মূল আসামি না ধরেই পুলিশের বাহারি সংবাদ সম্মেলন!

আলম রায়হান
 | প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:৩৩

ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা পুলিশ বাহিনীর প্রতি নেতিবাচক ধারণা অনেকটাই দূর হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন বিষয়ে পুলিশের সাফল্য রাষ্ট্রীয়ভাবে গর্ব করার  মতো অবস্থায় উন্নীত হয়েছে। কিন্তু বাহিনী হিসেবে পুলিশের এই দক্ষতার ও সাফল্যের ভাগিদার গ্রাসরুট পর্যায়ে দেশের মানুষ পাচ্ছে কি না তা নিয়ে অনেকেরই সংশয়-সন্দেহ আছে। আর এই সন্দেহের বিষয়টি প্রকটভাবে সামনে চলে আসে ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার পর ওসি মোয়াজ্জেমের ন্যাক্কারজনক ভূমিকা প্রকাশ পাবার পর। এই ঘটনা পুলিশের জন্য সারাদেশে বিব্রতকর এক প্রভাব ফেলেছে।

সোনাগাজীর চেয়ে অনেক কম মাত্রায় হলেও বরিশালে পুলিশের সাম্প্রতিক এক ভূমিকা পুরা অঞ্চলজুড়ে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টির সূত্রপাত, একটি খুনের ঘটনায় পুলিশের তৎপরতাকে কেন্দ্র করে। এ ঘটনায় পুলিশ প্রয়াত সাংবাদিক লিটন বাশারে বাড়িতে তাণ্ডব চালিয়েছে। এমনকি মূল আসামি আটক না করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ‘বাহারি সংবাদ’সম্মেলন করেছে।

বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের দলিল লেখক রেজাউল করিম ১৮ এপ্রিল দিবাগত রাতে নিজ বাড়িতে নির্মমভাবে খুন হন। এ হত্যার মূল দুই অসামিকে এখনো ধরকে পারেনি পুলিশ। কেবল নিহতের স্ত্রীকে সন্দেহবশত আটক করার সাফলের জানান দেয়ার জন্য ২১ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ। তবে এ সংবাদ সম্মেলন জনমনে তেমন কোনো আস্থা তৈরি করতে পারেনি বলে জানা গেছে। এদিকে এ ঘটনায় আসামি ধরার নামে গভীর রাতে প্রয়াত সাংবাদিক লিটন বাশের বাড়িতে পুলিশের তাণ্ডবে জনমনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। আর এর প্রভাব কাটতে না কাটতেই মূল অসামি না ধরেই বাহারি সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে ২১ এপ্রিল আহুত জরুরি এ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় ‘রেজাউল খুনের ঘটনায় রিয়াজের স্ত্রী লিজা ছাড়াও আরো দুজন জড়িত। এদের একজন মাসুম ও অন্যজনের নাম হাইল্যা বলে শোনা যাচ্ছে। মাসুম নিহত রেজাউল করিম রিয়াজের সহকারী ও আমিনা আক্তার লিজার পরকিয়া প্রেমিক।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানত বক্তব্য দেন উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ ও ডিবি) মোয়াজ্জেম হোসেন ভূঁঞা। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (এডিসি) রুনা লায়লা, সিনিয়র সহাকারী পুলিশ কমিশনার মো. রাসেল, বরিশাল  কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি নুরুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ভাষ্য মতে, স্বামীকে হত্যার দ্বায় স্বীকার করে স্ত্রী আমিনা আক্তার লিজা (৩০) আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মূল হত্যাকারীদের না ধরেই কেবল নিহতের স্ত্রীকে আটক করার ‘সাফল্য’ জানান দেবার জন্য উল্লিখিত সাংবাদিক সম্মেলন আহ্বান করার প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে পর্যবেক্ষক মহলে। আবার একজন নারীর বিবাহিত জীবনের ব্যক্তিগত জীবনের বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলনে বর্ণনা করারও যুক্তি খুঁজে পচ্ছেন না অনেকে। সবমিলিয়ে পুলিশের উল্লিখিত সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বরিশাল শহরে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। এটি পরিণত হয়, অনেকটা টক অব দ্য টাউন। অবশ্য এর আগে দলিল লেখক খুনের আসামি ধরার নামে অন্যরকম ঘটনা ঘটিয়েছে পুলিশ। তা হচ্ছে বরিশালে অকাল প্রয়াত সাংবাদিক লিটন বাশারের বাড়িতে গভীর রাতে পুলিশি তাণ্ডব। ২০ এপ্রিল দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে বিএমপির কোতয়ালী থানার পুলিশ প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই তাণ্ডব চালায়। বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট পুলিশের অদক্ষতার উহারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন পর্যবেক্ষক মহল।

গভীর রাতে পুলিশের তাণ্ডব চলাকালে বাড়িতে ছিলেন লিটন বাশারের বৃদ্ধা মা এবং দুজন বয়স্ক গৃহপরিচারিকা। সংলগ্ন একটি রুমে ছিলেন দুই শিশু সন্তানসহ এক দম্পতি। চোখের চিকিৎসার জন্য লিটন বাশারের বাবা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। আর তার তিন ভাই সকলেই ঢাকায় কর্মরত। উল্লিখিত অবাঞ্ছিত ঘটনার রাতে বাড়িতে একা অবস্থান করছিলেন লিটন বাশারের বৃদ্ধা মা। তিনি ঘটনার আকস্মিকতায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে তার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। প্রসঙ্গ, তিনি বার্ধক্যজনিত নানান রোগের জটিলতায় ভুগছেন।

প্রয়াত লিটন বাশারের বাড়িতে পুলিশের তাণ্ডব চলাকালে এএসআই শরিফকে চিনতে পেরেছে এলাকাবাসী। এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, গভীর রাতে উল্লিখিত তাণ্ডব চালানো পুলিশ টিমের নেতৃত্বে ছিলেন এসি শাহেদ। তার সঙ্গে একজন ইনসপেক্টর এবং কয়েকজন সাব ইনসপেক্টর ছিলেন বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, এএসআই শরিফ প্রায় পাঁচ বছর ধরে সদর থানাধীন চরমোনাই এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন।

জানা গেছে, ২০ এপ্রিল দিবাগত রাত সাড়ে তিনটায় লিটন বাশারের বাড়ির পেছন দিক থেকে একদল লোক জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে থাকে। তারা দরজা ভেঙে ফেলারও চেষ্টা করেন। বেশ কিছু সময় পর তারা পুলিশ পরিচয় দিয়ে দরজা খুলে দিতে বলে। কিন্তু জানালার এক ফাঁক দিয়ে দেখা যায় তাদের পরনে পুলিশের পোশাক ছিল না। আবার একজন ছিল খালি গায়ে। টি-সার্ট তারা গলায় পেচানো ছিল। পুরো ঘটনায় লিটন বাশারের মা আরো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। উল্লেখ্য, এর মাত্র একদিন আগে এলাকায় নিজ বাড়িতে একজন দলিল লেখক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এ ছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতির মধ্যে রয়েছে চরমোনাইসহ বিভিন্ন এলাকা।

অনেকক্ষণ পর পোশাকধারী পুলিশ সামনে এলে ঘরের দরজা খুলে দেয়া হয়। কিন্তু পোশাকধারী পুলিশের পরিবর্তে ঘরে প্রবেশ করে সাদা পোশাকে বেশ কয়েকজন লোক। তারা প্রায় আধাঘণ্টা ধরে ঘরের ভেতর তাণ্ডব চালায়। এদিকে পুলিশের দরজা ভাঙার চেষ্টা এবং ঘরের ভেতরে ভয়ার্ত চিৎকারে আশপাশ এলাকায় চরম আতংক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ধারণা করেন, ডাকাত পড়েছে! এতে এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশ এলাকার একাধিক বাড়ি থেকে অনেক লোক ডাকাত ঠেকার প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এক পর্যায় এলাকার পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

উল্লিখিত বিষয়ে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট তিন পুলিশ পুলিশ কর্মকর্তা তিন রকম বক্ত্য দিয়েছেন। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, দলিল লেখকের খুনি লুকিয়ে আছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, পুলিশের তথ্য ভুল ছিল। আর একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ডাকাত পড়েছে এমন খবর পেয়ে পুলিশ অই বাড়িতে গিয়েছিল। এদিকে বিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোয়াজ্জেম হোসেন ভূঞা বলেছেন, আসামি ধরার জন্য পুলিশ যেতেই পারে!

আসামি ধরার নামে প্রয়াত সাংবাদিক লিটন বাশারের বাড়িতে গভীর রাতে উল্লিখিত পুলিশি তাণ্ডবের ঘটনায় বরিশালে নানান প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিএমপির নানান বিষয়ে সক্ষমতা নিয়ে।

উল্লেখ্য, প্রয়াত সাংবাদিক লিটন বাশার ঢাকায় একাধিক পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। বরিশালে দৈনিক আজকের বার্তাসহ একাধিক দৈনিকে কাজ করেছেন। তিনি স্থানীয় একাধিক পত্রিকার সম্পাদনাও ছিলেন। তিনি আমৃত্যু ছিলেন, দৈনিক ইত্তেফাকের বরিশাল ব্যুরো প্রধান। আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। দীর্ঘ দিনের সাংবাদিকতা এবং পেশাগত বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সুবাধে লিটন বাশার সর্ব মহলে প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। ফলে তার বাড়িতে গভীর রাতে পুলিশের অকারণে তাণ্ডবের বিষয়টি কেউই মেনে নিতে পারছেন না। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, এ বিষয়টি বরিশালে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিএমপির বিরাজমান শীতল সম্পর্ককে আরও শীতল করবে! যা মোটেই বাঞ্চিত নয় বলে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল।

এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, এ ব্যাপারে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন বিএমপির নতুন কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান। এ ব্যাপারে তিনি একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে পারেন। তা হচ্ছে, বরিশালের মাঠের সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের পেশাগত সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এস এম রুহুর আমিন। কিন্তু তা অনেকটাই নড়বড়ে অবস্থানে পৌঁছে গেছে সাংবাদিক হয়রানির একাধিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যা চূড়ান্ত বিচারে শুভ কোনো বিষয় নয়।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :