আমরা কি ‘তালাদ থাই’ বাজার করে দিতে পারি না?

খলিল আহমেদ
| আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ২২:২৭ | প্রকাশিত : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ২২:২৪

আমরা যারা জনগণের করের টাকায় সরকারি অর্থে বা বিদেশি কোনো সরকারের অর্থে বিদেশ ভ্রমণ করি তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো লব্ধ অভিজ্ঞতার প্রতিবেদন জমা দিই না। আবার বিদেশ ভ্রমণের কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়া হলেও তা আমলে নিতে দেখি না। একটু ভেবে দেখুনতো বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসসমূহে কর্মরত মেধাবী কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশের সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে কি না। যদিও তাদের ম্যান্ডেট হচ্ছে বাইলেটারাল বিষয়ের ওপর কাজ করা।

যাহোক, আমার ২০০৭ সনের থাইল্যান্ড ভ্রমণের অভিজ্ঞতার একটি অংশের বর্ণনা দেয়ার প্রয়াস নেব। অর্থ বিভাগে সিনিয়র সহকারী অফিসার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ২০০৭ সনের ২৯ জুন হতে ২ আগস্ট পর্যন্ত ৩৫ দিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় এবং জাপান সরকারের অর্থায়নে থাইল্যান্ডে একটি প্রশিক্ষণে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. তারেক স্যার জাতীয় বাজেটের কাজে ব্যস্ত থাকায় উপসচিব শাহবুদ্দিন স্যারের (বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে) পরিবর্তে আমাকে থাইল্যান্ড পাঠনোর জন্য সিদ্ধান্ত নেন। আমি চেষ্টা করেছিলাম সিনিয়র সচিব ড. তারেক স্যারকে অনুরোধ করে আমার কয়েকটি অভিজ্ঞতার বাস্তবায়ন করার।

আমার যতটুকু মনে পড়ে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. তারেক স্যার আমাকে দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করিয়ে ছিলেন। অবশ্য এ কাজে আমাকে পরার্মশ দিয়ে ছিলেন ড. জাফর স্যার (বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্বে)। থাইল্যান্ড ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে তারেক স্যারকে আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারত বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের মেয়াদ চার মাস থেকে বাড়িয়ে নয় মাস করে প্রশিক্ষণটিকে ডিপ্লোমা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়ে অর্থ বিভাগের একটি সুপারিশ দেয়া। আরেকটি প্রস্তাব ছিল বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীর টেবিলে একটি করে কম্পিউটার প্রদানের জন্য অর্থ বিভাগের সুপারিশ জনপ্রশাসনে প্রেরণ করা।

তারেক স্যার এ সুপারিশ দু’টি জনপ্রশাসনে প্রেরণ করেছিলেন। একদিন হয়ত বুনিয়াদি প্রশিক্ষণকে ডিপ্লোমা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে। বর্তমানে প্রশিক্ষণটি কেন্দ্রে কম্পিউটার ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। ২০০৮ বা ২০০৯ সালে অর্থ বিভাগের একটি সমন্বয় সভায় থাইল্যান্ড প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে স্যারকে বলেছিলাম শেয়ার মার্কেটে অংশগ্রহণকারী কোম্পানিকে ওয়েবসাইটে করতে নির্দেশ দিয়ে দেন এবং প্রত্যেক কোম্পানিকে তাদের ওয়েবসাইটে আর্থিক বিবরণী নিয়মিত আপলোডকরণ বাধ্যতামূলক করে দিন।

তারেক স্যার আমার সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আমরা এ কাজটি সকল বিমাকারীর জন্য বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছি। ড. তারেক স্যারের জুনিয়ার কর্মকর্তাদের দ্বারা কাজ করিয়ে নেয়ার অসাধারণ এক ক্ষমতা ছিল এবং তাঁর এ ক্ষমতার স্বীকৃতি দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি গেজেট প্রকাশ করেছিল। আমি যতটুকু জানি আমাদের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ড. নাজনীন অস্ট্রেলিয়া থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিল। ড. নাজনীন দিয়ে তারেক স্যার বিদ্যুৎ খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর যৌক্তিক কারণ বের করার উদ্দেশ্যে একটি Econometric মডেল করিয়েছিলেন এবং গবেষণার ফলাফলকে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে ছিলেন।

চাকরি জীবনে প্রশিক্ষণটি ছিল আমার জীবনের সেরা প্রশিক্ষণ। এটি হয়েছিল এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। সেখানে প্রথম ই-গভার্ন্যান্স এবং পাবলিক প্রেইভেট পাটনারশীপ সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাই। আমি তখন ভাবতাম আমার দেশ এ বিষয়ের ওপর চর্চা করে অচিরেই উন্নতি লাভ করবে। আমার মনে আছে মুসলিম চৌধুরী স্যার (বর্তমানে সিএন্ডএজি) পিপিপি নিয়ে অর্থ বিভাগে কোনো মতবিনিময়ের সভা করলে আমি নোটিশ না পেলেও হাজির হতাম আর আশা করতাম আমার দেশ দশ বছরে একটি উন্নত দেশ হয়ে যাবে। আমার মনে আছে পিপিপি’র বিষয়ে কাজ করছিল সহকারী সচিব মুনির (বর্তমানে ড. মুনির ওয়াশিংটনে লিয়েনে কাজ করছে) তাকে দক্ষিণ কোরিয়ার পিপিপি’র ২০০৭ সনের আইনের একটি কপি নেট থেকে ডাউনলোড করে দিয়ে ছিলাম। আমি তাকে বলেছিলাম দক্ষিণ কোরিয়া এই আইনটি ৪০ বার সংশোধন করে একটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এটি তুমি অনুসরণ করতে পার।

এখানে বলে রাখা ভালো, আমি ২০১১ সনে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী এ কে খন্দকারের সাথে কোরিয়ায় গিয়েছিলাম। কোরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বাসায় কোরিয়ার পিপিপি বিভাগের প্রধান কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম তারা যুক্তরাজ্য এবং জার্মানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের দেশে পিপিপি বাস্তবায়ন করেছে। আমার জানামতে পিপিপি মাধ্যমে ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশের পরে কোরিয়া সবচেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করেছে। আমাদের দেশের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে পিপিপি’র মাধ্যমে করা সম্ভব এবং এই আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে ঢাকার যানজটের একমাত্র সমাধান হতে পারে।

যে বিষয়টির অবতারণার জন্য এত কিছু লিখছি সেটি হচ্ছে থাইল্যান্ডের ‘তালাত থাই’ মার্কেট। আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কৃষি বাজার। এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থামাসাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ২০০ একরের জায়গা নিয়ে তালাদ থাই বাজারটিব গড়ে উঠেছে পিপিপি’র মাধ্যমে। এই পাইকারি বাজারে বিশাল বিশাল সেডের নিচে সবজি, ফুল, ফল, মাছ এবং মাংসহ সকল কৃষিজাত পণ্য পাওয়া যায়। একেক সেডের নিচে একেক ধরনের ফল। প্রায় প্রতিদিন তালাদ থাই বাজারে গিয়ে প্রশিক্ষণার্থীগণ রাম্বুটাম, লাল রঙের পেঁপে আর কলা কিনে খেতাম। বিশেষ করে লাল মিষ্টি পেঁপে প্রথম খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এই বাজারের ছবি তোলা যায় না এবং একারণেই নেট ঘেটে তেমন ছবি বা তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকি বাজারটির ব্যবস্থাপনা কীভাবে হচ্ছে তা আমাদের দূতাবাস সেই ২০০৭ সনে অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারেনি।

বাজারে নারী-পুরুষ কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি তাদের নিজস্ব পিকআপ ভ্যানে করে নিয়ে আসছে। মধ্যস্বত্বভোগীর ব্যবসা করার সুযোগ না থাকায় কৃষক পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে এবং খুচরা ক্রেতাগণ পাইকারি দামে পণ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছে। আমরা যারা প্রশিক্ষণার্থী ছিলাম তারাও এ সুযোগটি কাজে লাগিয়েছি। বিভিন্ন এজেন্সি এখানে পণ্যের ১০০% বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা করছে। বাজারটি ঘুরে ঘুরে আমার ধারণা হয়েছে এখানে পণ্য পরিবহন ব্যবসার বিকাশ হয়েছে, খুচরা ক্রেতারা উপকৃত হচ্ছে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বাজারটি ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করছে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই বাজারের বাইরে কোনো বিক্রেতা অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করলে সাধারণ মানুষের তালাত থাই বাজারের ক্রয়ের সুযোগটি গ্রহণ করবে। এভাবেই খুচরা ক্রেতাদের পণ্য কেনার সুযোগটি পরোক্ষভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে। শুনেছি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে এবং বাণিজ্যিক ফার্মের বিকাশে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে এ বাজারটি কাজ করেছে। পর্যটকদের এই বাজারটি অন্যতম আকর্ষণের স্থান হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

আমার দেশের অনেক কৃষক ফসলের মূল্য না পেয়ে তা পুড়িয়ে বা পানিতে ফেলে দিয়ে কাঁদতে থাকে। আমরা কি পিপিপি’র মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষকের জন্য এ ধরনের বিশাল বাজার করে দিতে পারি না? সাম্প্রতিককালে যে হারে বাজারে অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে ঝুঁকি নিরসণে প্রয়োজনে এ ধরনের বিশাল বাজারের জন্য ইন্স্যুরেন্স, রিইন্স্যুরেন্স, কো-ইন্স্যুরেন্স বা ডাবল ইন্স্যুরেন্স করা যেতে পারে।

লেখক: যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ সরকার

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত