ডা. আরিফের খুঁটির জোর কোথায়?

আজহারুল হক, ময়মনসিংহ
| আপডেট : ১৮ মে ২০১৯, ০৯:৩৩ | প্রকাশিত : ১৮ মে ২০১৯, ০৯:৩১
প্রতীকী ছবি

তিন দিনের ছুটি নিয়ে সাড়ে তিন বছর ধরে হাসপাতালে অনুপস্থিত। জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর গত জানুয়ারিতে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি। এর পরেও কেটে গেল আরো চারটি মাস। কিন্তু ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার আরিফুর রহমানের কিছুই হয়নি। তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, একজন চিকিৎসকের খুঁটির জোর কোথায় যে সাড়ে তিন বছরেও তার বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা যায়নি।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তিন দিনের ছুটিতে গিয়েছিলেন আরিফুর রহমান। কিন্তু সাড়ে তিন বছর ধরে আর আসেননি। ঢাকা টাইমসে গত ৩১ জানুযারি ‘হাসপাতালে না গেলেও বেতন তুললেন ১৩ লাখ টাকা’ এই শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হয় তাকে নিয়ে।

ডা. আরিফের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, একই হাসপাতালের এদিকে সার্জারি বিভাগের কনসালট্যান্ট আফরোজা ইসলাম ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর তিন দিনের ছুটি নিয়ে আর হাসপাতালে আসেননি। কর্মস্থলে না থাকলেও তাদের বেতন ভাতা কিন্তু বন্ধ হয়নি।

এর মধ্যে গত ১১ ফেব্রুয়ারি চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন চিকিৎসক আফরোজা। তবে আরিফুর রহমান এখনো যোগাযোগ করেননি। তিনি কোথায় আছেন তা জানেন না উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত কেউ।

জনগণের সেবা না করে তাদের করের বিপুল পরিমাণ টাকা পকেটে পুরেছেন এই দুই চিকিৎসক। এ নিয়ে তাদের যেমন কোনো ব্যাখ্যা নেই, তেমনি চিকিৎসা প্রশাসনের কেউ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চান না। একজন অনুপস্থিত মানুষের ব্যাংক হিসাবে কীভাবে টাকা গেল, এমন প্রশ্নে চুপ থাকা বা অস্বীকার করা বা ফোন না ধরাকেই কৌশল হিসেবে নিচ্ছেন চিকিৎসক আরিফুরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এ ব্যাপারে চিকিৎসক আরিফুরের বক্তব্য জানতে চাইলে হাসপাতাল থেকে দেওয়া নম্বরে ফোন করে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

সারা দেশে সরকারি চিকিৎসকদের হাসপাতালে অনুপস্থিতি নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে। গত জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন ১১টি সরকারি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে ৬০ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসককে অনুপস্থিত পায়। দুদকের অভিযানের পর এই ১১টি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি সাময়িকভাবে বাড়লেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসার খবর এসেছে গণমাধ্যমে। দিনের পর দিন বহু চিকিৎসক কর্মস্থলে যান না। কিন্তু বেতন তোলার ক্ষেত্রে ভুল করেন না কেউ।

ইতোমধ্যে হাসপাতালের চিকিৎসক আরিফুরের মতো যত শত বা হাজার চাকুরে আছেন, তাদের চাকরি থাকবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারো চাকরি গেছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

গফরগাঁও উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি কে এম এহছান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন কর্মস্থলে ডাক্তারদের অনুপস্থিতি মেনে নেয়া যায় না। বিষয়টি নিয়ে শিগগির যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। ডাক্তারের অনুপস্থিতির কারণে এলাকার গরিব, অসহায় রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’

এর মধ্যে ঢাকা টাইমসের খবরে অনুপস্থিত চিকিৎসকদের ব্যাংক হিসাবে বেতন ভাতা যাওয়ার বিষয়টি অবশ্য বন্ধ হয়েছে। তবে এতদিন কাজ না করে নিয়ে যাওয়া টাকা ফেরত নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গফরগাঁও উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মঞ্জুর আহসান বলেন, ‘অনুপস্থিত ডাক্তাররা এখন আর বেতন ভাতা নিচ্ছেন না। এর আগে যে কতদিন বেতন-ভাতা নিয়েছেন তার দায়দায়িত্ব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাদেরই নিতে হবে। কেননা দীর্ঘদিন ডাক্তারদের অনুপস্থিতির বিষয়টি আমাদের জানানো হয়নি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাইন উদ্দিন খান মানিক জানান, তিনি চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি কাজে যোগ দিয়েছেন। এরপর ডা. আরিফের তিন বছরের বেশি সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে জানতে পারেন।

এই কয় মাসে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নে জবাব আসে, ‘বিষয়টি তাৎক্ষণিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জাননো হয়েছে। এছাড়াও ডা. আফরোজা ইসলাম গত ১১ ফেব্রুয়ারি চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে একটি আবেদন করেছেন। আমি এখানে যোগদান করেই তার আবেদনটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগীয় শাস্তি প্রদানের জন্যও চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

হাসপাতালের যে দশা

 

গত জানুয়ারিতে এই হাসপাতালের দুই চিকিৎসকের দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কর্তৃপক্ষ কিছুটা তৎপর হয়। সপ্তাহে এক-দুইদিনের বেশি কর্মস্থলে থাকেন না, এমন অভিযোগে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় মেডিকেল অফিসার ফোরা আফরোজ, তপন কুমার দাস, আমেনা খাতুন মিতা, নুসরাত জাহান ও নিয়ামুল হাসানকে। ফলে অনেকটা চিকিৎসকশুন্য হয়ে পড়ে উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সটি।

হাসপাতালটিতে ২০ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও এখন আছেন কেবল সাত জন। তবে এই চিকিৎসকদের মধ্যে সিংহভাগই কর্মস্থলে নিয়মিত আসেন না। কেন আসেননি, সেই ব্যাখ্যাও দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাইন উদ্দিন খান মানিক এবং শিশু বিশেষজ্ঞ মুশফিকুর রহমানকে কিছুটা নিয়মিত বলা যেতে পারে। তিনি সপ্তাহে চার দিন হাসপাতালে আসেন। এ চার দিন তাকে রোগী সামলাতে হিমসিম খেতে হয়।

সিনিয়র কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিক্স) মিজানুর রহমান, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার মৌসুমী আক্তার, ইনডোর মেডিকেল অফিসার তাওহিদা আক্তার এবং মেডিকেল অফিসার প্রণিতা বিশ^াস ও তোফাজ্জল হোসেন (ডেন্টাল) নিয়মিত আসেন না কর্মস্থলে। তাদের কাউকেই সপ্তাহে এক-দুদিনের বেশি কর্মস্থলে দেখা যায় না বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের কর্মচারীরা।

 

চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাইন উদ্দিন খান মানিক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘প্রতি মাসে সব বিষয়ে ময়মনসিংহ সিভিল সার্জনের অফিসে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। সেখানে বিষয়গুলো উল্লেখ থাকে।’

তাহলে অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব অবশ্য মেলেনি এই চিকিৎসা কর্মকর্তার কাছ থেকে।

(ঢাকাটাইমস/১৮মে/জেবি)

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :