তখনকার বৈশাখ এখনকার মতো ছিল না

সেলিনা হোসেন
| আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১:০৫ | প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০৮:৪০
ফাইল ছবি

এখন থেকে ৬৫ বছর আগের সময়টা ছিল আমার শৈশব। সেটা ছিল পঞ্চাশের দশক। তখন আমি যে নববর্ষ দেখেছি, সেখানে নববর্ষের দিন মেলা হতো। সেই মেলায় নানা কিছু বিক্রি হতো। আমি যেখানে থাকতাম সেখানকার সব শিশু একসঙ্গে মেলায় যেতাম। এই মেলাটাই ছিল আমাদের জন্য একটা প্রধান আকর্ষণ। সেখান থেকে মুড়ি-মুড়কি, ছোট ছোট বাতাসাসহ নানা শুকনো জাতীয় খাবার কিনতাম। কিছু খেলার জিনিস কিনতাম। মাটির পুতুল, ঘোড়া, হাতি এসব কিনতাম। তখনকার বৈশাখটা এখনকার বৈশাখের মতো ছিল না। সেটা একটা মেলার মধ্যে দিয়ে হতো।

আমরা জানি সম্রাট আকবর পয়লা বৈশাখকে নববর্ষ ঘোষণা করলেন। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল খাজনা আদায় করা। তখন বৈশাখের সঙ্গে ফসলের সম্পর্কটা প্রাধান্য পেতো। সেই জায়গাটা থেকে এটাকে আমরা উৎসবে পরিণত করেছি। এই বৈশাখটা এখন আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার বড় দিক। পাকিস্তান আমলে আমাদের কৃতী সন্তানরা, আমাদের ওয়াহিদুল হক সানজিদা আপাসহ আরও অনেকে মিলে পয়লা বৈশাখকে রমনার বটমূলে উদযাপন করার চিন্তা করেছিলেন। সেই চিন্তাটা পাকিস্তান আমলে আমাদের জাতিসত্তার জায়গাটাকে শক্তিশালী ও প্রবল করে তুলেছিল। নববর্ষ এভাবে আমাদের চেতনাগতভাবে অনেক উজ্জ্বল করেছে।

আমার শৈশবে এত কিছু চিন্তা করার সুযোগ বা বুদ্ধি বা বয়সও ছিল না। আজকের দিনে বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার একটি বড় প্রতীকী দিন। যে প্রতীকী দিন আমরা রমনার বটমূলে উদযাপন করে বৈশাখকে আহ্বান জানাই, এটা হলো বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় জায়গা।

আমরা যে শৈশব পালন করেছি আজকের দিনে এটা তার ধারাবাহিকতা। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়, অনেক অগ্রগামী চিন্তা আসে। সেখান থেকে আমি বলব, সেটা ছিল বলেই আমরা আজ এই জায়গায় আসতে পেরেছি। সেটা না থাকলে আমরা এই বড় জায়গাটা ধরতে পারতাম না।

পাকিস্তান সরকার কিন্তু পয়লা বৈশাখ উদযাপন নিষিদ্ধ করেছিল। মূলত বাঙালি জাতিসত্তাকে ঠিকমতো উঠতে না দেওয়া, সাংস্কৃতিক জাতিসত্তাকে বিকশিত হতে না দেওয়ার জায়গাগুলো থেকেই দমন করেছে তারা।

বাংলা নববর্ষ নিয়ে কথা বলতে গেলে দুই বাংলার কথা চলে আসে। এটা নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের খ্রিষ্টীয় সন যেটা ইংরেজি নববর্ষ হিসেবে প্রচলিত সেই জায়গার সঙ্গে যখন আমরা মিলাতে যাই, তখন দেখেছি কেলেন্ডার অনুযায়ী আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি কখনো ৮ ফাল্গুন কখনো ৭ ফাল্গুন আবার কখনো ৯ ফাল্গুন হয়।

আসলে আমাদের বাংলা সন যেটা নববর্ষ বলছি সেই জায়গাটাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আনার জন্য একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আমি তখন বাংলা একাডেমিতে ছিলাম। তখন দেখেছি বিশিষ্টজনেরা বসে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে ১৪ এপ্রিল একটি নির্দিষ্ট তারিখ করে দিয়েছে বাংলা এবং ইংরেজি সমুন্নত করে। যেটা আমরা বাংলা নববর্ষ হিসেবে পালন করছি। তখন আমাদের পশ্চিমবঙ্গে যারা আছেন বাঙালিরা তারা এই সিদ্ধান্তে রাজি হননি। তারা এই সিদ্ধান্ত না মেনে, মেনে নিলেন পঞ্জিকা। তারা পঞ্জিকা অনুযায়ী দিনটা দেখে নববর্ষ পালন করছেন। সেজন্য এই জিনিসটা আমাদের সঙ্গে একটু তফাৎ হয়েছে।

তবে আমার মনে হয়, তারা করছে করুক। তারা তাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় দিনটাকে যেভাবে করতে চান করুক। আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় দিনটাকে সরকারিভাবে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে এসেছি, আমরা আমাদের মতো করেই উদযাপন করি। তবে তাদের ওখানে আমাদের মতো করে ইদানীং পালন করার চেষ্টা চলছে, আগে এটা কিন্তু ছিল না।

আরেকটা বিষয় ইদানীং আমাদের এখানে দেখা যাচ্ছে, একশ্রেণির লোক খ্রিষ্টীয় সনের আদলে বাংলা নববর্ষ পালন করছে। এটা আমাদের করা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। যেহেতু জাতিসত্তায় আমরা বাঙালি। আমি এটাকে মনে করি আমাদের সাংস্কৃতিক দিকটা আমাদের মধ্যে অটুট থাকুক। ওটাও আমরা করব। তবে আমাদের নববর্ষকে বাঙালি হয়েই পালন করব। আমাদেরটার সঙ্গে খ্রিষ্টীয় নববর্ষকে মেলাব না। আমাদের সাংস্কৃতিক দিকটাকেই আমরা বেশি গুরুত্ব দেব।

সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক

অনুলিখন: নজরুল ইসলাম

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :