বিএনপি-জামায়াত গাঁটছড়া অবসানের পথে?

বাছির জামাল
| আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৪০ | প্রকাশিত : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:১৭

এতদিন শোনা যেত, জামায়াতকে ছাড়তে চাপে রয়েছে বিএনপি। এ চাপ যেমন ভেতর থেকে তেমনি বাইরে থেকেও ছিল বলে দলটির নেতা-কর্মীরা বলে বেড়াত। এখন খবর বেরিয়েছে, এবার জামায়াতই বিএনপিকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে না। তবে ২০ দলীয় জোটের কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে দলটি। সম্প্রতি জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মপরিষদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার। তবে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা এ ব্যাপারে কিছুই বলছেন না। তারা বলতে চান, ‘জামায়াত অনেক সিদ্ধান্তই নেয়, এর মধ্যে যা জানানো দরকার, তা আমরা জানিয়ে দেই। আর কিছু বিষয় কৌশলগত কারণে গোপন রাখতে হয়। তবে জোট ছাড়লে, তা গোপন রাখা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

তবে এটা সত্য, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ার পর থেকে জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোট বিএনপির রাজনীতিতে অনেকটা সাইড লাইনে পড়ে গেছে। আবার জামায়াত মনে করছে, বিএনপির সঙ্গে থাকায় তাদের ওপর সরকারের নির্যাতন বেড়েছে। বিগত ১০ বছর ধরে তারা প্রত্যক্ষ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নিতে পারছে না। এতে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শুধু ঐক্য ধরে রাখার স্বার্থে এসব কিছু মেনে আসছিল। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর বিশেষ করে নির্বাচনে জামায়াতের চাহিদা মতো সংসদীয় আসন দেওয়া হয়নি। যতটুকু আসন দেওয়া হয়েছে, তাতে ধানের শীষের প্রতীক দিতেও গড়িমসি করেছে বিএনপি। এতে জামায়াত মনে করে, সময় এসেছে এখন বিএনপির সঙ্গে না থাকার। এতে বিএনপিও বাঁচবে, আবার জামায়াতও বেঁচে যাবে।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির মিত্রতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু থেকেই সমালোচনা আছে। বিশেষ করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতাদের বিচার এবং ফাঁসির পর সারা দেশে দলটির নেতা-কর্মীদের সহিংসতা দেশ-বিদেশে সমালোচিত হয়। তখন থেকে বিভিন্ন মহল থেকে বিএনপির ওপর চাপ বাড়ে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে জামায়াতের বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে রেখেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় বিএনপিকে আক্রমণ করে প্রায়ই বক্তৃতা দেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার জোটের শরিক দলের নেতারা। যদিও খালেদা জিয়ার প্রথম সরকার আমলে (১৯৯১-৯৬) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল।

১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়তে গিয়ে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট গঠন হয়। একসঙ্গে আন্দোলনের পর এই জোট ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পায় এবং সরকার গঠন করে। শুরুর দিকে চারদলীয় জোটের শরিক ছিল এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামী। একপর্যায়ে এরশাদ চার দল ছেড়ে যায়। তবে পার্টির নেতা নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে দলটির একটি অংশ (যা পরে বিজেপি হয়) চার দলে থেকে যায়। এই চারদলীয় জোট সময়ের পরিক্রমায় ২০ দলীয় জোটে রূপান্তরিত হয়।

অন্যদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা এবং দলের শুভাকাক্সক্ষী ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ অনেক দিন ধরে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। জামায়াতের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকের বিরূপ ধারণা আছে। কিন্তু ভোটের মাঠের নানা হিসাব-নিকাশে জামায়াতকে ছাড়েনি বিএনপি। এখন জামায়াতই বিএনপিকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন জামায়াত যদি জোট ছেড়ে যায়, বিএনপি তাদের ফেরানোর চেষ্টা করবে না। এ কারণে ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে জামায়াতকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে জামায়াতের নীতি-নির্ধারকরা মনঃক্ষুণ্ন হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগের রাতে বিএনপির কার্যালয়ে গিয়ে চিঠি ফেরত দেন। পরে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতার হস্তক্ষেপে গভীর রাতে বিষয়টি মিটমাট হয়।

জামায়াতে ইসলামী সঙ্গ ছেড়ে দিলে কতটুকু ক্ষতি হবে বিএনপির? এমন প্রশ্নে অবশ্য দুই মতই প্রবল রয়েছে বিএনপির মধ্যে। একটি অংশ মনে করে, ‘জামায়াত না থাকলে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বরং ভালোই হবে।’ অন্য অংশ মনে করে, ‘দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ চাচ্ছিল, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের বিচ্ছিন্নতা। এখন তা হচ্ছে। হলে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে এতে লাভবান হবে ক্ষমতাসীন দল।’ একাদশ নির্বাচনের আগে ভারতীয় এক পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে তাদের আদর্শগত কোনো ঐক্য নেই। আছে কেবল আন্দোলনের ঐক্য। জামায়াত থাকলে নির্বাচনের সময় তারা অন্তত ৫০টি আসনে সুবিধা পেয়ে থাকে।’

জামায়াত যদি সত্যি সত্যি বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করে, তা হলে তাদের কোনো ক্ষতি হয় কি না, সহজেই তা জানা যাবে।

বাছির জামাল: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :