়া সাইদী, নিজামী ও মুজাহিদের মামলাও লড়েছি।

২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জামায়াতের শীর্ষ দশ নেতার মামলার প্রধান কৌশুলি হিসেবে কাজ করেছি। সুতরাং আমার যে কাজ ছিল জামায়াতকে আইনগত ও কূটনৈতিক সহযোগীতা করা তা আমি সততার সঙ্গে করেছি। জামায়াতের যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে ছিল দলটিকে সংস্কার করা। কিন্তু আমি তাতে ব্যর্থ হয়েছি। 

আরেকটা উদ্দ্যেশ্য ছিল, আজকে জামায়াত কেন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন? কেন গ্লানি বহন করতে হচ্ছে। একাত্তর সালে যে শিশু জন্মগ্রহণ করেছে সে তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেওনি। কিন্তু জামায়াত করার কারণে তাকেও এই দায়ভার বহন করতে হচ্ছে। রাজ্জাক বলেন, আমি আমার পদত্যাগ পত্রে প্রতিটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছি। ২০০১ সাল থেকে নিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আমি কি করেছি তার সবই উল্লেখ রয়েছে। সেখানে আমি জামায়াতকে যেন একাত্তরের বোঝা বহন করতে না হয় সেজন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু যখন আমি দেখলাম যে আমার আর কিছু করার নেই, জামায়াতকে আমার দেয়ার মতো কিছু নেই, তখন পদত্যাগ করেছি।

একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকায় জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এই কথাটি জামায়াতের অন্য নেতারা কেন বুঝছেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি তাদেরকে বোঝানোর। ইতিহাস থেকে উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, স্বাধিনতার বিরোধীতা করে কোনো দেশে কোনো দল সেদেশের নেতৃত্ব দিতে পারেনি। তবে এসময় দলের নেতাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। কিছু লোক একথার পক্ষে ছিলেন কিছু বিপক্ষে।

তিনি বলেন, জামায়াতে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বেশিরভাগ লোকের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের কারণেই জামায়াতে ইসলামী জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি।

রাজ্জাক বলেন, আমি বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত বিপক্ষে গেলেও এটা আমাদের করা উচিত। কেননা আমরা নেতৃত্বে রয়েছি। আমি নেলসন মেন্ডেলার উদাহরণ দিয়েছি যে সংখ্যাগরিষ্ঠরা শেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইলেও তিনি চুক্তি করেছিলেন। জামায়াতের কিছু নেতা আমার কথা বুঝলেও তারা এটা করতে অপারগ হয়েছেন এবং এটি তাদের ব্যর্থতা।

জামায়াতের বর্তমান অবস্থা ও দল বিলুপ্তির বিষয় সম্পর্কে রাজ্জাক বলেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে একাত্তরের একটি কালিমা রয়েছে। এছাড়া ২০১১ সাল থেকে দলের কার্যক্রম প্রকাশ্যভাবে সব বন্ধ। বাংলাদেশের ৬৫টি অফিসের সবগুলোই বন্ধ।

তিনি বলেন, সব অফিস বন্ধ, জামায়াতের নিবন্ধন নেই, নির্বাচনের প্রতিক নেই, তারা কোনো মিছিল করতে পারে না, মিটিং করতে পারে না। যেহেতু এর কোনোটিই জামায়াত করতে পারছে না, সেহেতু জামায়াতের নতুন করে ভাবা উচিত।

কোনো চাপের কারণে জামায়াত ছেড়েছেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা অস্বীকার করেন। তার ওপর কোনো চাপ নেই বলেও জানান তিনি। এছাড়া ১৯৯১ সালে জামায়াত সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেসময়ও আমি জামায়াতকে দেশের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিয়ষটি উত্থাপন করেছিলাম।

যদি আপনার পক্ষে জামায়াতের বেশিরভাগ নেতা থাকতেন, তাহলে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়ে আপিন কি বলতেন? বা জামায়াতের এ বিষয়ে কি বলা উচিত? এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি পরিষ্কার বলতাম যে, আমরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছি। এটা আমাদের একটা রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এজন্য আমরা জাতির কাছে নি:শর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। কোনো অজুহাত না দিয়ে আমাদের এটাই বলা উচিত।

ক্ষমা চাওয়ার অর্থ হলো আপনি জামায়াতের দলীয় মতামতকে উড়িয়ে দিচ্ছেন। দলের এই মতামতের বিপক্ষের লোকেরা কিভাবে নেবে? এটি জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, ১৯৪০ সালের জামায়াত, ১৯৪৭ সালের জামায়াত, ১৯৭১ সালের জামায়াত এবং একবিংশ শতাব্দির জামায়াত এক হতে পারে না। অবশ্যই কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। যেমনটি তুরস্ক ও তিউনিশিয়ায় দেখা গেছে।

তুরস্ক ও তিউনিশিয়ার ইসলামপন্থি দলগুলো তো সেদেশের স্বাধিনতার বিরোধী ছিলো না, তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ ছিল না- এ বিষয়ে রাজ্জাক বলেন, তাদের বিরুদ্ধে ছিলো না কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের অতিতে যদি কোনো ভুল থাকে তার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে কোনো সংকোচ থাকা উচিত নয়।

ফেসবুকে একজন রাজ্জাকের কাছে জানতে চান যে, তিনি অন্য কোনো দলে যোগদান করবেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি আমার পেশায় ফিরে যাব এবং একজন নাগরিক হিসেবে দেশের উন্নয়নে যে অবদান রাখার তা রাখব। এটি করার জন্য কোনো দলে যোগদান করবেন কি না- জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, দেশের উন্নতিতে অবদান রাখতে গেলে কোনো দলে যোগদান করা জরুরী নয়।

কোনো দলের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে কি না? এ বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো দলের সঙ্গে কথা হয়নি। কিন্তু দেশ এবং জাতির জন্য আমার কিছু করার আছে।

আর কারও জামায়াত ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজ্জাক বলেন, এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবেই পদত্যাগ করেছি। কোনো নতুন দল গঠন করবেন না বলেও জানান রাজ্জাক।

জামায়াতকে বিলুপ্ত করা হলে যারা দলটির সমর্থক তারা কি করবে? এমনটি জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, ইসলামী রাষ্ট্রের যে ধারণা ছিল সেসম্পর্কে যুবসমাজকে একটু চিন্তাভাবনা করা উচিত। পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মুসলমি বিশ্বে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষ সংবিধানের অধিনে কিভাবে দেশের উন্নতি করা যায় যুবসমাজকে সেবিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে।

ধর্ম নিরপেক্ষ সংবিধানের থাকা অবস্থায় ইসলামি রাজনীতি করা সম্ভব কি না জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, অবশ্যই সম্ভব। কারণ ইসলামী রাজনীতির মূল কথাটা হলো জনগণের কথা। জনগণের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ সংবিধান কোনো বাধা নয়।

জামায়াত না থাকায় এর সঙ্গে থাকা দলগুলো সংকটে পড়বে কি না এ বিষয়ে রাজ্জাক বলেন, তারা সংকটে পড়বে কি না তা জানি না। তবে জামায়াতকে বিলুপ্ত করার সময় এসেছে। এটি দেশের জন্য কল্যাণকর, জামায়াতের জন্য কল্যাণকর এবং জাতির জন্য কল্যাণকর।

একজন সিনিয়র নেতা হিসেবে জামায়াত থেকে আপনার পদত্যাগ দলের ভেতরে কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে- জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, জামায়াত ইসলামীতে অনেক যুবক আছে, মহিলারাও আছে। তারা দেশ সম্পর্কে, জাতি সম্পর্কে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সবকিছুই জানে। তাদের প্রতি আমার বিশ্বাস যে তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং তাদের এই মেধাটাকে দেশের জন্য কাজে লাগাতে পারবে।

পদত্যাগের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান ব্যারিস্টার রাজ্জাক। একজন প্রশ্ন করেন যে, জামায়াত যদি ভুল স্বীকার করে তবে কি আপনি আবার জামায়াতের নেতৃত্বে ফিরে যাবেন? এর উত্তরে রাজ্জাক বলেন, আমি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেছি, এটি অত্যন্ত চিন্তাভাবনা করেই করেছি। এটি আমার জন্য প্রচণ্ড কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। আমি পেছনে ফিরে যাব না, সামনে এগোতে চাই।

জামায়াতের যেসব নেতারা আপনার সঙ্গে একমত হতে পারেননি তাদের জন্য কি বলার আছে- এমনটি জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, যারা যুবসমাজ আছে তাদের দেশ এবং জাতির জন্য অনেক কিছু করার আছে। সেখানে মেধাবি লোক অআছে, সত্ লোক অআছে, যোগ্য লোক আছে। জামায়াতের অর্জন হচ্ছে তারা যথেষ্ট সত্ ও যোগ্য লোক তৈরি করতে পেরেছে। তারা কিভাবে দেশ ও জাতির খেদমত করতে সেটা তাদের চিন্তাভাবনা করা উচিত। তাদের নিয়ে অআমি আশাবাদি।

জামায়াতের জনপ্রিয়তা অনেক কম, এক্ষেত্রে আপনি নতুন দল নিয়ে আসলে কিভাবে জনগণকে আকৃষ্ট করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজ্জাক বলেন, এখনই আমার নতুন দল নিয়ে আসার কোনো প্রশ্ন নেই। তবে আমি ২০ বছরে জামায়াতকে যে পরামর্শ দিয়েছি তা বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হত।

জামায়াতকে পুনরায় ফিরে আসতে গেলে একাত্তরের জন্য ক্ষমা চাওয়া ও দলের সংস্কার করতে হবে। দলের সংস্কার বিষয়ে রাজ্জাক বলেন, দলে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

ধর্মে নারী নেতৃত্ব হারাম তাহলে নারীদের কিভাবে জামায়াত দলের শীর্ষ পর্যায়ে অআনবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতা নারী নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে মন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন। এছাড়া মজলিসে সুরাতে নারী সদস্য রয়েছে। অর্থ্যাত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। সেটিকে আরও কার্যকর করতে হবে। এই পরিবর্তনের চিন্তা ইসলামী দলগুলোকে করতে হবে।

জামায়াতের এ সংস্কার তৃণমূল কর্মীরা কতটা চান? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজ্জাক বলেন, তাদের সংখ্যা শতাংশের হিসেবে আমি দিতে পারব না। তবে অনেক যুবক রয়েছেন যারা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়। এরকম লোকের সংখ্যা জামায়াতে অসংখ্য।

সবশেষে তিনি বলেন, যদি জামায়াত জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাহলে দেশ ও রাজনীতিতে দলটি অনেক মূল্যবান অবদান রাখতে পারবে।

তিনি জামায়াতে ফিরবেন না, অন্য কোনো দলেও যোগ দিবেন না। এছাড়া আপাতত দেশেও ফিরবেন না- তাহলে কিভাবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবেন? এ বিষয়ে রাজ্জাক বলেন, দেশের জন্য অবদান রাখার আরও অনেক দিক রয়েছে সেই দিকগুলো থেকেই তিনি দেশের জন্য অবদান রাখবেন।

ঢাকা টাইমস/১৬ফেব্রুয়ারি/একে

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :