লোভের কাছে আর নিমতলী-চুড়িহাট্টা সঁপা নয়

মোরশেদুল জাহির
| আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২৩:১৮ | প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩৩

২০১০ সালে নিমতলীতে ১২৪ প্রাণহানির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি পুরান ঢাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নেয়াসহ আরও কিছু সুপারিশ করেছিল। সরু গলিঘুপচির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে যেতে না পারায় আগুনের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়- এটিও তাদের তদন্তে উঠে আসে। সেখানকার মানুষের জীবন নিরাপদ করার জন্য জরাজীর্ণ পুরান ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

কিন্তু এত দিনেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। ১০ বছর আগের মতোই বিপজ্জনক প্লাস্টিক থেকে শুরু করে উচ্চদাহ্যের রাসায়নিক কারখানা আর গুদামে ঠাসা পুরান ঢাকা। ফলে আর একটি নিমতলী ট্র্যাজেডি প্রত্যক্ষ করতে হলো আমাদের। পুরান ঢাকারই চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুন কেড়ে নিল ৮১ জনের প্রাণ। সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট লোকজনের হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৭৮, আর শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে ৬৭ জন। সংখ্যা যা-ই হোক, এর কোনোটিতেই চুড়িহাট্টার ভয়াবহতা এতটুকু কমে না।

এখন নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে নিমতলীকাণ্ডের পর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন নিয়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনেকে অজুহাত দেখান, তারা কাজ করতে গিয়ে পুরান ঢাকাবাসীর সহযোগিতা পান না। ঢাকাইয়ারা ঐতিহ্য রক্ষায় মরিয়া। তারা সেটা করতেই পারে। তাতে কর্তৃপক্ষের থেমে যাওয়াও কোনো কাজের কথা না। তাদের উচিত ঢাকাবাসীর ঐতিহ্য রক্ষা করে, তাদের অংশী করে কীভাবে সেখানকার মানুষের জীবন নিরাপদ করা যায়, সেই পথ খোঁজা। কিন্তু সেটা হয়নি। আমরা বরং দেখছি, সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর একটা অজুহাত দরকার ছিল, সেটা পেয়ে তারা দায়িত্ব থেকে যেন বেঁচে গেছে। তা না হলে ১০ বছর পর কেন এমন অজুহাত শুনতে হবে আমাদের!

চুড়িহাট্টার ট্র্যাজেডির ঘটনায়ও গা-বাঁচানো কথা থেমে নেই। স্বয়ং শিল্পমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলে দিলেন রাসায়নিকের কারণে নয়, আগুন লেগেছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। সেখানে কোনো রাসায়নিকের গুদাম নেই। এই সিদ্ধান্ত তো তার দেওয়ার কথা না। তদন্ত শেষে এটি বলবে তদন্ত কমিটি কিংবা ফায়ার সার্ভিসের লোকজন।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আগুনের সূত্রপাতের ব্যাপারে যে কয়টি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেছেন, তার মধ্যে রাসায়নিকের কথাও আছে। তাদের ভাষ্য, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে যদি আগুন লেগেও থাকে, সেখানকার ভবনগুলোতে রাসায়নিকের মজুদের কারণে তা ছড়িয়েছে দ্রুত। তাই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে তাদের।

মেয়র সাঈদ খোকনও রাসায়নিকের কথা অস্বীকার করেননি। দু-তিন আগে তিনি পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দিয়ে এসেছেন রাসায়নিক দ্রব্য বেচাকেনা ও সংরক্ষণে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য। তার দুই দিন বাদে ঘটল চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিদুর্যোগ। এর দায় কিছুটা নিজের ওপর নিয়েছেন মেয়র। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই আমরা। দায় নেওয়ার মানসিকতা থেকে বাড়তে পারে সমস্যা সমাধানের স্পৃহা।

কিন্তু শিল্পমন্ত্রী তদন্তের আগেই যে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন, আমরা দেখছি, তার পরদিন সকালে বিপুল রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ আবিষ্কার হলো চুড়িহাট্টার আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ওয়াহেদ ম্যানশনের বেজমেন্টে। ভাগ্য ভালো, সেখানে আগুন পৌঁছায়নি। তা হলে আরও বীভৎসতা প্রত্যক্ষ করতে হতো আমাদের। জানি না মন্ত্রী কেন বাস্তব অবস্থা এড়িয়ে গেলেন। এখন তার সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা।  

উটপাখির মতো মাটিতে মুখ লুকালে তো আর প্রলয় বন্ধ হবে না। উচ্চদাহ্য পদার্থ আর রাসায়নিকের কারণে আগুনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে পুরান ঢাকায়। প্রাণহানিও হয় তাতে। সেটি সেখানে অনেকটা গা সহা হয়ে গেছে। নিমতলী আর চুড়িহাট্টার মতো ঘটনাগুলো কেবল আলোড়ন তুলে দেশে, প্রশাসনে আর মিডিয়ায়। কিছুদিন হইচইয়ের পর আবার সবকিছু থিতিয়ে যায়। পুরান ঢাকার জীবনের নিয়মে সঁপে দিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে ।

ঢাকার ঐতিহাসিক এলাকা পুরান ঢাকার নানা সমস্যা থাকলেও প্রকৃত অর্থে অতিসরু গলিঘুপচি আর পলিথিন ও রাসায়নিক পদার্থের কারখানা-গুদামকেই সেখানকার জীবনের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বেশি হুমকি হিসেবে দেখা হয়। আসলে পুরো পুরান ঢাকাই একটা জ্বলন্ত লাভা ভর্তি আগ্নেয়গিরি। এর সঙ্গে আছে শতবর্ষী জরাজীর্ণ ভবন। মাঝারি আকারের ভূমিকম্পে কী ভয়াবহ বিপরর‌্যয় নেমে আসতে পারে এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, সেই আশঙ্কা করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা কতটা বাস্তবানুগ, নিমতলী আর চুড়িহাট্টা দেখিয়ে দিল আমাদের। আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না।

এত দিন আমাদের কর্তৃপক্ষগুলো যে উদ্যোগই নিয়ে থাকুক, কিংবা যতটুকু এগিয়ে থাকুক-না থাকুক, আমরা আশা করি এখন তারা নতুন করে উদ্যোগী হবে। নিমতলীর ঘটনায় তদন্ত কমিটির সুপারিশ তাদের কাছে আছে। তা নিয়ে এখনই মাঠে নামুক। আগে যেখানে বাধা পেয়েছে, সেখান থেকে নতুন করে শুরু হোক। নিমতলীকাণ্ডের পর কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক পল্লি করা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ বলছে, সেখানে যেতে রাজি হননি ব্যবসায়ীরা। এখন তাদের বাধ্য করা হোক যেতে। লোভের কাছে আর কোনো নিমতলী-চুড়িহাট্টা ঘটতে দেওয়া যাবে না কোনোভাবেই।

চুড়িহাট্টার ঘটনায় সরকারি যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, আশা করি তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে সুপর‌্যবেক্ষিত প্রতিবেদন দেবে। নিমতলি ও চুড়িহাট্টার প্রতিবেদনের সঙ্গে নেওয়া হোক পুরান ঢাকা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা। তারপর পুরান ঢাকা সংস্কারে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আমরা আশা করি।

আর একটা কথা, চুরিহাট্টার ঘটনার সূত্রপাত ধরা হচ্ছে গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। তার বিস্তারের কারণ আশপাশে বিপুল রাসায়নিক ও উচ্চদাহ্য পদার্থের মজুদ। জানা যাচ্ছে, দেশে অন্তত তিন লাখ সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের পর সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার নিয়ম থাকলেও তা করছেন না অধিকাংশ গাড়ির মালিক। সংখ্যাটা দুই লাখের বেশি। যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ এসব সিলিন্ডার। ঘটছেও মাঝে মাঝে। সামান্য কটা টাকা আর সময় বাঁচাতে বোমায় চড়ছেন গাড়ির মালিকরা; চড়াচ্ছেন যাত্রীদের। অবৈধ রাসায়নিক মজুদ ও আর গাড়ির সিলিন্ডার দুটি বিষয়েরই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বিস্ফোরক পরিদপ্তর।  তারা চাইলেই টোপে টোপে মাছ ধরতে পারে।  

লেখক: সাংবাদিক।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :