সুইডেনে ই ইউ নির্বাচনের ফলাফল ও সুইডিশ রাজনৈতিক দল

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহল্ম
 | প্রকাশিত : ০৮ জুন ২০১৯, ০৮:১৯
ছবিতে লেখক বা থেকে তৃতীয়

গত ২৬ মে রবিবার সুইডেনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি পাঁচ বৎসর অন্তর অন্তর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সুইডেন পহেলা জানুয়ারি ১৯৯৫ থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য। নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ২৬ মে রবিবার নির্ধারিত হলেও গত ৬ মে থেকে সুইডেনে ভোট প্রদানের কাজ শুরু হয়।এইসময় জনগণ দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়ে ভোট দিয়ে থাকে। নির্দিষ্ট  ভোটের দিন কোনো কারণে কেউ ভোট দিতে না পারলে ভোটের তিন সপ্তাহ পূর্বে যে কোনো দিন তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এধরণের সুযোগ ও বেবস্থা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে  জনগণের অংশগ্রহণ খুব একটা বেশি লক্ষণীয় নয়l তবুও  ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচনে প্রতিটি নাগরিকের ভোটে অংশগ্রহণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু তাই নয় নির্বাচনকালে সুইডিশরা দেশের বাহিরে অবস্থান করলে তাদের নিকটস্থ সুইডিশ দূতাবাসে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগও রয়েছে।

২০১৪ সুইডেনে অনুষ্ঠিত ই ইউ নির্বাচনে ৫১,০৭ % ভোটার অংশগ্রহণ করেl গত ২৬ মে সুইডেনে হয়ে যাওয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫,২৭% এসে দাঁড়ায়l এদিকে জনসংখার উপর নির্ভর করে ই ইউ পার্লামেন্টের আসন সংখ্যা ভাগ করার কারণে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের মোট ৭০৫ আসনের মধ্যে সুইডেনের ভাগে পড়েছে ২১ আসন। তবে নির্বাচন ২০  আসনে হয়েছেl  বাকি ১ আসন  ব্রিটেন ই ইউ থেকে বের হয়ে  যাওয়ার পর  সুইডেনের ভাগে দেওয়া হয়েছেl গত ২৬ মে নির্বাচনের ফলাফল অনুসারে এই ১ আসন সুইডিশ গ্রিন পার্টির পক্ষে যাবে বলে মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছেl 

সুইডেনে নির্বাচন প্রপোশনাল নিয়মে হয়ে থাকেl অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেl সেই তালিকা অনুযায়ী অংশগ্রহনকৃত মোট ভোটের কমপক্ষে ৪% ভোট দলকে পেতে হয়l তা না হলে দল কোনো আসন পাওয়ার যোগ্যতা রাখে নাl দলের তালিকা অনুসারে যাদের নাম ১ অথবা ২,৩ থাকবে তারাই জয়লাভ করবে এবং তা নির্ভর করবে দল ৪% উপরে কত পার্সেন্ট ভোট পায় তার উপর নির্ভর করেl

পার্লামেন্ট, কাউন্টি কাউন্সিল ও ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচনে এলাকা ভিত্তিক প্রার্থী তালিকা থাকলেও ই ইউ নির্বাচনে প্রতিটি দলের সারা দেশে একটি মাত্র প্রার্থী তালিকা থাকেl ফলে ই ইউ পার্লামেন্ট নির্বাচনে বেক্তিগত ভোটে জয়লাভ করা কঠিনl গত ২৬ মে হয়ে যাওয়া নির্বাচনে কোনো প্রার্থী বেক্তিগত ভোটে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়নিl

এই বেক্তিগত ভোটটি দেওয়ার নিয়ম হলো, প্রার্থীর নামের পাশে একটি x চিহ্ন দেওয়াl তাহলে প্রার্থীর নাম দলের তালিকায় যেখানেই থাকুক না কেন x দেওয়ার কারণে প্রার্থী ভোটটি ব্যক্তিগতভাবে পাবেl অর্থাৎ দলের যে কোনো প্রার্থীর নামের পাশে একটি ক্রস চিহ্ন দিলে সেই ভোট একইসাথে দল ও  দলের প্রার্থীর গণনায় যাবেl এভাবে দলের মোট ভোটের  ৪% ভোট কোনো প্রার্থী পেলে তার নাম নিচে থাকলেও তিনি প্রার্থী তালিকায় থাকা ১ নাম্বারকে অতিক্ক্রম করে জয়ী হবেনl তবে ই ইউ নির্বাচনের বেলায় এখানে ৫% রাখা হয়েছেl

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ অনেকদিন থেকেই বাংলাদেশে প্রপোশনাল ভোটের নিয়ম চালু করার দাবি জানিয়ে আসছেনl বাংলাদেশে এই নিয়ম চালু হলে ছোটো খাটো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের জয়লাভ করা কঠিন হয়ে পরবেl তাছাড়া দলবিহীন স্বতন্ত প্রার্থী আর কেউ হতে পারবেন নাl তবে এই পার্সেন্টিস কমিয়ে দিলে ছোট দলগুলোর প্রার্থীদের জয়লাভ করার সুযোগ থাকবেl সুইডেনের প্রতিবেশী দেশ ডেনমার্কে প্রার্থী তার নির্বাচনী এলাকায় দলের মোট ভোটের ৩% ভোট পেলে জয়লাভ করার সুযোগ রয়েছেl 

ইউনিয়ন কাউন্সিল, কাউন্টি কাউন্সিল ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রপোশনাল ভোটের পার্সেন্ট ৪% হওয়াতে বেক্তিগত ভোটে জয়লাভ করা সহজl এই কারণে এসকল নির্বাচনে কিছু কিছু প্রার্থীর নাম তালিকার নিচে থাকলেও তারা  বেক্তিগত ভোটে জয়লাভ করে থাকেনl সুইডেনে গত পার্লামেন্ট নির্বাচনে গ্রিন পার্টির একজন সোমালিয়ান মহিলার নাম তালিকার অনেক নিচে থাকা সত্ত্বেও তিনি বেক্তিগত ভোটে জয়লাভ করেছেনl এভাবে আরো অনেক প্রার্থী ইউনিয়ন কাউন্সিল, কাউন্টি কাউন্সিল ও পার্লামেন্টে জয়লাভ করেনl

বাংলাদেশ সরকার চাইলে প্রপোশনাল ভোট সিস্টেম চালু করার ব্যাপারে সুইডেন সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা করতে পারেl এই প্রপোশনাল ভোটের আরেকটি ভালো দিক হলো কোনো নির্বাচিত বেক্তির ইন্তেকাল অথবা সরকারের মন্ত্রী কিংবা অন্য কোনো সরকারি দায়িত্ব পেলে তার আসন তৎক্ষণাৎ শূন্য হয়ে যায়l তবে এজন্য ওই এলাকায় পুনরায় নির্বাচন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন হয় নাl এই শূন্যস্থান বিনা নির্বাচনে পূরণ করবেন দলের নাম তালিকা অনুসারে পরবর্ত্তী বেক্তিl অর্থাৎ নির্বাচন একবারই হয় এবং যে দল আসন পায় সেই আসন তাদের পক্ষে মেয়াদ পর্যন্ত থাকেl এতে একদিকে সরকারের নির্বাচনী খরচ কমে আসবে অন্য দিকে মেয়াদকাল পর্যন্ত আসনসংখ্যা নিয়ে আর কোনো সমস্যা হয় নাl  

সোসিয়াল ডেমোক্রেট লেবার পার্টি  সম্প্রতি সুইডেনে হয়ে যাওয়া ই ইউ নির্বাচনে সোসিয়াল ডেমোক্রেট লেবার পার্টি  ২৩,৪৮% ভোট পেয়ে তাদের পূর্বের ৫ আসন ধরে রেখেছেl গত ২৭ এপ্রিল ২০১২ থেকে সুইডেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লোফভীন দলটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেনl বর্তমান সুইডিশ পার্লামেন্টে দলটির  ১০০ আসন রয়েছেl সমাজবাদী ও মিশ্র অর্থনীতিতে বিশেষ করেl

মডারেট পার্টি ১৬,৮৩% ভোট পেয়ে ৪ আসন লাভ করেছেl ২০১৪ ই ইউ পার্লামেন্টে দলটির ৩ আসন ছিলl দলের সভাপতি হিসেবে ১ অক্টবর ২০১৭ থেকে দায়িত্ব পালন করছেন উল্ফ ক্রিস্টিয়ানসনl সুইডিশ পার্লামেন্টে দলটির  আসন  ৭০ রয়েছেl উদার রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল।

সুইডেন ডেমোক্রেট একটি উগ্র ডানপন্থী দলl তারা রক্ষণশীল সমাজবাদে বিশ্বাস করেl ই ইউ নির্বাচনে ১৫,৩৪% ভোট পেয়ে দলটি ৩ আসন লাভ করেছেl গত নির্বাচনে দলটির দুইটি আসন ছিলl একমাত্র ইমিগ্রেশন বিরোধী বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে দলটির জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছেl  ২০০৫ থেকে দলীয় প্রধান দায়িত্বে আছেন জিম্মি অকেসনl সুইডিশ পার্লামেন্টে দলটির  ৬২ আসনl

সেন্টার পার্টি   ১০,৭৮% ভোট পেয়ে ২ আসন লাভ করেছেl গত নির্বাচনে ই ইউ পার্লামেন্টে দলটির ১ আসন ছিলl ২০১১ থেকে দলের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন আন্নে লফl ১৯৫৭ সালে দলটি তাদের পূর্বের নাম কৃষক লীগ পরিবর্তন করে সেন্টার পার্টি নামকরণ করেl সুইডিশ পার্লামেন্টে দলটির  ৩১ আসন রয়েছেl

 

ভেনস্টার পার্টি (লেফট পার্টি ) ৬,৮০% ভোট পেয়ে তাদের পূর্বের ১ আসন ধরে রেখেছেl যদিও জরিপ রিপোর্ট অনুসারে দলটির ২ আসন পাওয়ার কথা ছিলl ভেনস্টার পার্টির আদর্শ হলো সোসিয়ালিস্ট ও ফেমিনিস্টl ২০১২ থেকে ভেনস্টার পার্টির প্রেসিডেন্ট ইউনাস সুসটেডl সুইডিশ পার্লামেন্টে বর্তমানে ভেনস্টার পার্টির ২৮ আসন রয়েছেl

ক্রিস্ট ডেমোক্রেট  নির্বাচনে ৮,৬২% ভোট পেয়ে ২ আসন লাভ করেl ২০১৪ তাদের ১ আসন ছিলl  ক্রিস্ট ডেমোক্রেট পার্টি খ্রিস্টান ধর্ম, গণতন্ত্র  ও রক্ষণশীল সামাজিক বেবস্থায় বিশ্বাসীl ২৫ এপ্রিল ২০১৫ থেকে দলটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন এব্বা বুশ থরl সুইডিশ পার্লামেন্টে বর্তমানে ক্রিস্ট ডেমোক্রেট পার্টির  ২২আসনl

লিবারেল পার্টি যাদের পূর্বের নাম ছিল ফল্ক পার্টিl ২০০৭ থেকে দলের সভাপতি জন বিওরকলুন্ডl ই ইউ নির্বাচনে ৪,১৩% ভোট পেয়ে ১ আসন পেয়েছেl  ২০১৪ সালে দলটি ৩ আসন লাভ করেl চলতি মাসে দলটি নুতন সভাপতি নির্বাচিত করতে যাচ্ছেl এপর্যন্ত তিন জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানিয়েছেনl এদের একজন সাবেক মন্ত্রী, একজন বর্তমানে জর্দানে সুইডিশ রাষ্ট্রদূত ও অন্যজন দলের অর্থনৈতিক বিষয়ক মুখপাত্রl সুইডিশ পার্লামেন্টে পার্টির ২০ আসন রয়েছেl

গ্রিন পার্টি গত ই ইউ নির্বাচনে চারটি আসন থাকলেও ২৬ মে হয়ে যাওয়া নির্বাচনে ১১,৫২% ভোট পেয়ে ২ আসন লাভ করেl ব্রিটেন ই ইউ থেকে বের হলে দলটির আরেকটি আসন পাওয়ার কথা ইতিমধ্যেই মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছেl দলটির আদর্শ পরিবেশ আন্দোলন ও শান্তি আন্দোলনl সম্প্রতি হয়ে যাওয়া দলের কংগ্রেসে দলীয় প্রধান হিসিবে দুইজনকে নির্বাচিত করা হয়l দলের কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুসারে গ্রিন পার্টিতে সব সময় দুইজন দলীয় প্রধান নির্বাচিত করা হয়l এই দুইজনের মধ্যে একজন মহিলা ও একজন পুরুষ হতে হবেl দলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট পার বুলুন্দ ও ইসাবেলা লোভিনl সুইডিশ পার্লামেন্টে দলটির  ১৬ আসনl

লেখক: ইলেক্টেড মেম্বার, দা ইউনিয়ন অফ সার্ভিস এন্ড কমিউনিকেশন এম্পলয়েস স্টকহল্ম সাউথ ব্রাঞ্চ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :