জেব্রা ক্রসিংয়েই জীবনের ঝুঁকি!

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৯, ১০:৫১
ফাইল ছবি

শহরে পথচারীদের রাস্তা পারাপারে জেব্রা ক্রসিং সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পন্থা হলেও রাজধানীতে এখনো তার নিরাপদ ব্যবহার হচ্ছে না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের পর বেশ কিছু এলাকায় সড়কে জেব্রা ক্রসিং এঁকে দেওয়া হলেও ঝুঁকিহীন পরিবেশে পারাপারের কোনো ব্যবস্থা নেই।

নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পথচারী পারাপারের সময়ই দ্রুত গতিতে যানবাহন চলাচল করছে। আবার দেখা গেছে, যানবাহন যখন সিগন্যালে আটকে থাকে, তখন জেব্রা ক্রসিংয়েও গাড়ি দাঁড়িয়ে চলার পথ রুদ্ধ করেছে।

এর কারণ হলো, জেব্রা ক্রসিং এঁকে দিলেও সেখানে কোনো সংকেত বাতি নেই। ফলে গাড়ি দাঁড়াতে চায় না। আবার পথচারীরাও যখন তখন রাস্তায় নেমে পার হওয়ার চেষ্টা করে। কারণ, তাদের জন্যও সবুজ বা লালবাতি জ্বলার কোনো ব্যবস্থা নেই।

সরকারি হিসাবে ২০১৮ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮৬ জন নিহত হয়েছে। এদের অধিকাংশই পথচারী। ঢাকা মহানগর পুলিশও (ডিএমপি) বলছে, রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, তার সবাই প্রায় পথচারী। কিছু নির্দিষ্ট স্পটে এসব দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। পথচারীর হাঁটা বা রাস্তা পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, এমন ৪৫টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে ডিএমপি। এসব ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টের কোথাও ফুটওভার ব্রিজ, কোথাও আন্ডারপাস, আবার কোথাও জেব্রা ক্রসিং নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের পর যেসব এলাকায় জেব্রা ক্রসিং স্থাপন করা হয় তার একটি বিমানবন্দরের জোয়ারসাহারা এলাকায়। এই সড়কে সব সময় গাড়ি চলে দ্রুত গতিতে। আর এর মধ্যেই দৌড়ে রাস্তা পার হতে হয় পথচারীদের। ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে গত ১১ ফেব্রুয়ারি মারা যান সেন্ট জোসেফ কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র আদনান তাসিন। এর পরেও সেই ক্রসিংয়ে গাড়ি থামানোর সংকেত দিতে কোনো ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা হয়নি। বসেনি সংকেত বাতি।

ওই এলাকায় এর আগে একটি ফুটওভারব্রিজ ছিল। সেটি ভেঙে একটু দূরে স্থাপন করা হচ্ছে নতুন ফুটওভার ব্রিজ। কিন্তু সেটির কাজ শেষ না হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো পথচারীকে জীবন হাতের মুঠোতে নিয়েই রাস্তা পার হতে হচ্ছে।

২০১৮ সালের আগস্টের পর সড়কে শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় আবার যে আন্দোলন হয় গত মার্চের শেষে সেখানেও রাস্তা পারাপারের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা ছিল না।

গত ১৯ মার্চ যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে যেখানে জেব্রা ক্রসিং ছিল, তার কাছ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী। সেখানেও গাড়ি কখন থামবে এবং পথচারীরা কখন রাস্তা পার হবে, তার কোনো নির্দেশনা নেই।

রামপুরা ব্রিজের পাশে যেখানে জেব্রা ক্রসিং আঁকা হয়েছে, সেটি আরো ঝুঁকি তৈরি করছে। বনশ্রী হতে হাতিরঝিলের দিকে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে পথচারীদেরকে পড়তে হচ্ছে ইউলুপ থেকে নামা দ্রুত গতির গাড়ির সামনে। আর এটি দূর থেকে দেখারও উপায় নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের রামপুরা জোনের সহকারী কমিশনার হুমায়ূন কবির ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছেন পথচারীরা। এ বিষয়ে প্রতিমাসেই আমরা ঢাকা সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেই। কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পথচারী পারাপার হওয়ার কারণেই ইউলুপ থেকে নামার সময়ে যানবাহনকে স্লো করতে হয়। ফলে ইউলুপের উপরে জ্যাম লেগে যায়। এখানে একটি ফুট ওভার ব্রিজ খুবই জরুরি।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রফিক বিভাগের উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রামপুরা এলাকার ব্যাপারে আমি ট্রাফিকের ডিসিকে বলব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এটা নিয়ে কাজ চলছে। আমি এখন বাইরে রয়েছি কোথায় কী কাজ হচ্ছে তা এখন বলতে পারব না।’ 

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রফিক বিভাগের উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ট্রাফিক সিগনাল থামিয়ে মানুষ রাস্তা পারাপার করবে এটাকে বলে স্টপ লাইটিং সিসটেম। পুশ বাটনে চাপ দিয়ে লাইট জালিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করবে। পরে মানুষ রাস্তা পার হবে। এই পদ্ধতি এখনও আমাদের দেশে নেই। এটা করতে আমার এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে পাঁচটি জায়গার নাম দিয়ে চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু ওনারা কিরে করেছেন সেটা আমার জানা নেই।’

কোন পাঁচটি জায়গার নাম দিয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এই মুহূর্তে ওই পাঁচটি জায়গার নাম আমার মনে নেই।’

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল হক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘জেব্রা ক্রসিং কার্যকরের একটি অন্যতম শর্ত হলো সিগন্যাল সিস্টেম ঠিক রাখা। দুর্ভাগ্য হলো, এখনও ঢাকায় সিগন্যাল সিস্টেম ঠিক করা সম্ভব হয়নি। হাতের ইশারায় পথ চলতে হয়। এতে পথচারী ও চালকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এর ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পথচারী বা চালকদের দায়ী করা হয়। এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। যারা শহরের ট্রাফিক শৃঙ্খলা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দুর্বলতায় দুর্ঘটনা ঘটলেও অন্যের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।’

শামসুল হক মনে করেন, রাস্তা পারাপারের জন্য আমাদের দেশে যে ফুটওভারব্রিজের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তা কখনো ফলপ্রসু হবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ সত্তর-আশির দশকে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হতো। তখন গাড়িকে অগ্রাধিকার দিয়ে পথচারীদের আলাদা করা হতো। এখন সভ্যতা এগিয়েছে। পরে দেখা গেছে, মূল সড়কে জেব্রা ক্রসিং তৈরি করে সিগন্যালের মাধ্যমে নির্বিঘেœ পারপারের ব্যবস্থাকে মানুষ বেশি গ্রহণ করছে। এখন সব উন্নত দেশেই জেব্রা ক্রসিং পথচারী পারাপারের সবচেয়ে মানসম্মত পদ্ধতি। কিন্তু ঢাকায় অহরহ জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখতে দেখা যায়। পুলিশ তেমন ব্যবস্থা নেয় না। এটা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার একটি দিক।

ঢাকাটাইমস/১১মে/এএ

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :