স্কুলেও মাতৃভাষায় পড়তে চায় গারো শিশুরা

রেজাউল করিম, টাঙ্গাইল
 | প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:০৯

টাঙ্গাইলের মধুপুরে গারো জনগোষ্ঠীর বসবাস। এক সময়কালের প্রকৃতিপূজারী গারোরা এখন ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। ধর্ম বদল হলেও মাতৃভাষা আচিক আঁকড়ে ধরে আছে গারোরা। কিন্তু এ জনগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পায় না। তারা চায় অন্তত পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করুক।

মধুপুর উপজেলার ভূটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে লামিসা রিছিল, সেংবিয়া রিছিল, মেলডি চিরান, কচিল সিমসাং, জোতি রং, ঈশান রিছিল। ওরা সবাই সমবয়সী। কেউ তৃতীয়, কেউ চতুর্থ, আবার কেউ পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলটিতে লামিসাদের মতো শতকরা ত্রিশ শতাংশ শিশুই গারো জনগোষ্ঠীর।

তাদের পড়াতে সরকার স্কুলটিতে তিনজন গারো শিক্ষকের কোটাও রেখেছেন। মার্জিনা চিসিমের মতো গারো শিক্ষিকাদের সাথে আদিবাসী শিশুদের অন্যরকম মিতালি। স্কুলে ভর্তি বা শিক্ষক উভয় সুবিধা পাচ্ছে এসব শিশুরা। তবে নেই ওদের মায়ের ভাষায় পাঠ্য। পরিবারের সাথে মন খুলে ওরা কথা বলে অচিক ভাষায়। কিন্তু স্কুলে এসে পড়তে হয় বাংলায়। যদিও শিশুরা সরকারিভাবে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত আচিক ভাষায় পাঠ্য পেয়েছে। তবে তারা মাতৃভাষার চর্চার জন্য নুন্যতম পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্য চায় অচিক ভাষায়।

একটা সময় ছিল যখন এ অঞ্চলের গারোরা আচিক ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানতো। কিন্তু জীবন জীবিকার তাগিদে বনের গারোরা এসেছে তাদের আশেপাশে বাঙালি প্রধান এলাকায়। এভাবে একসময় নিজ এলাকাতেই আদিবাসী গারোরা পরিণত হয়েছে ‘সংখ্যালঘু উপজাতিতে’। গারো শিক্ষার্থীদের স্কুলে লেখাপড়া ও কর্মজীবনে অফিস আদালতসহ সকল কাজ কর্মেই তাদের বাংলা ব্যবহার করতে হয়। ফলে তাদের মাতৃভাষার চর্চা কমে যাচ্ছে।

গারোরা বলছে, মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্রমেই ‘আচিক ভাষা’ হারিয়ে যাচ্ছে। গারোদের মাতৃভাষা ‘আচিক’ রক্ষার জন্য সরকারি-বেসরকারি কোনও পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এ অবস্থা হচ্ছে বলে তাদের দাবি।

এ ভাষা রক্ষার জন্য গারো শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সোয়া লাখ গারো আদিবাসীর মধ্যে প্রায় ২০ হাজারের বসবাস মধুপুর গড় অঞ্চলে।

সম্প্রতি মধুপুর গড়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, স্কুল পড়ুয়া শিশুরা অধিকাংশই তাদের মাতৃভাষা ভালোভাবে জানে না। কেউ কেউ নিজ বাড়িতে বাবা মায়ের মুখে শুনে এ ভাষা সর্ম্পকে কিছুটা বুঝতে শিখলেও তারা আচিক ভাষায় উত্তর দিতে পারে না।

ভূটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মার্জিনা চিসিম বলেন, ‘মাতৃভাষা ধরে রাখার জন্য আমরা নিজেরা বাড়িতে সব সময় আচিক ভাষায় কথা বলি। কিন্তু তবুও আমাদের ভাষা রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাংলার সাথে মিশে যাচ্ছে। নিজ বাড়ি ছাড়া কোথাও আমরা আমাদের মাতৃভাষা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছি না। ফলে এ প্রজম্ম এ ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।’ এ শিক্ষিকার সঙ্গে সহমত জানালেন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা পিয়ারা বেগমও।

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক জানান, তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ২০০৮ সালে গড় এলাকায় ১২টি স্কুল চালু করা হয়েছিল। যেখানে গারো শিশুদের আচিক ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হতো। কিন্তু তিনবছর চলার পর দাতা সংস্থার অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়।

২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষা নীতিমালায় শিশুদের তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। গারো শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান ইউজিন নকরেক।

(ঢাকাটাইমস/২২ফেব্রুয়ারি/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :