সোনালি আঁশে সোনালি দিনের হাতছানি

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ১১:০৬ | প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৯, ১০:০০

নিজে কিছু করে করে দেখানোর চ্যালেঞ্জ থেকে পাটপণ্যের ব্যবসায় এসেছেন ইসরাত জাহান চৌধুরী। ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা, মাঝে কাজ করেছেন ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে। ভালো চাকরি করেও সন্তুষ্ট ছিলেন না ইসরাত। কারণ চাকরি নয়, নিজে থেকে কিছু করে দেখানোর বাসনা ছিল অনেক আগে থেকে। তাই মাত্র এক লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ২০১৫ সালে গড়ে তুললেন ‘তুলিকা’।

২০১৫ সাল থেকে দুই বছর পাট ও পাট থেকে কীভাবে গুণগত পণ্য উৎপাদন করা যায় সে বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন এই নারী উদ্যোক্তা। ২০১৭ সালে পাট পণ্য তৈরি শুরু করেন। বছরের শেষেই পরিশ্রমের সুফল আসতে শুরু করে। পেয়ে যান একটি রপ্তানি আদেশ।

ইসরাত বলেন, ‘২০১৭ সালের শেষের দিকে যখন একটি রপ্তানি আদেশ পাই তখন উৎসাহ এবং সবার সহযোগিতা আরও বেড়ে যায়। পরিবারের অন্যরাও পাশে দাঁড়ায়। এরপরে আরও দুটি রপ্তানি আদেশ পাই। বর্তমানে একটি আদেশ রয়েছে।‘

দেশে পাটের তৈরি পণ্যের চাহিদা কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ইসরাত বলেন, ‘পাটকে আমরা চিনি বস্তা হিসেবে। পাটের জিনিস কিনতে গেলে অনেকেই বলে বস্তা কিনব!’

দেশের বাজারে পাটপণ্যের চাহিদা নামমাত্র। ক্রেতাদের মধ্যে পাটপণ্যের বিষয়ে জানাশোনাও তেমন নয়। আবার পুঁজি কম হওয়ার কারণে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্র থেকেও বেশ দূরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ইসরাত জানান, তাদের ব্যবসা অল্প পুঁজির। তবে তাদের সবচেয়ে বড় মূলধন মানসম্মত পণ্য। আর এই সুনামটাকে অক্ষুণ্ন রাখতে চায় ‘তুলিকা’।

বছরে মাত্র এক সপ্তাহের জন্য এসএমই মেলার আয়োজন করে সরকার। এরপরে উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারিদের অনেকেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারছেন না।

পাট শিল্পের প্রতি সরকারের বিশেষ দৃষ্টি প্রয়োজন বলে মনে করেন এই নারী উদ্যোক্তা। বলেন, ‘আমার পক্ষে তো সম্ভব না যে আমি এখন একটি শো-রুম দেব। এখানে অনেকের পক্ষেই সম্ভব না। আবার অনেকের পক্ষেই সম্ভব। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য কিছু পদক্ষেপের প্রয়োজন।’

ব্যবসা বড় করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পুঁজির প্রয়োজন হয়। ব্যাংকে ঋণের আবেদন করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে তা নানা অজুহাতে নাকচ করে দেয়া হয়। এবিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান ইসরাত জাহান। বলেন, ‘ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে আরও আন্তরিক হওয়া উচিত। এমএমই ব্যবসায়ীদের ওপর সুদের হার আরও শিথিল করা প্রয়োজন।‘

ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য ৯ শতাংশ হারে সুদ ধার্য করা রয়েছে। সেটিকে কমিয়ে চার থেকে পাঁচ শতাংশ করা এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।

‘তুলিকা’র মাধ্যমে শুধু ইসরাত যে সাবলম্বী হয়েছেন তা নয়, আরও দশজন নারীর কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করেছেন তিনি।

কেবল ‘তুলিকা’ নয়, তুলিকার মতো করে গড়ে উঠেছে আরও বেশ কিছু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। তাদের একজন শাফিয়া শামা। ২০০৩ সালে চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে বুটিক ব্যবসা শুরু করেন। তখন তিনি দুই সন্তানের মা। প্রথমে একজন কর্মী নিয়ে বুটিক ব্যবসা শুরু করলেও ২০১১ সালে তার কর্মী সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০০ জনে।

বাংলার মেলা, আড়ং, কে-ক্রাফটসহ বেশ বিছু স্বনামধন্য ফ্যাশন হাউজে তার প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক সরবরাহ হতো। ২০০৮ সালে কাপড়ের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসেন। চিন্তা করেন রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি করবেন। শুরু করেন পাট দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘মেসার্স শামা’।

ঢাকার হাজারীবাগে তার কারখানা। কাজ করছেন ৩০ জন কর্মচারী। তৈরি হচ্ছে পাটের বহুমুখী পণ্য। শাফিয়া জানান, ‘চার-পাঁচটি ফ্যাক্টরির সঙ্গে আমি আউটসোর্স করি। আমার প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত বহুমুখী পাটপণ্যের ২০ শতাংশ রপ্তানি করি। আমার পরিকল্পনা আছে এটাকে ৫০ শতাংশ নিয়ে যাওয়া।’

চলতি বছর সপ্তমবারের মতো আয়োজিত হয়ে গেল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মিলনমেলা ‘এসএমই মেলা-২০১৯’। মেলায় ২৮০ জন উদ্যোক্তা অংশ নেন। একটি বড় অংশে ছিল পাটের বহুমুখী পণ্য তৈরির ব্যবসায়ীরা।

জারমার্টজ লিমিটেড, সাম্পান ক্রাফটস, আফিল জুট উইভিং মিলস লি., মেসার্স আমালী এক্সপোর্ট ইমপোর্ট, ট্রিম টেক্স বাংলাদেশ, তুলিকা, সিনটিলা, প্রকৃতি, কোর-দি-জুট ওয়ার্কস, পানসী, জুটমাট অ্যান্ড ক্রাফট ইন বাংলাদেশ, কারিকা-বাংলাদেশ হস্তশিল্প সমবায় ফেডারেশন লি., জুট ক্রাফটস, জুটইকো ব্যাগস অ্যান্ড ক্রাফটস, ব্যাগ বাজার, বেকি সেন্টার, রংপুর ক্রাফট, উই জুট, ভারটেক্স ক্রাফট, সাচ ফ্যাশন এবং হ্যান্ডিক্রাফট, ডোপ, গোল্ডেন রোপ, গোধুলি সিবিপি, রাহেলা জুট ক্রাফট, মেসার্স শ্যামা, আরটিসিটিক জুট বিডি, নকশী বাংলা ইকোটেক, নবাবী ফুটওয়্যার লিমিটেড, সুইট হোম, শৌখিন, শখ ক্রাফটস, প্রকৃতি হ্যান্ডিক্রাফটস, কাজী ফ্যাশন হাউজ, এস কে আর ক্রাফটস লি., পঞ্চকন্যা, টুইন ট্রিমস এর মতো প্রতিষ্ঠানের একেকজন উদ্যোক্তা সোনালি আঁশকে তাদের সোনালি দিনের হাতিয়ার করে তুলেছেন।

তবে দেশে পাটপণ্যের চাহিদা কম থাকায় মেলা শেষে হতাশার কথাও জানিয়েছেন অনেক উদ্যোক্তা। দেশে পাটপণ্যের বাজার তৈরিতে সরকারকেই ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন তারা। সেই সাথে সারা বছর যাতে দেশীয় ক্রেতারা এসব পণ্য পেতে পারে, সেদিকটি বিবেচনা করে উদ্যোক্তাদের জন্য স্থায়ী বাজার তৈরির আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

আবার ক্রেতাদের ক্ষেত্রেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক সপ্তাহের জন্য যেসব মেলা আয়োজন করা হয়, মেলা শেষে তারা সে পণ্য পাচ্ছেন না। পাটের তৈরি পণ্য নিয়মিত হলেও ক্রেতারাও উপকৃত হবেন হলে ঢাকাটাইমসকে জানিয়েছেন সপ্তাহব্যাপী মেলায় আসা অধিকাংশ ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা।

(ঢাকাটাইমস/২৫মার্চ/কারই/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :