বুক রিভিউ

শেখ হাসিনা যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়: মোহসেন আল আরিশি

ঢাকা টাইমস ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৪:১১

সমাজে অনেক বেশি চিল্লাচিল্লি থাকলেও বাংলাদেশের অভ্যুদয় কেন্দ্রিক ভালো একখানা আদ্যোপান্ত উপন্যাস পড়ে মনকে প্রশমিত করার মতো কোন উপন্যাস এতদিন সত্যি বলতে কি ছিল না। বইটি পড়তে পড়তে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ শুকিয়ে গেল, বইটি পুরাতন হয়ে গেল কিন্তু অনুভূতি দিয়ে গেল খুনের তৃষ্ণা মিটে যাওয়ার মতো। যারা দীর্ঘদিন ইতিহাস বিকৃত করে বোবা-কালা প্রজনন-ক্ষম প্রজন্ম ছেড়ে দিয়েছে সমাজে রাস্তা ঘাটে অফিসে তারা নিজের মধ্যে নিজে মানুষ হিসেবে বাস করে না।

এই জনপদের সত্য ইতিহাস, সাহিত্যের সংমিশ্রণে উপন্যাস তৈরির ঈশ্বরের পর্যাপ্ত ইচ্ছা থাকলেও শয়তানদের ছিল না, শয়তানের এজেন্টদের ছিল না। তবুও জনপদের মানুষদের অন্ধকার থেকে বের করে আনার জন্য ঈশ্বরের ইচ্ছা কি অপূর্ণ থাকতে পারে?

বিশেষত সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তো অদ্যাবধি ধারণা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা ওই সময়ে বাঙ্গালীদের সঙ্গে ঠিক কাজই করেছিল, কেননা এই বই প্রকাশ হওয়ার আগে পর্যন্ত তারা পরিষ্কার জানতো না কীভাবে গ্রামের পর গ্রাম ধর্ষণ হয়েছে, কীভাবে শহরের পর শহর শুনশান মৃতের নগরীতে পরিণত হয়েছে, কীভাবে রোজার মাসে খান সেনারা ভারী ইফতার করত শুধু রাতভর ধর্ষণের নেশায় আর সরীসৃপ প্রাণীদের মতো আবার লুকিয়ে পড়ত, মসজিদে নামাজরত মানুষদের রোজার মাসে খুন করেছে নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায়। হত্যার বর্ণনা দীঘির গভীর পর্যন্ত ছুঁয়ে গিয়েছে সকাল থেকে রাতে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভালো মানুষিপনার মুখোশ উন্মোচন করার জন্য ও তাদের ইতিহাস বিকৃত করা এজেন্টদের চপেটাঘাত মারার জন্য আরবি ভাষায় লেখা ও পরে বাংলা একাডেমী কর্তৃক বাংলায় অনূদিত উপন্যাসটি ছিল সময়ের দাবী।

২৩ বছর ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন এই বাংলাদেশ। এই ২৩ বছর ৯ মাসে বাংলাদেশের চিন্তায় অঙ্কুরোদগম থেকে ৯ মাসের সম্মুখ যুদ্ধে বিজয় অর্জন তারপর বর্তমান সময়ের মতো পরিপূর্ণ শেখ হাসিনার হাসিই যেন বাংলাদেশের হাসি।

শেখ হাসিনা আর বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর চোখে সমান্তরাল এক বড় হওয়া। পঁচাত্তরের পর শেখ হাসিনা অর্থাৎ বাংলাদেশ ভেঙ্গে পড়েছিল এই ভয়ে যে, আহারে ভালোবাসার মানুষ আবার পুড়ে যেতে থাকল জেনারেলদের পূর্বসুরিতায়, আহারে আর অনাচারে, ধর্মে আর মানুষে, সহজ কথা অত্যাচারে আর হত্যায়।

মোট ৫৩টি অধ্যায় আছে মহাকব্যের আদলে এক অধ্যায় শেষ হলে পরের অধ্যায়ে প্রথম অধ্যায়ের একটু হিন্টস দিয়ে শুরু করা। অনেক বড় বড় দীর্ঘ বাক্য ব্যবহারের অভিযোগ অনুবাদক তুললেও খারাপ লাগেনি বরং মন দীর্ঘক্ষণ শান্ত হতে পেরেছে।

শেখ হাসিনার বড় হওয়া তার চিন্তার মধ্যে বাংলাদেশের চলাফেরা, তার ঘুমাতে যাওয়ার আগে দুশ্চিন্তা- হতভাগা মানুষের নেতার প্রতি শাসকদের নজরদারি কিংবা জেলখানার বন্দি জীবন, মায়ের সঙ্গে বাঙালী জাতির ভাগ্য নিয়ে চিন্তার ভাগাভাগি, বান্ধবীদের সঙ্গে তার পিতার অর্থাৎ বাংলার মাথা নত না করার শিক্ষার ব্যাপন ঘটানো, এমনকি শেখ হাসিনার বিবাহ অনুষ্ঠানের অন্তরালেও ৬ দফার ব্যাপক প্রস্তুতি।

উপন্যাসে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ বিস্তারে এক-একটা ঘটনার বর্ণনা করা হচ্ছে আর শেষে গিয়ে শেখ হাসিনার বয়স বলা হচ্ছে। সাহিত্যের নজরদারি ছিল ঘটনার সংযোগ স্থলগুলোতে, উপমার দীর্ঘ দৃষ্টান্ত উপস্থাপনে কিংবা সংক্ষিপ্ত ভারী কোন তুলনায়, যেমন আগরতলা ষড়যন্ত্র অধ্যায়ে মনে হয়েছে- কারাগার অন্ধকারের বন্ধু- একজন বঙ্গবন্ধু, কিংবা আর এক অধ্যায়ে উঠে এসেছে- ব্যক্তিতে বিচারক বঙ্গবন্ধুর সামনে কোণঠাসা, বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে ১৯৬৯ বঙ্গবন্ধুকে এ জেলখানা থেকে সে জেলখানা টানা হেঁচড়া করার তিন বছর পর মুক্তি দেওয়ার পর জনপ্রিয়তার ওজন ছিল ঘরে ঘরে উৎসব।  

পুরাণের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে ফারাওদের ইসিসের কষ্টকর ভ্রমণ প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনাকে তার থেকেও ভয়ংকর ভ্রমণের উচ্চতর স্থানে স্থান দিয়েছেন।

৭ মার্চের ভাষণ টেপ রেকর্ডারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আধুনিক ন্যায়পরায়ণ যুদ্ধের ইঙ্গিতের তুলনা করা হয়েছে ইতিহাসে প্রথম। বর্তমান সমাজে বিরাজমান ইসলাম নামধারী জঙ্গিদের সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তানি বাহিনীর নিবিড় সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন লেখক তার প্রামাণিক ব্যাখ্যায়।

অনেকে এখনো নানা তাল বাহানায় জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নামে বেনামে জামায়াতের বাংলাদেশের পুনর্বাসন নিয়ে ১৯৭৩ এর সাধারণ ক্ষমার ফেউ তুলে নানা বিকৃত সাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছেন, তাদের জন্য এই উপন্যাস যেন উদলা পিঠে ধপাস করে এক লাথি।

জীবন কেমন ছিল, জয়ের জন্মের অধ্যায়টি, জামায়াতের আচরণের সঙ্গে কুরাইশ কাফেরদের আচরণের তুলনা, পারিবারিক হত্যাযজ্ঞ, যুদ্ধ অপরাধীসহ জামায়াতের প্রত্যাবর্তন, শেখ হাসিনার ভারতে পলায়ন, জিয়া, এরশাদের জেনারেলদের বড় আত্মীয়তায় জামায়াত পুষে যাওয়া আচরণ, আত্মার প্রত্যাবর্তন এই অধ্যায়টি Hasina: a daughter's tale এর সঙ্গে কিছুটা মেলে। শেখ হাসিনার নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন, দাড়িয়ালদের উৎপাত, বিএনপি এর সংজ্ঞা, বড় বড় বাক্য ব্যবহারে বাংলাদেশের নারীদের তলানিতে গিয়ে ঠেকা বর্ণনা, ইত্যাদি বিষয় উপন্যাসের শেষের দিকে অল্প একটু স্থানে স্থান পেয়েছে।

অধিকাংশ উপন্যাসের পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আগের বর্ণনা অর্থাৎ ২৩ বছরের একক যুদ্ধ, শেখ হাসিনার মনোবিকাশ।

রিভিউ লিখেছেন: আব্দুল্লাহ আল হাদী, কবি ও সাহিত্যিক।

ঢাকা টাইমস/২৪ফেব্রুয়ারি/একে

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :