বুক রিভিউ

সিক্রেট ডকুমেন্ট: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:০৫ | প্রকাশিত : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৪৪

Secret documents of Intelligence branch on Father of the nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman. Vol 1 & 2. (P.F. 606-48) 1948-1952.

পড়ার পর মনে হচ্ছিল বয়সের ওজন বেড়ে যাচ্ছিল। ইটে ঘাসচাপা অনেকগুলি পত্র-পত্রিকার সংবাদ, কিংবা খুবই অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা মুহূর্ত যা জানতে পারত না প্রজন্ম কোনোদিন, নতুবা এর গুরুত্ব ভুলে প্রজন্ম হয়ে যেত পূর্ব অনুভূতিহীন নগদ ঠোঁট মোছা কাক, চক্ষু-লজ্জাহীন লোভে উর্বর এক শ্রেণির মানুষ।

কতগুলো নাম এলো, কতগুলো নাম খসে যেতে থাকল, পড়তে পড়তে আরো কতগুলো নতুন নাম আসতে থাকল, আবার কতগুলো নাম নতুন করে খসে যেতে থাকল। দ্বিতীয় খণ্ড পড়তে পড়তে এতক্ষণে কতগুলো নাম দাঁড়িয়ে গেছে তার কেন্দ্রকে ঘিরে, কেন্দ্রে একজন মানুষ।

এই একজন মানুষকে খুঁজতে গিয়ে গোয়েন্দাদের মুখস্ত হতে হয়েছিল এতগুলো নামের স্রোতের সাথে তাদের হাড়ি-নাড়ির খবর নিয়ে। এই একজন মানুষকে ঘিরেই এই সকল মানুষের নাম আসা-যাওয়া, তাদের অনুভূতি-চাওয়া-পাওয়া মানুষের মতো জীবন ভেবে।

একেকটা দিন ঘটে যেতে থাকল তার চিন্তার গোড়াপত্তন,একজন মানুষ শিখে যেতে থাকলেন মানুষে-মানুষে মিশে-মিশে নিজের জীবনকে বিদ্যালয় বানিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যেন তার কাছ থেকে বেশি শিখেছে, যেমন শিখেছে বিশ্ববাসীও।

১৩ জানুয়ারি ১৯৪৮, "পূর্ব পাকিস্তানে দুর্ভাগা জনসাধারণ কৈফিয়ত দিতে হবে আমাদের দাবি", Rs ৩ মূল্যের, শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রকাশিত কতগুলো বুকলেট বিতরণ করছেন কতিপয় যুবক, এরকম একটা ঘটনা দিয়ে বর্ধমান হাউজের সামনে থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপর পড়তে পড়তে দেখতে পাই তার আগের ঘটনাও, কেননা গোয়েন্দারা একাংশও ছিদ্র রাখেনি তাকে নিয়ে পুরোপুরি গবেষণা করতে।

১৯৪৭ এর দেশ ভাগ, তার আগে ১৯৩৭-৩৯ সালে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর সাব-ডিভিশনাল মুসলিম স্টুডেন্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক, মুসলিমলীগ ডিফেন্স কমিটির সাধারণ সম্পাদক ১৯৪২-৪৩, তথ্য থেকে আরো জানা যায় ১৯৪০-৪৭ পর্যন্ত তিনি কখনও রিলিফ ক্যাম্প থেকে শুরু করে সর্বত্রই হেঁটেছেন শুধু মানুষের মুক্তির পথগুলো বুঝে উঠার জন্য।

তারপর থেকে তো তার প্রতিদিনের দিনপঞ্জি আমরা এখান থেকেই পাই। বঙ্গবন্ধুর দিনের পর দিন মিলে প্রতিটি বছরের নড়াচড়ার হিসেবও গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল, নজরদারি এড়ায়নি তার পরিবারের প্রতিদিনের সম্পদের হিসেব-নিকেশও, আত্মীয়-স্বজন তো বটেই সাথে সাথে পরিচিত জনেরও হাড়ি-নাড়ির খবর।

গোয়েন্দারা সময়কে আবডাল করে রেখেছিল তাদের চোখের পলক থেকেও যেহেতু তাদের চোখ হয়ে গিয়েছিল কুকুরের ঘ্রাণ, প্রভুদের নিশ্বাস তাদের মধ্যে যেমন আসা-যাওয়া করত।

গোয়েন্দারা অন্যান্য নেতাদের খোঁজ খবরও রাখতেন, যেন বঙ্গবন্ধুকে খুঁজতে গিয়ে যারা নজরে আসে। মোট ১৪ খণ্ড শেষ হতে হতে কতদূর দাঁড়ায় তা দেখার বিষয়, এই ডকুমেন্টের সুন্দর একটি গ্রন্থ ভূমিকা তারই নির্দেশ করেছে। 

এই ডকুমেন্ট প্রকাশ হওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থে ভাষা আন্দোলনের একটা লিখিত চিত্র পাই এবং তারসাথে এই ডকুমেন্ট অংশ মিলিয়ে নিলে তৎকালীন চিত্রটি পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে দালিলিক ইতিহাস।

জেলে থাকাকালীন সময়ে বারবার কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে conditional মুক্তি দিতে চেয়েছেন বারবারই তিনি stiff থেকেছেন, শর্ত দিয়ে মুক্তি তিনি নিবেন না। তার এরকম আচরণ বরাবর একই রকম, -অন্যায়ে মাথা নোয়াতে বিষের মতো অনীহা, ১৯৪৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীদের পক্ষের  আন্দোলনে Rs ১৫ করে জরিমানার টাকা ৬ জনের বাদবাকি সবাই দিয়েছিল, তিনি দেননি।

৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জেলখানায় থেকে যা কিছু তিনি করতে পারছেন, তাতে শুধু নিরীহ মানুষ মরছে, ওরা বার বার মরে গেল, মরে যাচ্ছে। এখন জালেমদের মুখোমুখি হওয়া দরাকার। হিবিয়াস কার্পাস করে যেহেতু কাজ হল না, এবার তাঁকে বেছে নিতে হচ্ছে অনশনে করে -হয় মৃত্যু, না হয় মুক্তি; কেননা এই দুটোই তাঁর।

মুক্তি না হলে বাঙ্গালী জাগবে না, পিষে উৎপাদনের কাঁচামাল হয়ে যাবে, আখের ছোবড়ায় মাছি ভন ভন করবে দুর্ভিক্ষ নিয়ে উর্দু ভাষার রসিকতায়। এসব দেখার চেয়ে মরে যাওয়াও ভালো,  আড়াই বছর পার হয়ে গেল, এর মধ্যে ২১ ফেব্রুয়ারিতে ২৭ রাউন্ড গুলি বর্ষণ হয়ে গেল। অনশন পরিস্থিতিতে অসুস্থ মানুষটিকে জেল থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হলো। তার কয়েকদিন পরেই তিনি করাচী গেলেন কেননা পশ্চিমাদের জানাতে হবে ভাষার জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি কি হয়েছিল, কিংবা সামনে কি হতে যাচ্ছে, এবং তাদেরকে সেখানে তিনি প্রথমবারের মতো অন্যথায় seperation এর হুমকিও দিয়েছিলেন।

১৯৫২, শেখ মুজিবুর রহমান এখন আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, করাচী সফরের পর পিকিং সফর, সফর করছেন বাঙলার গ্রামে গ্রামে পায়ে হাঁটা রাস্তায় রাস্তায়। সংগঠন হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ পৌঁছে যাচ্ছে বাজার-সদায়ের ব্যাগ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় মানুষের চিন্তায়, ঠিক যেন শীত কালের বেলা বয়ে যাওয়ার মতো দ্রুতই। 

গোয়েন্দারা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন শ্লোগান বক্তৃতা বিবৃতির নোটও সংগ্রহ করেছেন তারা, সেখান থেকে জানা যায় তখনকার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটও -সাড়ে চার কোটি মানুষ, দুর্ভিক্ষ ছিল ঘরে ঘরে -১৯৪৩ এ ৫০ লক্ষ মৃতের হিসাব, ধারাবাহিক ভাবে ১৯৫২ তে খুলনায় দুর্ভিক্ষে মারা গেছে ২০ হাজার, এরকম প্রায় প্রতিটি জেলায় দুর্ভিক্ষ ছিল প্রতি বছরের ঘটনা, সপ্তাহে মাত্র দুবার ঢাকা থেকে করাচি ফ্লাইট ছিল, ১৬ টাকা সের লবণ অন্যদিকে পাটের মণ ৩/৪ টাকা, আইন-কানুন ছিল বিনা বিচারে যতদিন জেলে রাখা যায়, শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল গায়েবি জানাজা, দুঃশাসন ছিল ঘুমের মধ্যেও, Top heavy administration, উচ্চ কর, জমিদারী প্রথা, কাশ্মীর সমস্যা যেন ছিল সরকারের উদাসীনতা আর ক্ষত বেঁচে খাওয়ার ব্যবসা, সব মিলিয়ে নাজেহাল অবস্থা।

তখন censored অথবা প্রকাশিত বিভিন্ন চিঠি পত্র থেকে দেখা যায় নানা দুর্লভ সাহিত্য উপাদানও, চিন্তা নিংড়ানো মেহনতি দর্শন, একটি সাংগাঠনিক কাঠামো বিনির্মাণে রাষ্ট্রের নানা-প্রান্তের মানুষের মতামত যা কখনো কখনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বার বার omit করে গেছে নতুন বিশ্বাস হয়ে। 

একটি পত্র পড়ে অনুভব করেছি, -পিতার তার কারাবন্দী সন্তানকে বাতাসের গন্ধে গন্ধে খোঁজা, কেউ তাকে জেলে দেখে এসেছে সেই চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর সন্তানকে যদি একটু দেখা যায়, কিংবা তার গায়ে যদি তাঁর সন্তানের একটু গন্ধ মেখে থাকে তারজন্য একটু জোরে শ্বাস নেওয়া, তবুও সন্তানকে তাঁর সংকল্পে অটল থাকার জন্য মনোবল দিয়ে পত্র। এরকম নানা অনুভূতি ----।

জানতে জানতে আরো মনে হয়েছে এতদিন মানুষ যে মনোক্তি বই-টই লিখেছে সেসকল ক্ষেত্রে এই ডকুমেন্ট খণ্ডগুলো একটি ভালো সমাধান, যেমন এই দালিলিক সত্য থেকে দৃঢ় হয়, সত্যের পুরত্ব।

কত আপন যত্নসহকারে একটি জাতির জন্য একজন মানুষ এবং তাঁর সাথের মানুষগুলো বুনে গিয়েছিল থেঁতলে যাওয়া স্বপ্নের ভূমিতে, সেরে উঠতে পারা মানুষের সাহস। 

তিনি অল্প অল্প করে কখন যে জড়িয়ে গিয়েছিলেন মানুষের ভালোবাসায় স্বপরিবারে, হয়ত বুঝে উঠতে পারেন নাই। নাকি বুঝে উঠতে চান নাই? যেমন চান নাই, এরকম উদাহরণ আমাদের সামনে আর এভাবে নাই।

রিভিউ লিখেছেন: আব্দুল্লাহ আল হাদী, কবি ও সাহিত্যিক

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :