আল-কুদস ও মুসলমানদের ভাবনা

ড. জহির উদ্দীন মাহমুদ
 | প্রকাশিত : ৩১ মে ২০১৯, ২০:২৮

এবার আল-কুদস দিবস এলো এমন এক সময়ে যখন গাজায় ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা চলছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, দেশটিতে অস্ত্র তৈরির কোনো কারখানা অবশিষ্ট রাখবেন না তিনি। যখন খুশি এবং জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে এধরনের আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সরকার নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরো পাকাপোক্ত করে চলছে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স তো বলেই দিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি ফর্মুলা মেনে নেয়া উচিৎ, না হয় নিশ্চুপ থাকা উচিৎ। ট্রাম্পের সেই শান্তি ফর্মুলায় ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো স্বীকৃতি নেই। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গাজায় তারই প্রতিবাদ শুরু করায় ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে অসংখ্য তরুণ থেকে শুরু করে শিশু ও বৃদ্ধরা পর্যন্ত নিহত হয়েছে।

ঠিক এমন পরিস্থিতিতে আল-কুদস মানে মুসলিম উম্মাহর প্রথম কেবলা মসজিদুল আকসা বা প্রিয় বায়তুল মোকাদ্দেসের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। যখন খুশি জেরুজালেমবাসীকে আল-আকসায় প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে ইসরায়েল। ১৯৬৭ সনের আরব ইসরায়েল যুদ্ধে আল-কুদস সংশ্লিষ্ট শহর জেরুজালেম ইসরায়েলের দখলে চলে যায়। এরপর পবিত্র মসজিদ আল-আকসায় ইহুদিরা আগুন দিয়েছে, মুসলিমদের  জুমার নামাজ আদায়ে বাগড়া দিয়েছে বহুবার।

আল কুদস দিবসের মর্মকথা হলো- কুদসের মুক্তি, পবিত্র শহর জেরুজালেমের মুক্তি। কুদসকে মুক্ত করার আকুতি আর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মরক্কো থেকে তিউনিশিয়া পর্যন্ত কোটি কোটি মুসলিম দিবসটি পালন করে।

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হাতে পর্যুদস্ত হয়ে ২০০৬ সালে ইসরায়েলিদের পিছু হটতে হয়। ফিলিস্তিনে ইনতিফাদাকে দমন করার বর্বর আগ্রাসী ইসরায়েলি আচরণ তারপরও বেড়েছে। কিন্তু থেমে থাকেনি ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদ। এরপর ২০০৯ সালের শেষভাগে ইসরায়েলিরা হামলা চালায় গাজা উপত্যকায়। সেখানেও ২২ দিনের যুদ্ধে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে পিছু হটে ইসরায়েল। ওই যুদ্ধে হামাসের বিজয় বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। এখন আবার হামাসের ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। আর এসব হামলা শুধু গাজা বা সিরিয়া নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অস্তিত্বের জন্যে হুমকি সৃষ্টি করলেও নিশ্চুপ বসে আছে আরব রাষ্ট্রগুলো। এরই মধ্যে গত ১৫ মে  ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের ৭০ বছর পূর্ণ হয়েছে যা নাকবা বা ফিলিস্তিনিদের বিপর্যয় হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের ৪০০ গ্রাম থেকে ৮ লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করা হয় যারা তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিতে ১২শ বছর ধরে বসবাস করে আসছিল। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। এখন সারা দুনিয়ায় ফিলিস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখেরও বেশি।

সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামকে চিরতরে নিঃশেষ করার লক্ষ্যে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তি (ডিল অফ দা সেঞ্চুরি/শতাব্দীর সেরা চুক্তি) স্বাক্ষর করেছে। যে মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউসহ বিশ্বের প্রায় সকল পক্ষ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে মেনে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছার জন্য তৎপর, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কতিপয় আরব রাষ্ট্রের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রকে সমূলে বিনাশ করার লক্ষ্যে ইহুদিবাদী ইসরাইল শতাব্দীর সেরা চুক্তি স্বাক্ষর করে তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।

এ চুক্তি মোতাবেক স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব নেই। গাজা উপত্যকা, যিহুদীয়া পার্বত্য অঞ্চল ও পশ্চিম তীরের সামারিয়া অঞ্চল ‘নিউ প্যালেস্টাইন’ নামে পরিচিত হবে। আর বাকি সব অঞ্চল এমনকি এসব এলাকার ইহুদি বসতিগুলো সব স্বাধীন রাষ্ট্র ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জেরুজালেম ইসরায়ল ও নিউ প্যালেস্টাইন-এর যৌথ রাজধানী হবে। আরবরা নিউ প্যালেস্টাইন এবং ইহুদিরা ইসরাইলের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। নিউ প্যালেস্টাইনের কোন সেনাবাহিনী থাকবে না। হালকা অস্ত্রধারী পুলিশ থাকবে। বহিঃশত্রু থেকে তাদের প্রতি রক্ষার দায়িত্বে থাকবে ইসরাইল। জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরাইলি পৌরসভার হাতে। তবে শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বে থাকবে তথাকথিত নিউ প্যালেস্টাইন সরকার।

পিএলও, হামাস ও ইসরাইল-এর মধ্যে এ বিষয়ে একটি চুক্তি করে এর বাস্তবায়ন করা হবে। পিএলও যদি চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে তাদের সকল সাহায্য বন্ধ করে দেয়া হবে।অন্যদিকে হামাস যদি রাজি না হয়, তাহলে সরাসরি যুদ্ধ করে হামাসকে নির্মূল করে দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে ইসরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশগ্রহণ করবে। সৌদি আরব, মিশর,আমিরাত ও জর্ডান এ চুক্তির পক্ষে ইতোমধ্যেই প্রচারণা শুরু করেছে। সৌদি যুবরাজ পিএলও-কে বিশাল অংকের টাকা আর সাহায্যের কথা বলে চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও পিএলও-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যেই রাশিয়া ও ইইউর প্রতি এই চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।

আর শুধু আরব দেশগুলোকেই ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াতে হবে কেন? মুসলিম বিশ্বই বা কেন ফিলিস্তিনিদের পাশে একাট্টা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। ফিলিস্তিনিদের জন্যে অর্থ সহায়তা বা মৌখিক দুঃখ প্রকাশ যদি সব হতো, তাহলে গত ৪০ বছরে পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না। জাতিসংঘের স্বীকৃত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পরিকল্পনা বা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে মেনে না নিয়ে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করতেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একজন মুসলমান যেমন অন্য একজন মুসলমানের অঙ্গ স্বরূপ তেমনি বিশ্বের সব মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষা ও মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ে একাট্টা হবার লড়াইয়ের প্রয়োজন আছে বৈকি।

আল-কুদস দিবসে এসব ভাবনাও আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে। কেন ইসরায়েল প্রকাশ্যে বলে আসছে যে আরব দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্ক দিনদিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। কেন ক্রাউন প্রিন্সের ইসরায়েলে গোপন সফরের খবর আসে। কেন ফিলিস্তিনি সমস্যা সমাধানে আরব দেশগুলো ইসরায়েল বা পশ্চিমা দেশগুলোকে বাধ্য করতে পারে না। কেন আমিরাতে ইসরায়েলি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বিষয় আল-কুদস দিবসের অন্তর্নিহিত ভাবনা। এ ভাবনা থেকে দূরে থাকার কোনো অবকাশ নেই। কারণ জাতিসংঘের স্বীকৃতি বা আন্তর্জাতিক আইন বারবার লঙ্ঘন করেই ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বর হত্যা ও জেরুজালেমকে মার্কিনিরা ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করেছে।

লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত