হারিয়ে যাচ্ছে টাইপরাইটিং পেশা

জাহাঙ্গীর হোসেন, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)
 | প্রকাশিত : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৪৩

সময়ের পরিবর্তনে কত কিছুই না হারিয়ে যায়। ডিজিটাল দুনিয়ায় আজ অ্যানালগ প্রায় অচল। তেমনি প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় হারিয়ে যেতে চলেছে টাইপরাইটার পেশা। কম্পিউটারের আগমনে এক সময়ের জনপ্রিয় টাইপরাইটার আজ বিলুপ্তির পথে। টাইপরাইটারের খটখট শব্দ আর তেমন শোনা যায় না।

টাইপরাইটারের সঙ্গে যাদের জীবন-জীবিকা বাঁধা ছিল সেই মুদ্রাক্ষরিকরাও (টাইপিস্ট) এখন হারিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই পেশা বদলাচ্ছেন। অনেকে বেকার হয়েছেন। আবার অনেকে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলেও এখনো সেই টাইপ মেশিনকে আঁকড়ে ধরেই সংগ্রাম করে চলেছেন প্রতিদিন।

এক সময় অফিস-আদালতে সাঁটলিপিকার ও মুদ্রাক্ষরিক পদটি ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে শব্দের গতি গুনে চাকরি মিলত। মিনিটে ৬০ শব্দ নিখুঁতভাবে টাইপ করতে পারেন এমন দক্ষ টাইপিস্টের কদর ছিল বেশি। সেই পদটিও এখন বিলুপ্তির পথে। সরকারি দপ্তরগুলোতে এখনো টাইপরাইটারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেলেও বেসরকারি অফিসে এই যন্ত্রটি আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। অফিস-আদালত টাইপরাইটারের পরিবর্তে কম্পিউটার কিনছে। কম্পিউটারের লেখায় কোনো কাটাকাটি নেই, ভুল হলেই অটো সংশোধন।

এক সময় আদালত প্রাঙ্গণ, ভূমি অফিস, নগর ভবন, রাজউক ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অফিস সংলগ্ন কোনো গাছের নিচে সারিবদ্ধ হয়ে কাজ করতেন টাইপিস্টরা। এখন কোথাও তরুণ টাইপিস্ট খুঁজে পাওয়া যায় না। আগের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম হলেও মাঝ বয়সী ও বয়স্ক টাইপিস্টদেরই মাঝে মধ্যে চোখে পড়ে।

মঙ্গলবার সকালে টাঙ্গাইল কোর্ট চত্বরে বার সমিতি ভবনের নিচ তলায় গিয়ে দেখা যায়, সরু একটি রুমে কয়েকজন বৃদ্ধ ও মধ্যবয়সী টাইপিস্ট সারিবদ্ধ হয়ে বসে বিভিন্ন কাগজপত্র টাইপ করছেন। কাজের ফাঁকে কথা হয় টাঙ্গাইল সদরের বিশ্বাস বেতকা এলাকার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ রতন চন্দ্র দে ও তার ছোট ভাই তপন চন্দ্র দে’র সঙ্গে।

রতন চন্দ্র দে জানান, ‘তিনি গত ৫২ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন। ১৯৬৯ সালে টাঙ্গাইল জেলা প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগেও পাঁচ বছর তিনি ময়মনসিংহ জেলা কোর্ট চত্বরে টাইপরাইটিং-এর কাজ করতেন। ১৯৭৩ সালে টাইপরাইটিং পেশায় টাঙ্গাইলের এসডিও অফিসে চাকরি হলেও বাইরে টাইপরাইটিং পেশায় উপার্জন বেশি হওয়ায় তিনি সেসময় চাকরি ছেড়ে দেন।’

 ছোট ভাই তপন চন্দ্র দেও ১৭৭২ সাল থেকে ভাইয়ের সঙ্গে টাইপরাইটিংয়ের কাজ করছেন। তারা জানান, ‘এক সময়ে এই পেশায় তাদের ভাল উপার্জন হলেও বর্তমানে কম্পিউটারে অধিকাংশ কাজ হওয়ায় তাদের উপার্জন কমে গেছে।  প্রতিদিন ২/৩শ টাকা হলেও মাঝে মধ্যে আয় রোজগার হয়ই না।’

একই কথা জানান, পাশ্ববর্তী কালিয়াকৈর উপজেলার বৈরাগীচালা গ্রামের আব্দুল হক ও টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার নারাণ চন্দ্র গুহ নিওগী। তারা বলেন, ‘সারাদিন বসে থেকে দুই তিনটা কাজ পায় কেউ কেউ। কেউ কেউ একটিও পায় না। টাইপ মেশিনের খটখট শব্দ কমে যাওয়ার সাথে সাথে কমে যাচ্ছে তাদের আয় রোজগারও। এই কম্পিউটার যুগে মানুষ আর টাইপিস্টদের কাছে  যেতে চায় না। একদিকে কম্পিউটার, অপরদিকে ফটোকপি মেশিন। এই দুই মেশিন এসে টাইপিস্টদের পথে বসিয়েছে। তাদের দিন চলছে অর্ধাহারে অনাহারে। সংসার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা। তবে অনেকের আবার ছেলে মেয়ে সুশিক্ষিত হয়ে ভাল চাকরি ও প্রবাসে থাকায় তাদের সংসার খরচ এখন আর চিন্তা করতে হয় না।’

তারা বলেন, ‘দশ আঙুলের কারুকর্মের ধরন পরিবর্তন না হলেও যন্ত্রটির পরিবর্তন হয়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে টাইপরাইটার। এখন চলছে কি বোর্ড বা কি প্যাডের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব আর স্মার্টফোনের দিন।’

রতন চন্দ্র দে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘প্রযুক্তির আধিপত্যে একদিন হয়তো জাদুঘর আর ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেবে এককালের জনপ্রিয় এই টাইপরাইটার মেশিন।’

(ঢাকাটাইমস/৯এপ্রিল/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :