লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে বস্তির ঘর ভাড়া

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৯, ১১:২৩
ফাইল ছবি

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে অনেক বস্তি। কাঁচা কিংবা টিনশেড ঘরে এসব বস্তিতে বাস করে নিম্ন আয়ের মানুষ। ন্যূনতম আবাসিক সুবিধাও নেই এসব বস্তিতে। তবে সেখানে চোখ কপালে তোলার মতো ঘর ভাড়া। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত এলাকায় গড়ে ওঠা বস্তির উন্নয়নে আলাদা বাজেট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও আছেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্র ও প্রভাবশালী রাজনীতিকরাই বস্তির নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে বস্তি যেন শহরের নিরাময় অযোগ্য এক ফোঁড়া।

ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকার বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মানুষের বাস থাকা আজিমপুরে ৯০০ বর্গফুটের দুই কক্ষের একটি বাসা ভাড়া কমপক্ষে ১২ হাজার টাকা। একই আয়তনের একটি বাসা কর্মজীবী মানুষ অধ্যুষিত উত্তরা এলাকায় এলাকা ভেদে ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

এই দুই এলাকার সঙ্গে তুলনা করলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বস্তিতে বর্গফুট হিসেবে ঘর ভাড়া বেশি। বস্তিতে অধিকাংশই কাঁচা ঘর কিংবা আধাপাকা ঘর। আর বর্গফুট হিসেবে বস্তির ১০০ বর্গফুট আকারের একটি ঘরের ভাড়া পড়ছে ন্যূনতম তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। সে হিসেবে এই ভাড়া ছাড়িয়ে যায় রাজধানী সব রকমের নাগরিক সুবিধা সংবলিত যেকোনো এলাকাকেই। আর এই ভাড়ার যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন নিরুপায় বস্তিবাসী।

সরেজমিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সংলগ্ন একটি বস্তিতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, টিনশেড বাড়ি করে একটি একটি করে কক্ষ ভাড়া দেয়া হয়েছে। এখানে বাস করেন নিম্নআয়ের মানুষ। প্রতিটি ঘরের ভাড়া এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে কোনো রকম নাগরিক সুবিধা সেখানে নেই।

যদিও অবৈধভাবে নেয়া বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। অনেক বস্তিতে আলো জ্বলে সরকারি বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে চুরি করে নেওয়া লাইনের মাধ্যমে। অথচ বিনা টাকায় পাওয়া বিদ্যুৎ সংযোগেরও খরচও গুণতে হয় বস্তিবাসীদের। নেই পর্যাপ্ত এবং স্বাস্থ্যকর শৌচাগারের ব্যবস্থা। আবার কিছু কিছু বস্তি গড়ে উঠেছে পয়ঃনিষ্কাশন খালের ওপর। যেখানে ময়লা, গন্ধ ও মশার উপদ্রব মাত্রাতিরিক্ত।

বাইরে থেকে রাজধানীর বস্তিগুলোতে জীবনমান বেশ সস্তা মনে হলেও আসলে তা নয়। কাঁচা ঘর ও মেঝে পাকা করা, টিনের ছাদ দেয়া আধাপাকা ঘরের ভাড়া পর্যালোচনা করলেই বস্তিবাসীর হাঁসফাঁসের চিত্র ফুটে ওঠে। রাজধানীর আদাবর-১০ নম্বর এলাকার বস্তিতে ঘর রয়েছে প্রায় হাজারের কাছাকাছি। এখানে একশো বর্গফুট আকারের একটি কাঁচা ঘরের ভাড়া তিন হাজার টাকা। সে হিসেবে প্রতিবর্গ ফুটের ভাড়া দাঁড়াচ্ছে ৩০ টাকা। একই আকারের আধাপাকা ঘরের ভাড়া প্রতি বর্গফুট ৪০ টাকা। একই এলাকায় ৯০০ বর্গফুট আকারের একটি ফ্যাট বাসার ভাড়া ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে প্রতিবর্গ ফুটের ভাড়া পড়ে ১৩ থেকে ১৪ টাকা।

বস্তিতে ঘর ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতিমালা না থাকার ক্ষোভ রয়েছে বাসিন্দাদের মধ্যে। তাদের আক্ষেপ নিম্ন আয়ের মানুষের ঘর ভাড়ার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।

আদাবর-১০ বস্তির বাসিন্দা আমির আলী পেশায় রিকশাচালক। ২০১০ সালে ঢাকায় এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন এই বস্তিতে। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, গত আট বছরে তরতর করে বেড়েছে ঘর ভাড়া। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের আয় বাড়েনি।

তিনি বলেন, ‘যহন আহি (আসি) তহন ভাড়া আছিল হাজার-বারোশো ট্যাকা। এহন দিই চাইর হাজার। তাও ম্যানেজারের অয় (হয়) না। মালিক বোলে (নাকি) চিল্লায়। মাসে চাইর হাজার ট্যাহা মানে বুজেন? ডেলি পরায় (প্রায়) দেড়শো ট্যাহা। রিকশা চালায়া এত ট্যাহা কেমনে দেই? ৫ ট্যাকা বেশি চাইলেই তো যাত্রীরা পিডায় (মারধর)।’

মোহাম্মদীয়া হাউজিং এলাকার বস্তিতে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৮১ থেকে একশো বর্গফুট আকারের আধাপাকা ঘরের ক্ষেত্রে। যার প্রতি বর্গফুট ৩২ থেকে ৩৪ টাকা। যদিও গত ৫ বছর আগে এই ভাড়া ছিল অর্ধেকেরও কম।

ভাড়ার এমন ঊর্ধ্বমুখীতার বিরুদ্ধে আক্ষেপ আছে বস্তির বাসিন্দা আলামিনের। তিনি জানান, পেশায় বাবুর্চির সহকারীর কাজ করেন। মাসিক আয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এর একটি বড় অংশই চলে যায় ঘর ভাড়া বাবদ। তাই বেশ টানাহেঁচড়া করেই মাস পার করতে হয় তাকে।

ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বাসা ভাড়াডাই আমগো মূল সমস্যা। এইডা কম থাকলেই হইত। কোনো মাসে ৮ হাজারের মতো পাই। কোনো মাসে ১০ হাজার। যে মাসে একটু কম পাই ওইপাশে বিপদে পরা লাগে। বাসা ভাড়ায় তো মাফ নাই। খাই না খাই দেওয়া লাগে।’

বস্তির ঠিক পাশের ফাটটিতে ৯৫০ বর্গফুট আকারের বাসার ভাড়া ১৪ হাজার টাকা। যার প্রতি বর্গফুটের ভাড়া দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৫ টাকা। দৈর্ঘ-প্রস্থে সাড়ে পাঁচ হাত (প্রায় ৫০ বর্গ ফুট) আকারের ঘর ভাড়া ১ হাজার ৭০০ টাকা। ভাড়ার সাথেই বিদ্যুৎ ও পানির বিল সংযুক্ত। চিত্রটি মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বস্তির।

একই এলাকার গ্রিন হাউজিং এলাকার বস্তির চিত্র ভিন্ন। সাড়ে তিন হাজার টাকার কমে ঘর পাওয়া যায় না এ বস্তিতে। বস্তির একটা ঘরের ভাড়া সাড়ে চার হাজার টাকার পর্যন্ত আছে। সাড়ে চার হাজার টাকায় ভাড়া দেয়া ঘরগুলোর আকার প্রায় সত্তর থেকে আশি বর্গ ফুট।

একইভাবে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া যাবে শিয়া মসজিদ বাজার সংলগ্ন বস্তিতে। ঘরের আকার সত্তর-আশিবর্গ ফুট। গড়ে মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় বস্তির কাঁচা ও আধাপাকা ঘরে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ২৫ থেকে ৪০ টাকা। এর বিপরীতে ফাট বাসার ভাড়াপ্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ২৫ টাকা।

একই চিত্র কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। ৭০ থেকে ৮০ বর্গফুট আকারের আধাপাকা ঘরের ভাড়া দিতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। বস্তির বাসিন্দা খালেদা বেগম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ঢাকা আইয়া এই বস্তিতে উঠছি। ২০০৮ সালে আইছি। তহন ভাড়া দিতাম আটশো ট্যাকা। খালি ভাড়া বাড়ায়।’

ভিন্নতা মেলেনি কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতেও। ১ হাজার ৮০০ টাকার কমে ঘর ভাড়া পাওয়া যাবে না এ বস্তিটিতে। ঘরের আকার ৬০ থেকে ৭০ বর্গ ফুট। ভাড়া বিভ্রান্ত্রির কথা জানালেন এখানকার বাসিন্দারা।

ইমাম নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘ঘর দেহেন এক্কেরে ছোডো। ভাড়া কম নাই।’ ১ হাজার ৮০০ টাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়েই তারা চারজন থাকেন। এদের সবাই রিকশাচালক।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ভুঁইয়া ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বস্তির জমির মালিক সিটি করপোরেশন না এবং ভাড়াটাও সিটি  করপোরেশন পায় না। ফলে বস্তির বাসা ভাড়া সিটি করপোরেশন নির্ধারণ করে না। এটি জমির মালিকরাই ঠিক করে।’

বস্তির স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং চিকিৎসার বিষয়ে সিটি করপোরেশন নানা উন্নয়নমূলক কাজ করছে বলেও ঢাকাটাইমসকে জানান সিটি করপোরেশনের এই কর্মকর্তা।

ঢাকাটাইমস/২৬মে/কারই/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :